রাজধানীতে বাড়ছে ছাদবাগান

রাজধানীতে বাড়ছে ছাদবাগান

রাজধানীর বেশিরভাগ ভবনের ছাদ পড়ে আছে ফাঁকা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এসব ছাদ সবুজ করে তুলতে আগ্রহ বাড়ছে নগরবাসীর। ছাদবাগানে উৎসাহ দিতে কাজ করছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। আবার নগরের ভবনের ছাদ সবুজ করতে কর ছাড় দিচ্ছে সিটি কর্পোরেশনও।

জানা গেছে, নগরীর ছাদ বাগানে ফল, ফুলের গাছ যেমন আছে তেমনি আছে সবজি এবং ঔষধি গাছ। ক্যাকটাস, বনসাই, অর্কিড ও দেশীয় ফুলের সহাবস্থান কল্যাণপুরের মিতুল-মিন্তি দম্পতির বাড়িতে। বাদ যায়নি ছাদের কার্নিশ, বারান্দা, এবং সিঁড়িও। বাড়ির মালিক ছাড়াও যারা ভাড়া বাসায় থাকেন অথবা সরকারি কোয়ার্টারে তাদের অনেকেই ছাদে গাছ লাগাতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

রাজধানীর কল্যাণপুরের মিতুল-মিন্তি দম্পতি তাদের বাসার ছাদে সব রকমের গাছই লাগিয়েছেন। তাদের এই ছাদ বাগানে ঔষধি গাছের মধ্যে আছে থানকুনি, তুলসী, তিন রকমের পুদিনা, অ্যালোভেরাসহ অনেক কিছু। ফলের মধ্যে রয়েছে দুই রকমের আম, তিন রকমের পেয়ারা, মালবেরি, ড্রাগন ফ্রুট, থাই জামরুল, মালটা, লেবুসহ আরো অনেক ধরনের ফল গাছ। মসলার মধ্যে রয়েছে অরিগানো, দারুচিনি, কারিপাতা, তেজপাতা, চুই এবং পোলাও পাতা। সবজির মধ্যে আছে ফুলকপি, চেরি টমেটো, স্কোয়াস, চায়না ক্যাবেজ, চায়না সুপারলিফ, চায়না লেটুস, বিভিন্ন ধরনের শাক, গাজরসহ আরো অনেক সবজি। এ রকম বাগান করার কারণ তুলে ধরে বিন্তি বলেন, ‘আমরা মানসিক চাপ থেকে ?মুক্তি বা বিনোদনের জন্য অন্য কোথাও যাওয়ার প্রয়োজনই মনে করি না। বাসার ছাদের এই বাগান স্ট্রেস অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। এছাড়া, এখান থেকে অক্সিজেন তৈরি হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আশার কথা হচ্ছে, আমাদের দেখাদেখি আশপাশের বাড়িতেও বাগান হচ্ছে।’ এছাড়াও উদ্বুদ্ধ হয়ে ছাদবাগান করছেন গণমাধ্যমকর্মী আবুল হাসান হৃদয়। তিনি তার বনশ্রীর বাড়ির ছাদে শুরু করেছেন ছাদবাগান করা। ফল ও ফুলের গাছ দিয়েই তিনি এ বাগান শুরু করেছেন।

এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন ঘোষণা দিয়েছেন, যারা বাড়ির ছাদে বা আঙিনায় বাগান গড়ে তুলবেন, তাদের বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স ১০ শতাংশ মওকুফ করা হবে।

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিকালচারাল বোটানি বিভাগের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পরিবেশ সুরক্ষায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে শহরাঞ্চলে বাড়ির ছাদে বাগান করার বিকল্প নেই। পৃথিবীর অনেক দেশে এখন ছাদে বাগান করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহম্মেদ নিজেও তার বাড়ির ছাদে বাগান করেছেন। তিনি বলেন, গাছের অভাবে শহর উত্তপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ঢাকা শহরেই আমরা যদি কোনো উদ্যানে প্রবেশ করি তাহলে সেখানে এক রকম তাপমাত্রা আর সেখান থেকে বের হলে তাপমাত্রা কমপক্ষে ২ থেকে ৩ ডিগ্রি বেশি। এতেই বোঝা যায় আমাদের জন্য গাছ কতটা প্রয়োজনীয়। গাছের অভাবে পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা যদি আমাদের বাড়ির ছাদে গাছ লাগাই তাহলে খুব সহজেই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার উদ্যোগে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ২৫০টি ছাদবাগান করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ছাদ বাগানে ফুল, ফল, শাকসবজি সব কিছু করা সম্ভব বলে তিনি জানান।

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা মতে, ছাদের বড় অংশ সবুজে ঢাকা থাকলে সেখানে বায়ুর গড় তাপ হবে ৩২ দশমিক ০৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যেখানে বাগান ছাড়া ছাদের বায়ুর গড় তাপ পৌঁছায় ৩৫ দশমিক ৯৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এছাড়া, ছাদবাগানের বাড়িতে আশপাশের পরিবেশ চেয়ে প্রায় ৭০ পিপিএম কার্বন-ডাই-অক্সাইড কম থাকে।

এদিকে ছাদবাগানকে জনপ্রিয় করতে কাজ করছে কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। এমন এক সংগঠন গ্রিন বাংলাদেশের অনলাইনে সদস্য প্রায় ৫০ হাজার।

এছাড়া চারা বিতরণ ছাড়াও ছাদকৃষি ও গাছের পরিচর্যাবিষয়ক পরামর্শ দিতে নাইনটি মিনিট স্কুল গড়ে তুলেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এএফএম জামাল উদ্দীন।

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এ সময়ের একটি বড় সমস্যা। বলা হচ্ছে, উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে যেসব দেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি বেশি, বাংলাদেশ তার সামনের সারিতে রয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ন ও বন উজাড় করা। ইট-পাথরের রাজধানী ঢাকায় সুউচ্চ ভবনের ঠাস বুনটে বড় গাছের দেখা পাওয়া বিরল ঘটনা। অথচ ঢাকার তাপমাত্রা যে হারে বাড়ছে তাতে লাগাম টানতে বেশি করে গাছ লাগানোর ওপর জোর দিচ্ছেন পরিবেশবিদরা।

এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকা শহরের প্রায় ৬০ শতাংশ জায়গা কংক্রিটের কাঠামো যা মূলত শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করছে। ঢাকার পরিবেশ দূষণ বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় অনেক বেশি। অধিক জনসংখ্যা, অতিরিক্ত নগরায়ন, যানবাহন, জলাধার ও গাছপালা কমে যাওয়াই এর মূল কারণ। ১৯৮৯ সালে ঢাকা শহরের গাছপালার পরিমাণ ছিল ২৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। যা ধীরে ধীরে কমে ১৯৯৯ ও ২০০৯ সালে যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ ও ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে ১৯৮৯ সালে ঢাকা শহরের বাৎসরিক গড় তাপমাত্রা ছিল ১৮-২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা ২০০৯ সালে বেড়ে হয়েছে ২৪-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

অপরিকল্পিত আবাসন এবং রাস্তাঘাট নির্মাণের ফলে কমে যাচ্ছে উন্মুক্ত স্থান, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে গাছপালা। এতে এ মহানগরীর তাপমাত্রা দিন দিন অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। বিশুদ্ধ অক্সিজেনের যোগান কমছে। ঢাকায় উন্মুক্ত স্থানের যথেষ্ট অভাব বলে খালি জায়গায় গাছ লাগানোর সুযোগ কম। এ অবস্থায় ভবনের ছাদে বাগান করে ঢাকার পরিবেশ পাল্টে দেয়া সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

পরিবেশবাদীদের সংগঠন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সভাপতি আবু নাসের খান বলেন, ‘ক্রমাগত তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ঢাকা শহর ধীরে ধীরে হট চেম্বারে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু একটু উদ্যোগী হলেই আমরা ইটের বস্তি ঢাকাকে বাগানে পরিণত করতে পারি। ক্রমাগত বৃক্ষ নিধনের ফলে ঢাকা মহানগরী আশঙ্কাজনক হারে বৃক্ষশূন্য হয়ে আসছে। ফলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ঢাকার তাপমাত্রা বাড়ছে, জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া, ছাদে বাগান থাকলে পরিবারের একটি বিনোদনের জায়গাও গড়ে ওঠে; সবার মধ্যে মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। বাচ্চাদের গাছপালা ও পশুপাখির প্রতিও ভালোবাসা বাড়ে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এক্ষেত্রে নগরবাসীকে কারিগরি সহযোগিতার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যেমন, ছাদেবাগান করলে দেয়ালে ড্যাম্প হতে পারে। সেক্ষেত্রে কী করলে তা এড়ানো যায়, তার পরামর্শ দিয়ে নগরবাসীকে সহায়তা সরকারিভাবেই করা যেতে পারে। এছাড়া, হোল্ডিং ট্যাক্স কমানোর মতো নানারকম সুযোগ-সুবিধা এ কাজে আরো উৎসাহ বাড়াতে পারে।’

শিক্ষাভবন সংলগ্ন রাস্তার দু’পাশে রয়েছে কয়েকটি নার্সারি। সেখানকার চারা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গাছের সঙ্গে মানুষের আত্মীয়তা বেড়েছে। প্রতিদিন প্রচুর চারাগাছ বিক্রি হয়। এর মধ্যে ফুল এবং ফল গাছের চাহিদা বেশি। এই এলাকার চারা বিক্রেতা নাসিম বলেন, ‘নানারকমের মানুষ আসে। কেউ বাসা সাজানোর জন্য ফুল গাছ নেয় আবার কেউ চাষ করার জন্য ফল গাছ। এই সিজনের আগে আম গাছের চারা বিক্রি করলাম অনেকগুলো। ফলের মধ্যে পেয়ারা আর লেবু গাছের চাহিদা বেশি। অনেকে আবার সারও খোঁজেন। এর পাশাপাশি নানা রঙের টবও চান অনেকে।’

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিকালচারাল বোটানি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুব ইসলাম বলেন, বিভিন্ন প্রকারের ছাদ বাগানকে বিবেচনায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানি বিভাগের ছাদে ছাদ বাগানের একটি মডেল তৈরি করা হয়েছে। যেখানে বাগানের মোট ক্ষেত্রফলের সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ রাস্তা, ১০ শতাংশ বসার জায়গা, ৪০ শতাংশ শাকসবজি, ১০ শতাংশ ফুল ও শোভাবর্ধক গাছ, ২০ শতাংশ ফল, মসলা ও ঔষধি এবং ৫ শতাংশ অন্যান্য গাছের জন্য বিবেচনায় রেখে বাগানের মডেলটি ডিজাইন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ছাদ যত ছোট-বড়ই হোক বাগান করা যাবে। এতে ছাদের কোনো ক্ষতি হবে না। শুধু দরকার সঠিক পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন। পছন্দের সবজি বাগান করা গেলে অর্গানিক শাকসবজি ও ফলমূল পাওয়া সম্ভব বলে তিনি জানান।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.