রাজনীতিতে ফ্যাশনের ছোঁয়া

ফ্যাশনের সঙ্গে পরিবর্তন শব্দটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সব সময়ই ফ্যাশন পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে বয়ে যায়। আর পরিবর্তন সর্বজনীন। ছোঁয়াচেও বলা যায়। যে কোনো একটি বিষয়ে পরিবর্তন এলে তার ছোঁয়া লাগে আরো অনেক বিষয়ে। সর্বোপরি কথা, সব কিছুতেই পরিবর্তন চিরন্তন সত্য। সেটা রাজনীতিতেও। আর দ্রুত পরিবর্তন বা অতি পরিবর্তন পৌঁছে দেয় ফ্যাশনের পর্যায়ে। রাজনীতির ফ্যাশন নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো-

সময়ের পরিবর্তন
সময় গতিশীল। চলমান। চলে তার নিজস্ব গতিতে। স্বাভাবিকভাবেই টিকে থাকতে হলে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। আর এতেই দেখা মেলে পরিবর্তনের। সব ক্ষেত্রে এই একই সূত্র। দেশের শিল্প, অর্থ, বাণিজ্য, সামাজিক, রাজনৈতিক; সব পরিমণ্ডলেই। আর এ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আধুনিকায়ন হয় প্রতিটি সেক্টরে। লাগে প্রযুক্তির ছোঁয়া ফ্যাশনের ছোঁয়া। জনসম্মুখে নিজেকে একটু ভিন্নভাবে, গোছালোভাবে উপস্থাপন করতে একজন নেতার চেষ্টা কম থাকে না। আগেকার দিনে একজন রাজনীতিকের ধ্যান-জ্ঞান ছিল রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ঘিরে। পোশাক, পরিচ্ছদ নিয়ে অতটা ভাবনা আসত না। কিন্তু সময় বুঝিয়ে দিয়েছে, একজন নেতা শুধু অভিভাবকই নন। তিনি অনুসরণীয় ও অনুকরণীয়। তার কাছের কর্মী বা নতুন নেতারা তাকে অনুসরণ করেন। নেতা কোন স্ট্যাইলে চলাফেরা করে, নেতা কোন ব্র্যান্ডের পোশাক পড়ে, নেতা কোন জিনিসটি পছন্দ করেন তা থাকে কর্মীদের নখদর্পণে। তাই বর্তমান নেতাদের। সতর্ক থাকতে হয় ফ্যাশনের দিকেও। তাছাড়া রাজনীতি মোটেও স্থির বিষয় নয়। এটি খরস্রোতা নদীর পানির মতো। খুব সূক্ষ্ম দৃষ্টি ছাড়া এই নদীর পানির নিত্য পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ সম্ভব নয়। নির্দিষ্ট একটি সময় পরপর রাজনীতিতে পরিবর্তনের সীমারেখা আমরা হয়তো স্পষ্ট দেখতে পাই। কিন্তু পরিবর্তনটি ঘটে প্রতিটি মুহূর্তে, সময়ের প্রত্যেক বাঁকে বাঁকে। দিন যায়, পরিবর্তন হয়।

প্রযুক্তির ছোঁয়া
আজকের পরিবর্তনের পেছনে অন্যতম ভূমিকা প্রযুক্তির। কোথায় নেই প্রযুক্তির বিচরণ? জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে লেপ্টে রয়েছে প্রযুক্তি নামক ম্যাজিক প্রক্রিয়াটি। আর এ প্রযুক্তির ছোঁয়ায়ই আধুনিক থেকে আধুনিকতর হয়েছে রাজনৈতিক পরিমণ্ডল। আগেকার দিনে সাদা-কালো পোস্টার, হ্যান্ডবিলি, সভা-সমাবেশ ও টং দোকানের রং চায়ের মধ্যেই ছিল রাজনৈতিক প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্র। মাঝে মধ্যে গভীর রাতে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে গিয়েও চালানো হতো প্রচারণা। বর্তমানে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেখানে আধুনিকায়ন হয়েছে। রাজনৈতিক আলোচনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে মুহূর্তেই। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যোগাযোগ রয়েছে নোতকর্মীর। প্রতিদিন সভা সমাবেশের কোনো প্রয়োজন হচ্ছে না। ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসআ্যাপসহ নানা মাধ্যমে থাকছে সরব উপস্থিতি। সাদা-কালো পোস্টাটের জায়গায় স্থান করে নিয়েছে রঙিন ফেস্টুন ব্যানার। বারোমাসই এখন এসব ফেস্টুন ব্যানার চোখে পড়ে মোড়ে মোড়ে। দেড়শ’ দুইশ’ টাকা খরচ করেই বড় বড় করে ছবি টাঙিয়ে নিজের প্রচার চালাতে পারেন উঠতি নেতারাও।

সখের বসে নেতা হওয়া
পেশা ব্যবসা বা অন্যকিছু। বেশ টাকা-পয়সা কামিয়েছেন। আশপাশে নাম-ডাকও ছড়িয়েছে বেশ। কিন্তু তৃপ্তি মেলে না। মনের মধ্যে উঁকি দেয় একটা স্বপ্ন- ‘নেতা হব।’ শুরু হয় বিশেষ কোনো দলের লেজুরবৃত্তি। ওই দলের নেতাদের সঙ্গে ভাব খাতির গড়ে তোলা। নানা সময়ে টাকা-পয়সা খরচ করা। এলাকায় যোগাযোগ বৃদ্ধি। শেষে নেতা হনও। এক্ষেত্রে ত্যাগী নেতাকর্মীরা থাকেন অবহেলিত। একটি মানুষ রাজনীতি করবে এটা স্বাভাবিক। রাজনীতি তার জ্ঞানের সীমাকে বৃদ্ধি করবে। অবহেলিত মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবে। একটি এলাকার সবাই নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলতে জানে না। একটি গোষ্ঠী দাবি-দাওয়া আদায় করতে জানে না- এজন্যই তারা নেতা নির্বাচন করে। যাকে বিশ্বাস করে, যিনি পারবেন বলে এলাকার মানুষ জানে তার হাতেই তুলে দেয় নেতৃত্বের ঝাণ্ডা। সেই নেতার চোখে স্বপ্ন দেখে সাধারণ মানুষগুলো। নেই নেতার মাধ্যমেই বিশ্বকে জানতে চায় তারা। নেতার অন্তর-বাইরে সব দৃষ্টি প্রসারিত করবে। তার পরিমণ্ডল অনেক বিস্তৃত হবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হুট করেই একজন এসে একপ্রকারের টাকার জোরে নেতা বনে যান। যাকে কখনো এলাকায় দেখা যায়নি কিংবা যিনি দেশেই ছিলেন না দীর্ঘদিন তিনিই এসে হাল ধরেন রাজনীতির। প্রতিনিধিত্ব করেন বিচ্ছিন্ন থাকা মানুষটিই। নিজের সখ পূরণ করতেই আসেন রাজনীতিতে। ফলে অবহেলিতই থেকে যায় সাধারণ বিশেষণে বিশেষায়িত মানুষগুলো।

নেতার জীবনাদর্শ
একজন নেতা, একজন অভিভাবক। একজন নেতা, একটি আদর্শ। একজন নেতা, একটি স্বপ্ন। পৃথিবীর সৃষ্টিলগ্ন থেকেই মানুষ সংঘবদ্ধ থাকতে ভালোবাসে। আদিম যুগে দলবদ্ধ হয়ে ফল-মূল সংগ্রহ থেকে শুরু করে আজকের সমাজবদ্ধ মানুষের নানা পরিবর্তন ঘটলেও ঐক্যমতে রয়েছে সেই আগের মতোই।
মানুষ যেখানে ব্যর্থ হয় সেখান থেকেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। সেই কাজটি বাস্তবায়নে খুঁজতে থাকে স্বপ্নের মানুষ। এভাবে একটি গোষ্ঠীর স্বপ্ন পূরণে নির্ধারিত হয় একজন নেতা। সেই নেতার ওপর ভর করেই দেখতে থাকে নানা স্বপ্ন। সেই নেতাকেই অনুসরণ করে নিজেকে যোগ্য করে তুলতে। নিজের স্বপ্নের বাস্তবায়নে। একজন নেতার জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা নেয় পরবর্তী প্রজš§। কখনো কখনো কোনো নেতা হয়ে ওঠেন সর্বজনীন। গোষ্ঠী, গোত্র, ধর্ম পেরিয়ে সবাই ধারণ করতে থাকেন তার আদর্শ। স্বভাবত কারণেই নেতাকেও থাকতে হয় সচেতন। নিজের চাল চলনে আনতে হয় নিয়ন্ত্রণ। নেতার পরিহিত পোশাকও হয়ে ওঠে আদর্শের পোশাক। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের মুজিব কোর্ট ও ভারতের মুদি কোর্ট উল্লেখ করা যেতে পারে।

আদর্শই মূল কথা
বর্তমান সময়ে রাজনীতিতে ফ্যাশনের ছোঁয়া লাগলেও মূখ্য হয়ে ওঠেনি। ফ্যাশনের চেয়ে একজন রাজনীতিকের আদর্শগত গুণই আসল বলে বিবেচ্য হয়। যদিও বর্তমান ফ্যাশনপ্রিয় রাজনীতিকদের আদর্শ নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। যেমন আমাদের দেশের রাজনীতিতে অন্যতম একটি সূত্র হচ্ছে- ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছুই নেই।’ অর্থাৎ কথা ঘোরানো বা এখন একটা তখন আরেকটা বলার নামই রাজনীতি। কিন্তু এটা তো আদর্শ হতে পারে না।
একজন নেতার আদর্শ তার কর্মী-সমর্থকদের জন্য একটি মাইলফলকের মতো। নেতৃত্ব হলো এমন এক সামাজিক প্রভাবের প্রক্রিয়া, যার সাহায্যে মানুষ কোনো একটি সর্বজনীন কাজ সম্পন্ন করার জন্য অন্যান্য মানুষের সহায়তা ও সমর্থন লাভ করতে পারে। নেতৃত্বের ধরন বিভিন্ন রকম হতে পারে। একজন রাজনীতিকে অনেকগুলো কৌশল থাকবে এটা স্বাভাবিক; তবে মিথ্যা বা অন্যায়ের আশ্রয় নেয়া তো আদর্শবান নেতার কাজ হতে পারে না। একজন নেতার যত গুণ থাকবে তার মধ্যে নিশ্চয়ই উঁচু স্থানে অবিচল থাকবে আদর্শ। – রাজনীতি ডেস্ক