রাক্ষুসে নদ ভাঙনে ক্ষতবিক্ষত মৌলভীবাজার

মৌলভীবাজারে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কমতে শুরু করেছে পানি। মনু নদের পানি বিপদ সীমার ১৮০ সেন্টিমিটার থেকে কমে ৬৮ সেন্টিমিটার ওপর ও ধলাই নদীর পানি বিপদ সীমার নিচ দিয়ে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি কমতে শুরু করলেও কমছে না পানিবন্দি হওয়া ৩ লক্ষাধিক মানুষের দুর্ভোগ। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ৩টি উপজেলার সঙ্গে স্বাভাবিক হয়েছে সড়ক যোগাযোগ।

তবে শমশেরনগর-চাতলাপুর চেকপোস্ট সড়কের একটি ব্রিজ দেবে যাওয়ায় ভারতের সঙ্গে বন্ধ রয়েছে সড়ক যোগাযোগ। কমলগঞ্জ উপজেলা এবং সিলেটের সঙ্গে এখনো সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। পানি কমে যাওয়ায় দৃশ্যমান হচ্ছে ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কও। চলমান গতিতে পানি কমতে থাকলে ১ থেকে ২ দিনের মধ্যে সড়ক থেকে পানি পুরোপুরি নেমে যাবে বলে আসা করছেন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা। এদিকে বিধ্বস্ত বাড়িঘর মেরামত না করে আশ্রয় কেন্দ্র থেকে ফিরতে পারছেন না ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ। এদিকে মঙ্গলবার মনু নদীর ভাঙন এলাকায় দুর্গত মানুষের সহযোগিতায় আসা সেনাবাহিনীও ফিরে গেছে। ভাঙনের ফলে পানির স্রোতে ভেসে মারা গেছে ১১ জন।

এদিকে মনু নদীর পানি কমতে শুরু করলেও সৃষ্ট ভাঙন দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া পানি এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকি ও রাজনগরের কাউয়াদীঘিতে গিয়ে পড়ায় হাওরাঞ্চলে পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাওরাঞ্চলের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করতে সোমবার মৌলভীবাজার এসেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও গতকাল মঙ্গলবার এসেছেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন।

সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। তবে সৃষ্ট ভাঙন দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া পানি এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকি ও রাজনগরের কাউয়াদীঘিতে গিয়ে পড়ায় হাওরাঞ্চলে পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাওরাঞ্চলের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের পানি কিছুটা কমে যাওয়ায় তারা বাড়িঘর মেরামত করার চেষ্টা করছেন। তবে বিধ্বস্ত বাড়িঘর মেরামত না করে আশ্রয় কেন্দ্র থেকে ফিরতে পারছেন না ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ।

এদিকে বন্যার পানির সে াতে অনেক যায়গায় রাস্তাঘাট ভেঙে গেছে। নিচ থেকে মাটি বের হয়ে গেছে। সেনাবাহিনী, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও স্থানীয় উদ্যোগে রাস্তা মেরামত করে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। তবে মনু নদের পানি বিপদ সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এবং শহর রক্ষাবাঁধ চরম ঝুঁকিতে পড়ায় সাইফুর রহমান রোড সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়। যা এখনো বন্ধ আছে। পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত হওয়ার পর সড়কটির যান চলাচল স্বাভাবিক করে দেয়া হবে বলে জানান পৌর কর্তৃপক্ষ।

অপরদিকে পৌরসভার মনু নদের প্রতিরক্ষা বাঁধের বারইকোনা স্পটে ভাঙনকৃত স্থানটিতে মেরামত কাজ শুরু করেছে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। পৌর মেয়র ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে মঙ্গলবার মেরামত কাজ শুরু হয়। ভাঙনকৃত অন্যান্য স্থানগুলো পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত মেরামত না করলে ফের বৃষ্টি হলে আবারো ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।

জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, জেলায় মনু ও ধলাই নদের পানি বৃদ্ধির কারণে বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধের ২৫ স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে ৪ উপজেলার ৩০ ইউনিয়নের ৩ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। ৫ হাজার ৩৯০ জনকে উদ্ধার করে ৫০টি আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়া হয়। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করতে ১৬ জুন শনিবার সকাল থেকে সেনাবাহিনীর ৪টি টিম বন্যাদুর্গত এলাকায় কাজ করছে। সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে ৭৪টি মেডিকেল টিম বন্যাকবলিত এলাকায় কাজ করছে। সেনাবাহিনীর ২১ ইঞ্জিনিয়ার্সের একটি ইউনিট, জেলা পুলিশ, ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়ন, স্বাস্থ্য বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস, বিএনসিসি, রেড ক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থাও কাজ করছে। দুর্গত এলাকা থেকে জরুরি যোগাযোগের জন্য একটি (০১৭২৪৬৮৫৭৮৪) হটলাইন খোলা হয়েছে।

মৌলভীবাজার প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, নদী ভাঙনের ফলে সৃষ্ট বন্যায় ৯৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ২৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্লাবিত হয়েছে। প্রায় প্রত্যেকটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ২ থেকে ৩ ফুট পানির নিচে তলিয়ে আছে।

এদিকে ইতিমধ্যে পানির সে াতে ভেসে ১১ জন মারা গেছেন। নিহতরা হলেন কুলাউড়া উপজেলায় টিলাগাঁও ইউনিয়নের লংলা চা বাগানের বাসিন্দা প্রদীপ মালাহা (২৮) ও ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের দক্ষিণ হিঙ্গাজিয়া গ্রামের ফজলুল হক (২৫)। কমলগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের কাঠালকান্দি গ্রামের আব্দুস সত্তার (৫৫) ও তার পুত্র করিম (২০) মিয়া, শমশেরনগর ইউনিয়নের ভাদাইরদেইল গ্রামের রমজান মিয়া (৪০), আলীনগর ইউনিয়নের হালিমা বাজার এলাকার পরিবহন শ্রমিক সেলিম মিয়া (৪০), রহিমপুর ইউনিয়নের প্রতাপী গ্রামের ছাদির মিয়া (৫), রাজনগর উপজেলার শিশু ইমন মিয়া (১১), করফুল বিবি (৭০) ছয়দুন নেছা (৬৫) এবং মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের সুবান মিয়া (২০)।

কুলাউড়ার টিলাগাঁও ইউনিয়নের বাগৃহাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্রের অনন্ত মালাকার, মুক্তার, রবীন্দ্র মালাকার, গোপিকা মালাকার জানান, বন্যার পানি আকস্মিকভাবে প্রবেশ করায় ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার পাশাপাশি ধানচালও ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। ফলে বাড়িঘর মেরামত কাজ শেষ করে তবেই ফিরতে হবে আশ্রয় কেন্দ্র থেকে।

কুলাউড়ার হাজীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল বাছিত বাচ্চু, শরীফপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জনাব আলী, টিলাগাঁও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মালিক ও রাজনগরের কামারচাক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নাজমুল হক সেলিম জানান, তাদের ইউনিয়নের রাস্তাঘাট সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। বিধ্বস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি। এসব ঘরবাড়ি মেরামত করার পর আশ্রয় কেন্দ্র থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে ফিরতে হবে। মানুষের জন্য সরকারি যে ত্রাণ পাওয়া গেছে তা কম কিংবা বেশিও বলা যাবে না। মানুষ যে পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে তুলনায় বেশি বলার সুযোগ নেই।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ মৌলভীবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মিন্টু রঞ্জন দেবনাথ জানান, পানি না কমায় ক্ষয়ক্ষতির পুরো তালিকা করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে যেসব যায়গায় পানি কমেছে তা দ্রুত মেরামত করে চলাচল উপযোগী করার চেষ্টা চলছে। শমশেরনগর-চাতলাপুর চেকপোস্ট সড়কের দেবে যাওয়া ব্রিজটি মেরামত করে সেখানে একটি বেইলি সেতু নির্মাণ করে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক করা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

পাানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রণেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী জানান, মনু নদের পানি বিপদ সীমার ৬৮ সেন্টিমিটার ও ধলাই নদের পানি বিপদ সীমার নিচ দিয়ে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি যে গতিতে কমছে তাতে আমরা আশাবাদী খুব তাড়াতাড়ি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক তোফায়েল ইসলাম জানান, পানি না কমায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা করা সম্ভব হয়নি। ক্ষতিগ্রস্তদের সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।

মানবকণ্ঠ/এএএম