রাজধানীতে লেগুনা বন্ধে যাত্রীদের দুর্ভোগ

আকস্মিকভাবে লেগুনা বন্ধের সিদ্ধান্তে রাজধানীতে দেখা দিয়েছে গণপরিবহন সংকট। গত ৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে লেগুনা বন্ধের ঘোষণা দেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। এমন ঘোষণার পর থেকেই রাজধানী প্রায় লেগুনাশূন্য হয়ে গেছে। দু’একটি রুটে অল্প কিছু লেগুনা চললেও বেশিরভাগ রুটেই রয়েছে বন্ধ। এর ফলে লেগুনার চালক ও সহকারীদের সামনে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। মহানগরে বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা চালু না করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত সংকট আরো বাড়াবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মিরপুর ১ নম্বর ও মিরপুর ১০ নম্বরে লেগুনা স্ট্যান্ডে কোনো লেগুনা চলাচল করছে না। নিউমার্কেট থেকে ফার্মগেট, ধানমণ্ডি থেকে ফার্মগেট এবং মোহাম্মদপুর থেকে গুলশান-বাড্ডা কিংবা গাবতলী থেকে মহাখালীগামী লেগুনাও দেখা যায়নি সড়কে। গুলিস্তান থেকে পুরান ঢাকার লেগুনা চললেও সংখ্যায় ছিল খুবই কম।

ফার্মগেট থেকে ধানমণ্ডি ৯/এ তে যাওয়ার জন্য সাইফুল আজম নামের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী বলেন, প্রতিদিন লেগুনাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করি। কিন্তু আজকে দেখছি কোনো লেগুনা নেই। এ রুটে যাতায়াতে কোনো বাসও নাই। ক্লাস শুরুর আর মাত্র আধ ঘণ্টার মতো বাকি আছে। এখন কি যে করি বুঝতে পারছি না।

এ ছাড়া ফার্মগেটে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং করতে আসা শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই লেগুনায় যাতায়াত করছেন। কিন্তু লেগুনা বন্ধের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং করতে আসা এসব শিক্ষার্থীরা পড়েছে চরম দুর্ভোগে। গ্রীন রোডের স্টাফ কোয়ার্টার থেকে ফার্মগেটের ইউসিসিতে কোচিং করতে আসা ইসরাত জাহান নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, স্টাফ কোয়ার্টারের সামনে থেকে ১২ টাকা দিয়ে লেগুনায় চলে আসতাম ফার্মগেট। কিন্তু রিকশায় করে এসে খরচ হলো ৩০ টাকা। বিকল্প ব্যবস্থা না করে এভাবে হঠাৎ করে লেগুনা বন্ধ করে দেয়া মোটেও ঠিক হয়নি। এতে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ভেগান্তি আরো বেড়েছে।

জানা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন রুটে হিউম্যান হলারের চলাচলের অনুমতি বা রুট পারমিট দেয় মহানগর আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি বা মেট্রো আরটিসি। ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার পদাধিকার বলে এর প্রধান। বিআরটিএর একজন উপপরিচালক সদস্য সচিব। এ ছাড়া মালিক সমিতি, শ্রমিক কমিটি, জেলা প্রশাসন, বিআরটিসিসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা আরটিসির সদস্য।

ডিএমপির ঘোষণার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাড়ছে না কোনো লেগুনা। রাস্তার ধারে সারিবদ্ধ লেগুনা রেখে উদ্বিগ্ন সময় কাটছে চালক-সহকারীদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফার্মগেট এলাকায় কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশের এক সার্জেন্ট বলেন, শুধু ফার্মগেট থেকেই বিভিন্ন রুটে প্রায় ১ হাজার লেগুনা যাতায়াত করত। বিশেষ অভিযানের আগে এসব লেগুনার অধিকাংশেরই বৈধ কাগজপত্র ছিল না। তবে অভিযান শুরু হওয়ায় প্রায় ৪০ শতাংশ লেগুনার সঠিক কাগজপত্র করেছে। পাশাপাশি লাইসেন্সহীন চালকেরাও অভিযানের পর বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স করেছে।

ফার্মগেটের লেগুনা চালক নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা বিআরটিএ থেকে বৈধ কাগজপত্র নিয়ে লেগুনা চালাচ্ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে এটি বন্ধ করায় আমরা যেন অথৈ সাগরে পড়েছি। কারণ অনেকেই ব্যাংক ঋণ নিয়ে লেগুনা কিনেছেন। এটি চালিয়েই কিস্তি শোধ করা হতো। লেগুনা বন্ধ হওয়ায় এসব মানুষ এখন দিশেহারা। তিনি বলেন, আমরা মানুষের সেবা করি। আমাদের পেটে লাথি মেরে লাভ কি? দৈনিক যা ইনকাম করতাম তাতে আমার সংসার ভালোভাবেই চলছিল। কিন্তু এখন আমরা কি করব? কীভাবে খাব? এর জবাব কেউ দিতে পারবেন? আমরা চাই, যেন মানবিক দিক বিবেচনা করে আমাদের রুট পারমিট দেয়া হয়।

হাজারীবাগের ট্যানারি মোড়-নীলক্ষেত রুটের নিলয় বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক বলেন, লেগুনা চলাচলের রুট পারমিট তো বিআরটিএ দিয়েছে। কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না করে আকস্মিকভাবে এটি বন্ধের সিদ্ধান্ত কি কারণে কর্তৃপক্ষ নিয়েছেন, তা বুঝতে পারছি না। তবে এর ফলে খেটে খাওয়া অনেক মানুষ পথে বসে যাবে। কারণ এসব গাড়ি অনেকেই ব্যাংক ঋণ নিয়ে কেনা। এ সিদ্ধান্তটি মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার মতো অবস্থা হলো।

তিনি বলেন, কিছু দিন ধরেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়াকড়িতে রাজধানীতে বাসের সংখ্যা কম। এর মধ্যে আবার লেগুনা বন্ধ করায় রাজধানীর সাধারণ মানুষকে পড়তে হয়েছে আরো ভোগান্তিতে।

জানা গেছে, ঢাকা শহরে হিউম্যানহলার নামে নিবন্ধিত যানের সংখ্যা পাঁচ হাজার ১৫৬টি। তবে নগর জুড়ে এ ধরনের গাড়ি চলছে বিশ হাজারের বেশি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মীর মো. রেজাউল আলম বলেন, রাজধানীর মধ্য থেকে লেগুনার আধিক্য আমরা কমিয়ে আনব। কারণ সড়ক দুর্ঘটনার এটি একটি অন্যতম কারণ। এটা নিয়ে ইতিমধ্যেই আমরা কাজ শুরু করেছি। রিঅ্যারেঞ্জ করে পেরিফেরিতে নিয়ে যাব। তারা যেন আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন না হয়।

মানবকণ্ঠ/ডিএইচ