রাজনীতির মঞ্চ ছেড়ে লাইব্রেরিতে মকবুল

রাজনীতির মঞ্চ ছেড়ে লাইব্রেরিতে মকবুল

বয়স ২০-২২ টগবগে যুবক। রাজনীতির মঞ্চে প্রবেশ করার মতো উপযুক্ত সময়। জ্বালাময়ী বক্তব্য প্রদান সঙ্গে সহকর্মীদের হাত তালি। আরো সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া সব মিলিয়ে অন্য রকম এক অনুভূতি। এক সময় মনে হলো রাজনীতির প্রধান উদ্দেশ্য হলো সাধারণ জনগণের উপকারে আসা। কথা দিয়ে কথার বাস্তবায়ন করা। কিন্তু যখন দেখলাম একজনকে কথা দিলাম তার বাস্তবায়ন হলো না তখনই ঠিক করলাম এই রাজনীতি আমার জন্য নয়, তাই চলে এলাম বইয়ের ভুবনে। কারণ একটাই- বই কখনো কথার বরখেলাপ করে না। বলছি দিনাজপুর শহর এলাকার সর্দার পাড়ার মকবুল হোসেনের (৭০) কথা।

বয়সের ভারে এখন মকবুল হোসেনের শরীরও পড়েছে নুইয়ে। একটুখানি কথা বলার পরেই নিতে হয় লম্বা শ্বাস। লম্বা সাদা দাঁড়ি গোঁফের সুবক্তা মানুষটির এখন সময় কাটে বই সংগ্রহে, সাহিত্য আড্ডায়, কবিতা লিখে, ফুল গাছ আর কবুতরের যত্ন আত্তির মধ্য দিয়ে। তার বাড়িতে ডাইনিং রুম থেকে শোবার ঘর প্রায় সবখানেই চোখে পড়বে বই আর বই। আলমিরায় থরে থরে সাজানো বিভিন্ন বিষয়ের বই। কতগুলো বই হবে? মকবুল হোসেনের ভাষ্যমতে পাকিস্তান পিরিয়ডে কিছু বই হারিয়েছে এবং সংরক্ষণের অভাবে কিছু বই নষ্ট হয়েছে। তারপরও বর্তমানে যা বই আছে তা ৭-৮ হাজারের কম নয়।

দিনাজপুর শহর এলাকার সর্দার পাড়ার মকবুল হোসেন। মরহুম খলিলউদ্দীন আহমেদ ও মর্জিনা বেগমের ১১ জন ছেলেমেয়ের মধ্যে মকবুল হোসেন ষষ্ঠ। বছরখানেক পূর্বে পত্নী বিয়োগ হওয়া মকবুল হোসেন ব্যক্তিজীবনে ২ ছেলেমেয়ের জনক। দিনাজপুর শহরের পরিচিত মুখ মকবুল হোসেন একটা সময় রাজনীতিতে বেশ সক্রিয় ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামসহ অনেক আন্দোলন সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঝাঁঝালো বক্তব্য দিতেন, স্লোগানে কাঁপাতেন রাজপথ। সেই মকবুল হোসেন এখন রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে ঢুকেছেন বইয়ের মধ্যে। নিজ বাড়ির ছাদে গড়ে তুলেছেন পারিবারিক গ্রন্থাগার। যার নাম রেখেছেন ‘সেঁওতি গ্রন্থাগার’। মকবুলের ভাষায় সেঁওতি অর্থ সাদা গোলাপ বা স্বর্গীয় কিছু। সেঁওতি গ্রন্থাগারে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস, ভ্রমণ কাহিনী, শিশুসাহিত্য, বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক বিভিন্ন দেশি-বিদেশি লেখকের বই যেমন আছে তেমনি আছে কোরআন, বেদ, গীতা, বাইবেল, ইঞ্জিলসহ বিভিন্ন ধর্মের ধর্মগ্রন্থও।

মকবুল হোসেনের শিক্ষাজীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে দিনাজপুরের আর্য পাঠাগারে। তার ভাষায় ‘যখন হাফ প্যান্ট পরে স্কুলে যেতাম সেই সময় থেকেই দিনাজপুরের বিখ্যাত আর্য পুস্তকাগারে বসতাম। যখন একটু বড় হলাম বই পড়াটা বেশ নেশায় পরিণত হলো। সেই থেকে বই পড়ছি। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বই পড়ে যেতে চাই।

দিনাজপুরের আর্য পুস্তকাগারে মকবুল হোসেনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে মার্কসবাদ, লেলিনবাদ, মুজিববাদ, এঙ্গেলস, গান্ধীসহ বিশ্বের অনেক খ্যাতিমান রাজনীতিকের জীবনী সংবলিত বই পড়ে। তিনি বলেন, বই পড়ার ঝোঁক থেকে বই সংগ্রহের দিকে ঝুঁকে পড়ি। রাজনৈতিক জীবনে প্রয়োজনে যখন যেখানে গিয়েছেন সেখান থেকেই লাইব্রেরি খুঁজে সংগ্রহ করেছেন পছন্দের বই। বয়সের ভারে এখন দূরে কোথাও যেতে পারি না। কিন্তু তারপরও থেমে নেই বই সংগ্রহের নেশা। দিনাজপুর শহরের লাইব্রেরিগুলোতে এবং দিনাজপুর জজকোর্ট এলাকায় পুরনো বইয়ের দোকানে প্রায়শই হাজিরা দেন মকবুল হোসেন নতুন কিছুর সন্ধানে।

বই সংগ্রাহক মকবুল হোসেন শিক্ষাজীবন শুরু করেন দিনাজপুর মহারাজা গিরিজানাথ উচ্চ বিদ্যালয়ে। ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর স্কুল ছেড়ে দিয়ে যুক্ত হন বাবার কাপড়ের ব্যবসায়। ছাত্রজীবনেই ১৯৬৬ সালে রাজনীতিতে যুক্ত হন ছাত্র ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে। ৬ বছর পরে আবার লেখাপড়ায় ফিরে এসে দিনাজপুর একাডেমি স্কুল থেকে ১৯৬৮ সালে মেট্রিক পাস করেন। পরে ঠাকুরগাঁও বিডি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও ডিগ্রি পাস করেন। পরে ১৯৭০ সালে দিনাজপুর জেলা ছাত্রলীগে যোগদান করেন। মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে দিনাজপুর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন এবং পরবর্তী কাউন্সিলে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ ছাড়া ১৯৭৪ সালে দিনাজপুর আইন কলেজছাত্র সংসদের জিএস এবং ঠাকুরগাঁও বিডি কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্র সংসদের ম্যাগাজিন সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পরে ক্ষমতাসীন মোস্তাকের রোষানলে দিনাজপুরে ছাত্রলীগের যে ক’জন নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছিল তাদের মধ্যে মকবুল হোসেন একজন। তবে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদ ক্ষমতায় আসার পরে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে দিনাজপুর জেলা জাতীয় পাটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করে রাজনীতিক জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন মকবুল হোসেন। পরে জাতীয় পার্টি ভেঙে দুটি গ্রুপ হয়ে গেলে জাতীয় পার্টি (জেপি) দলের দিনাজপুর জেলার আহ্বায়ক ও বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

মানবকণ্ঠ/এসএস