রাজনীতিবিষয়ক বইয়ে আগ্রহ রয়েছে

রাজনীতি কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার ভিত্তিতে গঠিত সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে গঠিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞান হচ্ছে শিক্ষার এমন একটি শাখা যা রাজনৈতিক আচরণ শেখায় এবং ক্ষমতা গ্রহণ ও ব্যবহারের উপায় সম্পর্কে আলোচনা করে। তারপরও ‘রাজনীতি’ শব্দটা অনেকের কাছেই অপ্রিয়। কিন্তু যে কোনো রাষ্ট্র-সমাজের জন্য সুষ্ঠু রাজনীতির চর্চা অত্যাবশ্যক। তাই রাজনীতি বিষয়ক লেখালেখির একটা আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।

রাজনীতির নানা বিষয় নিয়ে যারা লেখেন তারা তাদের মতামত, পর্যালোচনা, পর্যবেক্ষণ, গবেষণা, বিচক্ষণতার মধ্য দিয়ে নানা সত্যকে জাতির সামনে নিয়ে আসেন। তবে এখানে সততার একটি প্রশ্ন রয়েছে। লেখক কতটা দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে লিখছেন সেটি রাজনীতি বিষয়ক লেখার জন্য বিশেষ মান বহন করে। বইমেলায় রাজনীতি বিষয়ক বই প্রকাশ হয় তুলনামূলক কম। এবারো তার ব্যতিক্রম নয়। তবে গত কয়েক বছরে রাজনীতিবিদরা শুধু রাজনীতি নিয়েই বই লিখছেন তা নয়। তারা আত্মজীবনী, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধও লিখছেন। সেই বইগুলোও মেলায় ভালো চলছে।

রাজনীতির মারপ্যাচ, ফেলে আসা সময়ে রাজনীতির খেলার কথা পড়বার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে পাঠকের কাছে। তবে বামপন্থি ভাবনা, সাম্যের সমাজ ভাবনার বইয়ের কদর সবচেয়ে বেশি। এর বাইরেও বাংলাদেশের রাজনীতি, বিএনপি, আওয়ামী লীগের নেতাদের রাজনৈতিক নিবন্ধের চাহিদাও কম নয় তাদের অনুসারীদের কাছে। পাঠকের আগ্রহ থাকায় এ ধরনের বই বেশ গুরুত্ব দিয়েই প্রকাশ করেন প্রকাশকরা।

এবার অমর একুশে বইমেলায় সবচেয়ে বেশি আসছে কবিতার বই। এরপর গল্প-উপন্যাস ও প্রবন্ধের বই। প্রতি বছরের মতো এবারো বেশ কিছু রাজনীতিবিষয়ক নতুন বই প্রকাশ হয়েছে। পাশাপাশি রাজনীতিবিদদের লেখা বইও প্রকাশ হয়েছে।

বাংলা একাডেমির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, মেলার ১৭তম দিন রোববার পর্যন্ত রাজনীতিবিষয়ক নতুন বই প্রকাশ হয়েছে মাত্র ৮টি। কিন্তু মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে জানা যায়, এখন পর্যন্ত রাজনীতিবিষয়ক ৫০টির বেশি বই প্রকাশ হয়েছে।

এই বইগুলোর মধ্যে সময় প্রকাশন এনেছে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ‘সংকট ও সুযোগ’, প্রথমা থেকে প্রকাশ হয়েছে মহিউদ্দিন আহমদের ‘আওয়ামী লীগ: যুদ্ধ দিনের কথা ১৯৭১’, একই প্রকাশনা থেকে এই লেখকের আরেকটি বই ‘এই দেশে একদিন যুদ্ধ হয়েছিল’, মোহাম্মদ গোলাম রব্বানীর ‘বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল: অবরুদ্ধ ৬৮ বছর’, আগামী প্রকাশনী থেকে ড. মো. আনোয়ার হোসেনের ‘রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার পথচলা’, অনন্যা থেকে অধ্যাপক আবু সাইয়িদের ‘ইতিহাসের দায়ভার এবং একজন আদুরী’, একই প্রকাশনী থেকে ড. আবদুল লতিফ মাসুমের ‘সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক রাজনীতি’, গোলাম মাওলা রনির ‘ইতিহাসের নির্মম প্রতিশোধ’, মাওলা ব্রাদার্স এনেছে কাবেদুল ইসলামের ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনা’, ঐতিহ্য এনেছে মনজুরুল হক রচিত ‘পূর্ব বাংলার সাত দশকের কমিউনিস্ট রাজনীতি’, একই প্রকাশনী থেকে মো. নূরুল আনোয়ারের ‘মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড: দুর্যোধনটি কে?’, বিপ্লবীদের কথা থেকে প্রকাশ হয়েছে আহমদ রফিকের ‘ইলা-রমেন কথা: প্রাসঙ্গিক রাজনীতি’, একই প্রকাশনী থেকে রণেশ দাশগুপ্তের অনুবাদে ‘জিজ্ঞাসা’, শান্তি দাশের ‘অরুণ-বহ্নি’, লক্ষী চক্রবর্তী ও শেখ রফিকের সম্পদনায় ‘৭১ (তৃতীয় খন্ড), বাঁধন পাবলিকেশন্স থেকে মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসির ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে আওয়ামী লীগের ভূমিকা’।

উৎস প্রকাশন, চারুলিপি প্রকাশন, আবিষ্কার, মাওলা, ঐতিহ্য, সময়, অন্বেষা প্রভৃতি প্রকাশনী রাজনীতিবিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশ করেছে।

চারুলিপি প্রকাশনীর হুমায়ুন কবীর বলেন, মেলায় রাজনীতিবিষয়ক বইয়েরও চাহিদা আছে। তবে, সংখ্যায় কম। আমরা সব চিন্তার পাঠকের জন্য বই প্রকাশ করে থাকি।

আবিষ্কার প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী, কথাসাহিত্যিক দেলোয়ার হাসান বলেন, আমাদের দেশের রাজনীতির প্রতি মানুষের যেমন আগ্রহ থাকুক না কেন রাজনীতিবিষয়ক বইয়ের প্রতি আছে। সময় প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমদ বলেন, পাঠকের সব রকমের চাহিদা পূরণ করার মতো বই সময় প্রকাশনীতে আছে। রাজনীতির বই আগে কম ছিল এখন পাঠকের কথা ভেবে রাজনীতিবিষয়ক বই প্রকাশ করছি।

আগামী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ওসমান গণি বলেন, রাজনীতিবিষয়ক বই সব প্রকাশনা থেকে প্রকাশ হয় না। কারণ, রাজনীতিবিষয়ক বইয়ের কাটতি নানা সময়, উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে। আমরা সবসময় রাজনীতিবিষয়ক বইয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেই। সারা বছরই এ ধরনের বইয়ের পাঠক পাওয়া যায়।

রোববার মেলায় এসেছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। তিনি বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান মিলনায়তনে
আইডিয়া প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ৮টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন। বইগুলো হলো- আফতাব হোসেনের ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’, আল আমিন রহমানের ‘মুক্তিযুদ্ধ ও একাত্তরের নীলফামারী’ ও ‘বীরমাতাদের বোবা কান্না’, ডা. সাকলায়েন রাসেলের ‘অফটপিক’, রেজাউল করিম মুকুলের ‘দাস ও দেবতাগণ’, তাসমিন আফরোজের ‘জলফড়িংয়ের ডানা’, আব্দুর রাজ্জাকের ‘কোনভাবে অনুরণন’ এবং আব্দুল আউয়ালের ‘শিশিরভেজা রোদ’।

নতুন বই: বাংলা একাডেমির তথ্যমতে মেলায় গতকাল নতুন বই এসেছে ১৩৩টি। এরমধ্যে জ্যোতিপ্রকাশ এনেছে আবু আলীর ‘পুঁজিবাজারের প্রাথমিক ধারণা’, পারভেজ হোসেনের ‘বাংলাদেশের ছোটগল্প’ (নবযুগ); মুহম্মদ নূরুল হুদার ‘ইউনুস এমরের কবিতা’ (পাঞ্জেরি); প্রভাষ আমিনের ‘স্বর্গ নেই, আছে উপসর্গ’ (অন্যপ্রকাশ); আনোয়ারা সৈয়দ হকের ‘রকমারি রচনা’ (রাত্রি); জাকির তালুকদারের ‘উপন্যাস চতুষ্টয়’ (পুঁথিনিলয়); কামরুন নাহার শিল্পীর ‘কবিতার নীড়ে আলোর বীজ’ (মনন প্রকাশ); কাজী সাজেদুর রহমানের ‘উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা : উন্নয়নের রূপরেখা’ (দেশ পাবলিকেশন্স)।

মূলমঞ্চের আয়োজন: রোববার বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় এ এফ সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ: মুজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী: এ কে নাজমুল করিম শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মুনতাসীর মামুন, মীজানূর রহমান শেলী এবং সোনিয়া নিশাত আমিন। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর।

এ এফ সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করে মুনতাসীর মামুন বলেন, অধ্যাপক সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ বাঙালির সত্যসন্ধ ইতিহাসচর্চার এক অনন্য পুরোধা-ব্যক্তিত্ব। অসাম্প্রদায়িক-মানবতাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতি, ধর্মনিরপেক্ষতা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে প্রণয়ন করেছেন অসামান্য গবেষণাকর্ম। আমৃত্যু বাংলাদেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক-সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে নিবিড় যুক্ততার মধ্য দিয়ে মৌলবাদ-ধর্মান্ধতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর সোচ্চার অবস্থান ছিল গণতান্ত্রিক-বহুত্ববাদী সমাজ-নির্মাণে আমাদের অফুরান প্রেরণার উৎস।

মুজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করে ড. মীজানূর রহমান শেলী বলেন, অধ্যাপক মুজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী ছিলেন গুণী শিক্ষক, সত্যসন্ধ প্লতি এবং পরিশ্রমী লেখক। ১৯৪৮-৫২ এর ভাষা আন্দোলনের কালে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক হিসাবে তিনি তৎকালীন রাজন্যবর্গের রোষে পড়েছিলেন। যেখানে রাজনীতি জীবন, যেখানে জীবন মাতৃভাষা এবং জাতীয় স্বাধিকারের মৌল জিজ্ঞাসা; সেখানে অধ্যবসায়ী শিক্ষক হয়েও তিনি বিচ্ছিন্ন, গজদন্তমিনারচারী ছিলেন না।

এ কে নাজমুল করিম শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থান করে সোনিয়া নিশাত আমিন বলেন, ড. করিম সম্ভবত উপমহাদেশের সেই পথিকৃৎ সমাজবিজ্ঞানী যিনি সমাজবিজ্ঞানের প্রয়োগপদ্ধতি নিয়ে বিশদ কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষকও। সমাজ ও রারে প্রগতিমুখীন অভিযাত্রা নিশ্চিত করতে যাঁরা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নীরবে কাজ করে গেছেন, তাঁদের অন্যতম এ কে নাজমুল করিম। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল মো. মাসকুরে সাত্তারের পরিচালানায় আবৃত্তি সংগঠন ‘বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ’-এর পরিবেশনা।

আজকের আয়োজন: আজ সোমবার অমর একুশে গ্রন্থমেলার ১৯তম দিন। মেলা চলবে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশের অর্থনীতি শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ, হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন এবং ফাহমিদা খাতুন। সভাপতিত্ব করবেন হাসনাত আবদুল হাই। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হবে সামিউন জাহান দোলার একক অভিনয়ে ধ্রুপদী অ্যাক্টিং স্পেস-এর নাটক নভেরা।

মানবকণ্ঠ/বিএএফ