রাজধানীতে বেড়েই চলেছে ডেঙ্গু রোগী

রাজধানীতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। গত জুন মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ২৬৭ জন থাকলেও চলতি মাসের প্রথম ২৫ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯০ জনে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এভাবে বেড়ে চললেও দুই সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এর প্রতিরোধে কার্যকরী তেমন পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ জানান, ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশা। ওই মশার কামড়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় মানুষ। হাসপাতালে এখন প্রতিদিনই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে এ রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা উপযুক্ত চিকিৎসায় একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর সুস্থ হয়ে উঠছে। কিন্তু ডেঙ্গু জীবাণুর উৎস এখনো বন্ধ হয়নি। ওই কারণে মৃত্যুর হার কমে গেলেও আক্রান্ত হওয়ার প্রকোপ কমছে না। মূলত ডেঙ্গুর উৎস বন্ধ না হলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকেই যাবে।

জানা গেছে, রাজধানী ঢাকায় বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরের বাহক এডিস মশার উপদ্রব বাড়ে। এ সময়কে ডেঙ্গু জ্বরের মৌসুম ধরা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে আগাম বৃষ্টি হওয়ায় আগে ভাগেই মশার উপদ্রব বাড়ে। তারপর থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকছে। আর ওসব স্থানেই বংশবিস্তার করছে এডিস মশা। বর্ষা মৌসুম এডিস মশার বিস্তার ও প্রজননের সবচেয়ে অনুকূল সময়। ফলে ঢাকায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার ও বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র এক সভায় এডিস মশার জীবাণু পেলে বাড়ির মালিককে জেল ও জরিমানা করার ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি ডিএসসিসির পক্ষ থেকে এডিস মশার লার্ভা ও প্রজননস্থল ধ্বংসের কার্যক্রম পরিচালনায় প্রত্যেক ওয়ার্ডে একটি করে কমিটি করা হয়েছে। চলতি বছর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মোট ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে একজন ও গত দুই মাসে তিনজন করে মোট ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ২২ জন ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৫৭ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও স্বাস্থ্য অধিদফতর নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ইনচার্জ ডা. আয়েশা আখতার বলেন, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মোট ৯৫৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। তাদের মধ্যে মোট সাতজন মারা গেছেন।
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, হাসপাতাল-ক্লিনিক ছাড়াও চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে ডেঙ্গু রোগীর আগমন বাড়লেও ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনেরই বিশেষ মশক নিধন কার্যক্রম চালু নেই। পানি মেশানো ওষুধ ছিটানোর মাধ্যমেই ডিসিসি দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখছে। মশক নিধন কার্যক্রমের বরাদ্দ নিয়ে লুটপাটের খেলা চলে। তাছাড়া ডিসিসির ওই বিভাগের সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোনো যোগাযোগ থাকে না। ডিসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনে ওই কার্যক্রম চালিত হয়ে থাকে। তারা স্বাভাবিক মশক নিধন কার্যক্রম ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখেন না। ফলে এডিস মশা নিধনে বিশেষ সফলতা পাওয়া যাচ্ছে না।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ঢাউসিক) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাকির হাসান বলেন, ঢাউসিক অন্তর্ভুক্ত এলাকায় নিয়মিতভাবেই মশা নিধনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এর পাশাপাশি এডিস মশার লার্ভা ও প্রজনন স্থল ধ্বংসেরও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে মশা নিধন কর্মীদের ইতিমধ্যে প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন খিলক্ষেতের উত্তর নামাপাড়ার হাজী সফুরুদ্দিনের বাড়ির (বড়বাড়ী) সামনে ও আশপাশ এবং বাড়িটির ১শ’ গজ পূর্ব দিকে সফুরুদ্দিনেরই গোয়ালঘর ও তার আশপাশের নোংরা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ দেখলে যে কারোরই বুঝতে অসুবিধা হবে না এটি এডিস মশার লার্ভা ও নিরাপদ প্রজননস্থল। অথচ এর পাশেই বসবাস সংরক্ষিত ওয়ার্ড ১ এর স্থানীয় কাউন্সিলর শাহনাজ পারভীন মিতুর পরিবার। তবুও এর প্রতি যেন তারা উদাসীন। এভাবেই খিলক্ষেতসহ রাজধানীর অনেক স্থানেই রয়েছে এডিস মশার লার্ভা ও প্রজননের নিরাপদ স্থান।

রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তি ও পারিবারিক জনসচেতনতার বিকল্প নেই। বর্তমানে রাজধানীসহ সারাদেশে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে বাসাবাড়ির আঙিনাতে ফুলের টব, টায়ার, ফ্রিজ ও এসিতে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা লার্ভা ছাড়ছে। ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে যেসব জায়গায় মশা জš§ নেয়, ওইসব জায়গা পরিষ্কারে নগরের প্রত্যেক নাগরিককে সচেতন হতে হবে। নিজ বাড়ির আঙিনা ও চারপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। মশার ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি ঘুমানোর সময় প্রয়োজনে মশারি টানাতে হবে বলে তারা মন্তব্য করেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০২ সালে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ২৩২ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন। তবে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বেশি মৃত্যু হয় ২০০০ সালে। ওই বছর ৯৩ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৬ সালে হঠাৎ করে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৬ হাজার ৬০ জনে বৃদ্ধি পায়। সে বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় ১৪ জনের। ২০১৭ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৭৬৯ জন ও মৃতের সংখ্যা ৮ জন।

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে ডেঙ্গু না থাকলেও চলতি বছরের ওই মাসে ডেঙ্গু রোগী ছিলেন ৯১ জন। ২০০৭ সালের জুলাই মাসে প্রথম ডেঙ্গু জ্বর ধরা পড়ে এবং রোগীর সংখ্যা ছিল ৮৫। অন্যদিকে, চলতি বছরের জুলাই মাসে ডেঙ্গু রোগী ছিলেন ২৩৪ জন। ২০০৭ সালে মোট ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ৪৬৬ জন, ২০০৮ সালে এক হাজার ১৫৩ জন, ২০০৯ সালে ৪৭৪ জন, ২০১০ সালে ৪০৯ জন, ২০১১ সালে এক হাজার ৩৫৯ জন, ২০১২ সালে ৬৭১ জন, ২০১৩ সালে এক হাজার ৭৪৯ জন, ২০১৪ সালে ৩৭৫ জন, ২০১৫ সালে তিন হাজার ১৬২ জন, ২০১৬ সালে ছয় হাজার ৬০ জন, ২০১৭ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৭৬৯ জন ও মৃতের সংখ্যা ৮ জন। আর চলতি বছরের ২৫ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত মোট ৯৫৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

আর চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৭ জনের। আইইডিসিআরের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএসএম আলমগীর বলেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বাহক একই এডিস মশা। কিন্তু যেহেতু এবারে চিকুনগুনিয়ার কারণে এডিস মশা নিধনের কাজ চলেছে, তাই ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা কম হতে পারে। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দ্য হু স্ট্রাটেজিক অ্যাডভাইজারি গ্রুপ অব এক্সপার্টস (এসএজিএ) বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিশ্বে বিগত ৬ দশকে মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৩০ গুণ বেড়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশে উদ্বেগজনক হারে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ফলে রোগ প্রতিরোধে নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন থাকা জরুরি হয়ে পড়েছে।

বিশ্বের মোট ১২৮টি দেশের প্রায় ৩৯ কোটি লোক প্রতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। এদের মধ্যে মাত্র ৫ লাখ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে হলে মশক নিধনে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনকে আরো সক্রিয় হতে হবে। এ লক্ষ্যে সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই সিটি কর্পোরেশনের মশক নিধন কাযর্ক্রম আরো জোরদার করা দরকার। ব্যক্তি সচেতন হলে মশাবাহিত এই রোগ হ্রাস পেতে পারে, এমনটি মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক কাযর্ক্রমও ব্যাপক হারে বাড়ানো দরকার।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ