রাজধানীতে ডজনখানেক জালনোট চক্র সক্রিয় : মিলছে জাল টাকা তৈরির কারখানা

ঈদকে কেন্দ্র করে জাল টাকা তৈরির জালিয়াত চক্রগুলো বাজারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। খোদ রাজধানী ও আশপাশ এলাকায় সক্রিয় রয়েছে অন্তত ১২ থেকে ১৫টি চক্র। প্রতিটি চক্রে ১০ থেকে ১৫ জন করে সদস্য রয়েছে। ঈদ মৌসুমে কোটি কোটি টাকার ‘নিখুঁত’ জালনোট রাজধানীসহ সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত এসব জালনোটের কারবারি। জালিয়াত চক্রের দক্ষ কারিগরদের তৈরি ‘নিখুঁত’ জাল টাকাতেও নিরাপত্তা সুতা বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সাধারণভাবে দেখে সেগুলোকে জাল বলে ধরার কোনো সুযোগই নেই বলে মনে করেন একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

ওই কর্মকর্তারা জানান, এসব অবৈধ কারবারি বার বার আটক হলেও আইনের ফাঁক-ফোঁকরের কারণে পার পেয়ে যাচ্ছে। ছাড়া পেয়ে আবার শুরু করছে একই জালিয়াতি কারবার। তথ্যমতে, এসব চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করা হলেও ৭৫ শতাংশ জামিনে মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে।

সবশেষ ৭ জুন রাজধানীর কদমতলীসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে কোটি টাকার জাল টাকা উদ্ধার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সেখানে মিলেছে জাল টাকার তৈরির অবৈধ কারখানা। এ ঘটনায় জড়িত চক্রটির ১০ সদস্যকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। এর ২ দিন আগে শ্যামপুরে সন্ধান পায় আরেকটি জালনোট তৈরির কারখানার। সেখান থেকেও ৪৫ লাখ টাকার জালনোটসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে ডিবি।

গোয়েন্দা সূত্রের তথ্যানুযায়ী, রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকায় জালনোট তৈরির অন্তত ১২ চক্রে অন্তত শতাধিক কারিগর সক্রিয় রয়েছে। ঈদ সামনে রেখে বেড়ে গেছে তাদের ব্যস্ততা। এদিকে জালনোট প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, বিশেষ ধরনের পুরু কাগজে ছাপা ও তাতে থাকছে জলছাপ ও নিরাপত্তা সুতা। আসল টাকার নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য হিসেবে সাধারণত এসবই লক্ষ্য করে মানুষ। কিন্তু তাতেও এখন আর জাল টাকা চেনার উপায় নেই। দক্ষ কারিগরদের তৈরি নিখুঁত জাল টাকাতেও এসব নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, জাল টাকা কারবারিদের গ্রেফতার অভিযান চলছে। তাদের ৪টি চক্রের সদস্যরা জেলহাজতে আছে। বর্তমানে যারা বাইরে আছে তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। ঈদ কেন্দ্র করে ৫ কোটি টাকার জালনোট বাজারে ছাড়ার টার্গেট ছিল এই জালিয়াত চক্রের।

উদ্ধার হওয়া জাল টাকা আগের চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত উল্লেখ করে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, উদ্ধার হওয়া জাল টাকায় নিরাপত্তা সুতা স্থাপন করা হয়েছে। এসব নিরাপত্তা সুতা তারা কীভাবে জোগাড় করেছে সেই ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সাধারণ চোখে বোঝা খুবই কঠিন যে এটা জাল টাকা। তবে আসল টাকা কিছুটা খসখসে ও জাল টাকা বেশি মসৃণ বলে জানান তিনি।

ডিবি ও র‌্যাবের একাধিক কর্মকর্তা জানান, জালনোট তৈরির চক্রগুলোর ঈদ মৌসুমে ভেজাল টাকা নিখুঁত করার ব্যাপারে প্রতিযোগিতা চলে। কারণ যে চক্রের টাকা যত নিখুঁত, তার টাকার দাম তত বেশি, বিক্রিও বেশি। ১ লাখ টাকার বান্ডেল ১২ হাজার থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ১২ থেকে ১৫টি জালনোট চক্র সক্রিয় রয়েছে। প্রতিটি চক্রে ১০ থেকে ১৫ জন করে রয়েছে। তাদের অনেককেই বিভিন্ন সময়ে জাল টাকাসহ আটক হয়েছে। তবে এদের অধিকাংশই জামিনে বেরিয়ে ফের একই পেশায় জড়িয়ে পড়ছে।

ওই কর্মকর্তারা জানান, জাল টাকা তৈরির প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো বিশেষ ধরনের কাগজ তৈরি। এ ক্ষেত্রে সাধারণ সাদা কাগজের ওপরে স্ক্রিনপ্রিন্টের মাধ্যমে হালকা রঙের ছাপ দেয়া হয়। এতে কাগজে নকল জলছাপ তৈরি হয় ও কাগজের পুরুত্ব বাড়ে। তার পর টাকার নিরাপত্তা সুতা আঠা দিয়ে কাগজে লাগানো হয়। রুপালি রঙের চকচকে এই সুতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের লোগো ও টাকার পরিমাণ লেখা থাকে। এই সুতাও বিশেষভাবে কম্পিউটার গ্রাফিক্সের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। সুতা বসানোর পর পাতলা ট্রেসিং পেপার মূল কাগজের ওপর আঠা দিয়ে লাগানো হয়। এ পর্যায়ে কাগজটিকে আসল টাকার কাগজের মতোই মনে হয়।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক ও মুখপাত্র কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, জাল টাকা তৈরি, বিস্তার ও বিক্রি রোধে আমরা সবসময় কাজ করে যাচ্ছি। রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে আমাদের গোয়েন্দা টিম, মোবাইল কোর্ট ও টহল টিম রাতদিন কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতেও অভিযান পরিচালনা করা হয়। জাল টাকার বিষয়টি পুলিশ, র‌্যাবসহ সংশ্লিষ্টদের নজরে রয়েছে।

অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ঈদ বা যে কোনো বড় উৎসবকে ঘিরে অর্থের লেনদেন বেড়ে যায়। এ সুযোগে তৎপর হয়ে উঠে জালনোট ব্যবসায়ীরা। তবে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে সক্রিয় রয়েছেন গোয়েন্দারা। ইতোমধ্যেই একাধিক চক্রকে আটক করেছে পুলিশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.