রক্তের দাগ ধুয়ে ফেললেই ক্ষত শুকায় না

রক্তের দাগ ধুয়ে ফেললে যে ক্ষত শুকিয়ে যায় না, বাঙালি জাতি ’৭১-এর ৭ মার্চের ভাষণেই জেনেছিল তা। বঙ্গবন্ধু জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি। মুজিবুর রহমান সেই রক্তের দাগের ওপর এ্যাসেম্বিলিতে যোগদান করতে পারে না। আমরা তো সেই ‘মুজিবুর’ রহমানেরই দেশের বাঙালি। তারই জনতা।

তারই দেশের নাগরিক। রক্তের দাগের প্রতি তাই আমাদেরও আবেগ আছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে শ্রদ্ধা করি বলে, ৭ মার্চের ভাষণের দর্শনকে বিশ্বাস করি বলে, যে কোনো নিপীড়িতের রক্তের দাগের প্রতি আমাদের এই আবেগ। আমরা বিশ্বাস করি রক্তের দাগ কখনো শুকায় না। আর জবরদস্তি করে শুকানোর চেষ্টা চালানো হলে সে ক্ষত বাঙালির মন থেকে কখনো মুছে যায় না।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট সে চেষ্টা চলেছে। ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুকে ফেলে রাখা হয়েছিল। বহুদিন পর্যন্ত সে রক্তের দাগ কেউ মোছেনি। প্রয়োজনও মনে করেনি তার। কাঁচ ঢাকা সিঁড়িতে রক্তের শুকানো দাগ এখনো আছে। তবে যতটা আছে ওই সিঁড়িতে তারচেয়ে আছে কৃতজ্ঞ বাঙালির অন্তরে। শুকানো রক্তের দাগ হয়ে, তারচেয়েও বেশি ক্ষত হয়ে। রক্তের দাগ মোছা যায় না-এত বড় দৃষ্টান্ত থাকা সত্ত্বেও রক্তের দাগ মুছে ফেলার চেষ্টাও কম হয় না।

দুই

সড়কবিশৃঙ্খলা, সড়কনৈরাজ্য, সড়কহত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বললে বা লিখলে কোনো প্রতিকার হয় এ বিশ্বাস চলে গেছে বহু আগে। আমরা অসহায়, ক্ষমতাহীন এবং রাষ্ট্রের কাছে তুচ্ছ নাগরিকরা মেনে নিয়েছিলাম সড়কপথে যাত্রা মানে শেষযাত্রা। মানসিক প্রস্তুতিও থাকত তেমন। স্বজনকে বিদায় দেয়ার সময়ও ওই একই অনুভব ‘ফি সাবিলিল্লাহ’। কিন্তু আমরা বুড়োধারীরা যা মেনে নিই, নিষ্পাপ কৈশোর তা মানবে কেন? আমরা বুড়োধারীরা নিজেরা অন্যায় করি তাই মেনে নিই অন্যায়। উল্টোপথে গাড়ি চালানো, ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকা, ক্ষমতাবানদের বুড়োধারীরা দেখেও দেখে না।

বুড়োধারীদের দেখেছি তারা ঠেলাগাড়ি ভ্যানওয়ালা রিকশাওয়ালারা সড়ক আইন অমান্য করলে জরিমানা থেকে শুরু করে সব ধরনের অপমান করে। দেখেছি উল্টোপথে গাড়ি চালিয়ে মন্ত্রীর গাড়ি বিকল হতে। সে অবশ্য ট্রাফিক পুলিশ ধরেনি। ধরা পড়েছিল যন্ত্রে। কিন্তু তাতে মন্ত্রীদের কখনো অপমানের মুখে পড়তে হয়নি। জরিমানাও গুনতে হয়নি। এবার দেখেছিলাম সেই বিরল ব্যতিক্রম দৃশ্য। বৈষম্যের রাজপথ পরিণত হয়েছিল রূপকথার রাজপথে। সেই রূপকথা এখন ইতিহাস। রাজপথ ফিরে গেছে আবার সেই আগের হালে। এটাকে হাল বলব নাকি বেহাল বলব সে এক প্রশ্ন। তবে প্রমাণ হয়েছে বাংলাদেশের সড়ক ব্যবস্থায় মাননীয় মন্ত্রীপ্রবরদের ইচ্ছা এবং ক্ষমতাই শেষ কথা। তাদের অনুগত লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভাররা এখন সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। গেল শুক্রবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গাড়ি ধাক্কা দিয়েছে যে ড্রাইভার, আটকের পর দেখা গেল তারও লাইসেন্স নেই। একটি জাতীয় দৈনিক এদের নাম দিয়েছে পরিবহন মোগল। আমরা তো বলি মোগলদের চেয়েও তাদের ক্ষমতা বেশি। মোগল প্রসঙ্গ আসাতে মনে পড়ল সুকুমার রায়ের বিখ্যাত ‘গন্ধবিচার’।

সিংহাসনে বসলো রাজা বাজলো কাঁসর ঘণ্টা/ ছটফটিয়ে উঠলো কেঁপে মন্ত্রী বুড়োর মনটা/ বললো রাজা, মন্ত্রী তোমার জামায় কেন গন্ধ?/ মন্ত্রী বলে, এসেন্স দিছি-গন্ধ তো নয় মন্দ!/ রাজা বলেন, মন্দ ভালো দেখুক শুঁকে বদ্যি/ বদ্যি বলে, আমার নাকে বেজায় হলো সর্দি/ রাজা হাঁকেন, বোলাও তবে রাম নারায়ণ পাত্র/ পাত্র বলে, নস্যি নিলাম এক্ষুণি এই মাত্র/ নস্যি দিয়ে বন্ধ যে নাক, গন্ধ কোথায় ঢুকবে/ রাজা বলেন, কোটাল তবে এগিয়ে এসো, শুঁকবে / কোটাল বলে, পান খেয়েছি, মসলা তাহে কর্পূর/ গন্ধে তারি মুণ্ডু আমার এক্কেবারে ভরপুর।

রাজা বলেন, আসুক তবে শের পালোয়ান ভীম সিং/ ভিম বলে, আজ কচ্ছে আমার সমস্ত গা ঝিমঝিম/ রাতে আমার বোখার হল বলছি হুজুর ঠিক বাৎ/ বলেই শুলো রাজ সভাতে চক্ষু বুজে চিৎপাত/ রাজার শালা চন্দ্র কেতু তারেই ধরে শেষটা/ বললো রাজা, তুমিই না হয় করো না ভাই চেষ্টা/ চন্দ্র বলেন, মারতে চাও তো, ডাকাও না জল্লাদ/ গন্ধ শুঁকে মরতে হবে এ আবার কি আল্লাদ?/ ছিল হাজির বৃদ্ধ নাজির বয়সটি তার নব্বই/ ভাবলো মনে ভয় কেন আর একদিন তো মরবোই/ সাহস করে বললো বুড়ো, মিথ্যে সবাই বকছিস/ শুঁকতে পারি হুকুম পেলে এবং পেলে বকশিস/ রাজা বলেন, হাজার টাকা ইনাম পাবে সদ্য/ তাই না শুনে উৎসাহেতে উঠলো বুড়ো মদ্য/ জামার পরে নাক ঠেকিয়ে শুঁকলো কত গন্ধ/ রইলো অটল দেখলো লোকে বিস্ময়ে বাক বন্ধ।

‘গন্ধ বিচারের’ রাজসভায় একজন তবু কেউ ভেবে ছিল, ভয় করে কী হবে, একদিন তো মরতেই হবে। আফসোস, এখনের রাজসভায় এমন সাহসী কাউকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সাধারণের মধ্যে খুঁজে পাওয়া তো আরো মুশকিল। মাথার ওপর এখনো দণ্ডায়মান ৫৭ ধারা। কে রাষ্ট্রদ্রোহী আর কে নয় তা নির্ধারণের মানদণ্ড ক্ষমতাসীনদের হাতেই। সুকুমার রায়ের ‘কার দোষ’ গল্পের কথা মনে পড়ে। এক রাজা তার বাড়ির পাশে এক প্রকাণ্ড উঁচু দেয়াল তুলবার হুকুম দিলেন। কিন্তু দেয়াল তোলা মাত্র হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। রাজা হুকুম দিলেন বেঁধে আনো রাজমিস্ত্রিকে।

রাজমিস্ত্রি বলল, মহারাজ, আমার কী দোষ, সুরকির মসলা খারাপ ছিল। ধরে আনা হলো সুরকিওয়ালাকে। সে বলল, দোহাই হুজুর, আমার কোনো দোষ নেই। আমি তো মসলা ঠিক করে মেশাতে কত চেষ্টা করলাম কিন্তু মেশাবার পাত্র এমন বিশ্রী করে বানিয়েছে কুমোর যে সেটা দিয়ে কিছুতেই ভালো করে মেশানো যায় না। ধরে আনা হলো কুমোরকে। কুমোর কেঁদে বলল, মহারাজ আমার কী দোষ। পাত্র গড়বার সময় একটি মেয়ে আমাকে এমন চমকে দিল যে, পাত্রের গড়ন গেল খারাপ হয়ে। মেয়েটি বলল, আমার কোনো দোষই নেই। ও বাড়ির সামনে দিয়ে যাবার আমার কোনো দরকার ছিল না।

একজন স্যাকরাকে আমার কানের দুল গড়তে দিয়েছিলাম। বাড়িতে এসে দুল জোড়া দিয়ে যাবার কথা ছিল তার। সে দিল না দেখেই আমাকে ছুটে যেতে হলো। কুমোরকে চমকে দেয়ার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না। স্যাকরা বলল, মুক্তোওয়ালা ঠিক সময়ে মুক্তো দিয়ে যায়নি বলেই দুল গড়তে দেরি হলো। মুক্তোওয়ালা বলল, আমি মুক্তো পাবার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু ডুবুরি ভালো মুক্তো তোলেনি।

ডুবুরি বলল, আমার কী দোষ? সুক্তিতে যদি ভালো মুক্তো না জন্মায় তো আমি কী করব? সুক্তি তো থাকে সমুদ্রের তলায়। এবার তবে শাস্তি দিতে হবে সমুদ্রকে। এ গল্প ৫৭ ধারার পুরনো সংস্করণ। এমনতর সংস্করণেই শাস্তি পাচ্ছেন শহিদুল আলম। যে কোনো ন্যায্য আন্দোলনকে সমর্থন করা যদি হয় সরকারবিরোধিতা, তবে ভিন্নমত প্রকাশের কী দশা বাংলাদেশে, তা ভাবুন একবার। -লেখক : কলাম লেখক

মানবকণ্ঠ/এএএম