রক্তদাতাকে খুঁজতে মোবাইল অ্যাপস

রক্তদাতাকে খুঁজতে মোবাইল অ্যাপসরক্তদাতার সন্ধান করতে ‘ব্লাড ম্যানেজার’ নামে একটি ডিজিটাল অ্যাপস চালু করেছে বাংলাদেশ ব্লাড ডোনারস ফোরাম। এই কর্যক্রমকে বেগবান করতে সারাদেশে চালু করা হচ্ছে কল সেন্টার। ‘নিরাপদ হোক রক্তদান, আমার রক্তে বাঁচুক প্রাণ’ এই প্লোগান নিয়ে রক্ত ফেরি করতে ২০১৪ যাত্রা শুরু করে তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের এই সংগঠন।

সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কামরুল হাসান বলেন, চাচাতো বোনের সিজার অপারেশনের জন্য এ নেগেটিভ রক্তের প্রয়োজন হয়। সেই রক্তের জন্য হন্যে হয়ে রক্তদাতা খুঁজেছি আমরা। ব্লাড ব্যাংক আর মেডিকেলগুলোতে কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলাম না দুর্লভ গ্রুপের এই রক্ত। এদিকে ডাক্তার জানালেন, দ্রুত সিজার করতে না পারলে বড় ধরনের সমস্যা হয়ে যেতে পারে। এরপর দিশেহারা হয়ে সবাইকে ফোন দেওয়া শুরু করলাম। রক্তের প্রয়োজনীয়তাটি পোস্ট করলাম ফেসবুকেও। তখন আমার বন্ধু মেহেদী এ ধরনের সেবামূলক কাজের সঙ্গে জড়িত থাকায় মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে এক ব্যাগ এ নেগেটিভ রক্তদাতা খুঁজে দেয়। তিনি আরও বলেন, ‘দ্রুত রক্তাদাতা খুঁজে পেয়ে কিছুটা অবাকই হয়েছিলাম। সেদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আজ থেকে রক্তের প্রয়োজনে মানুষকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করব। সে অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলার স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আমি চিন্তা করতে থাকি কীভাবে দেশের সব ভলান্টিয়ার ও রক্তদাতাদের একটি প্লাটফরমের ভেতর নিয়ে আসা যায়। যাতে দেশের যে কোনো প্রান্তে খুব দ্রুত রক্তদাতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়। তখন আমার মনে হলো এমন একটি প্ল্যাটফর্ম করা উচিত যেটার মাধ্যমে এধরনের সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। বর্তমানে দেশের সবকটি জেলায় কাজ করছে বাংলাদেশ ব্লাড ডোনারস ফোরামের সক্রিয় টিম।

কামরুল হাসান আরো বলেন প্রথমে ফেসবুকে সংগঠিত করেন সারাদেশের সংগঠকদের, কথা বলেন দেশের প্রথম সারির স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা সংগঠন গুলোর সাথে। জেনে নেন, কে কিভাবে কাজ করছে। বুঝতে পারলেন বেশিরভাগ সংগঠন গুলো কাজ করছে নিজ জেলা বা উপজেলা ভিত্তিক। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন সারাদেশে ছড়িয়ে দেবেন বাংলাদেশ ব্লাড ডোনারস ফোরামের কার্যক্রম।

অনলাইনের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়েও শুরু করেন বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও রক্তদানে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি। তার এই মহৎ কার্যক্রম দেখে কিছু গুণী ব্যাক্তি যুক্ত হলেন তাদের সাথে। কামরুল হাসান তাদেরকে জানালেন রক্ত দাতাদের আরো উৎসাহিত করতে সংবর্ধনা আয়োজনের কথা তাতে সবাই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। তাই জাতীয় রক্তদাতা দিবস ২০১৫ উপলক্ষে চট্রগ্রামে ২০০ জন স্বেচ্ছায় রক্তদাতা ও ৩০ টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে সংবর্ধিত করে তারা।

উক্ত প্রোগ্রামে রক্তদাতা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা দেয়। এর পর ২০১৬ সালে ২য় বর্ষপূতি উপলক্ষে ৩০০ স্বেচ্ছায় রক্তদাতা ও ৪০ টি সংগঠনকে সংবর্ধিত করে। রক্তদাতা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ব্যাপক উৎসাহ দেখে তার স্বপ্ন জাগে দেশের প্রতিটি বিভাগে পর্যায়ক্রমে রক্তদাতা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে সংবর্ধিত করার। সে ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে জাতীয় রক্তদাতা উপলক্ষে ঢাকাতে ৫০০ স্বেচ্ছায় রক্তদাতা ও ৫০ টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে সংবর্ধিত করে উক্ত প্রোগ্রামে দেশের ৫৪ জেলার রক্তদাতা ও স্বেচ্ছাসেবক অংগ্রহন করে। এরপর ৩য় বর্ষপূতি উপলক্ষে সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে ৪০০ জন রক্তদাতা ও ৫০ টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠকে সংবর্ধিত করে।তিন বিভাগে রক্তদাতাদের নিয়ে এটি ছিলো দেশের সর্ববৃহৎ রক্তদাতা সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।

এছাড়া সন্দ্বীপেও রক্তদানের পর ৩৫০ জন স্বেচ্ছায় রক্তদাতাকে সংবর্ধিত করে। রক্তদানে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে সংগঠনটি পথে প্রান্তরে বিলি করেছে ৫০ হাজার লিফলেট ও ৬ হাজার ফেস্টুন। প্রতিদন প্রায় ৩০ ব্যাগের মত রক্তদাতা সংগ্রহ করে দেন তারা।

শুধু রক্তদান ও রক্তদানে সচেতনতা বা রক্তদাতাদের সংবর্ধিত করার মধ্যে থেমে থাকেনি সংগঠনটির কার্যক্রম। রোহিঙ্গাদের নির্মম হত্যার প্রতিবাদে চট্রগ্রাম, ঢাকা, সিলেটে মানববন্ধন করে সংগঠনটি, এছাড়াও রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বিতরণ, দেশের প্রতিকূল অবস্থান বর্ন্যাতদের ত্রাণ বিতরণ, ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প, শীত বস্ত্র বিতরণ, ঈদবস্ত্র বিতরণ,পরিস্কার পরিছন্ন কর্মসূচি, অসহায়দের আর্থিক সহায়তা প্রদান, বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপনসহ নানা ধরনের সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রমে সক্রিয় সংগঠনটি।

বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রক্তদান কার্যক্রমকে আরো সহজ করতে সম্প্রতি
‘ব্লাড ম্যানেজার’ নামে একটি ডিজিটাল অ্যাপস চালু করেছে সংগঠনটি। যেখানে খুব সহজেই সারা দেশের রক্তদাতার সন্ধান মিলবে। অ্যাপসটিতে সারা দেশের স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের ছবিসহ বিস্তারিত তথ্য দেওয়া আছে। অর্থাৎ যার জেলায় রক্তের প্রয়োজন হবে অ্যাপসের মাধ্যমে রক্তগ্রহীতারা সেই জেলায় স্বেচ্ছাসেবকের মাধ্যমে যোগাযোগ করে রক্তদাতার সন্ধান পাবে।।

এছাড়াও সরাসরি অ্যাপস থেকে সার্চ করে যে কোনো গ্রুপের রক্তদাতা খুঁজে নেওয়া যাবে। অ্যাপসে রক্তদাতারা নিজের ছবিসহ নিবন্ধন করে সহজেই রক্তদান কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবে। অ্যাপসের বিশেষ সুবিধা হচ্ছে নিবন্ধিত রক্তদাতাদের ৪ মাস পরপর রক্তদানের সময় অটো গ্রিন সিগন্যাল কালারের মাধ্যমে মনে করিয়ে দেবে তিনি রক্ত দিতে পারবেন। যাদের ৪ মাস সময় হয়নি তাদের লাল কালার সিগন্যাল দিয়ে মনে করাবে তার এখনো রক্তদানের ৪ মাস হয়নি। অ্যাপসের মাধ্যমে মেডিকেল টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিনামূল্যে চিকিৎসা নেওয়া যাবে। রক্তদানের সচেতনতা ও উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তরিত তথ্যও জানা যাবে। রক্তদান কেন্দ্রিক এ ধরনের ব্যতিক্রমী অ্যাপস বাংলাদেশে প্রথম।

বর্তমান প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে কামরুল হাসান জানালেন রক্তের প্রয়োজনে ফেসবুকে রোগীর যাবতীয় তথ্য ও ফোন নাম্বার সহ আমরা পোস্ট করে থাকি। পোস্ট থেকে খুব দ্রুত রক্তদাতার সাড়া পাওয়া যেত কিন্তু এখন একদল দালাল চক্র সেই ফেসবুক পোস্ট থেকে রোগীর নাম্বার নিয়ে রোগীর লোককে রক্ত দিতে বলে এবং গাড়িভাড়া বাবদ বিকাশে টাকা চায়। টাকা পাওয়ার পর ঐ লোক ফোন বন্ধ করে দেয়। এতে রোগী রক্তদাতার আশায় আশায় আরো মূর্ষূষু অবস্থায় পরে। তাই পোস্টকারী আগে রোগীর লোককে অবশ্যই বলে রাখা উচিত পোস্ট থেকে কেউ রক্ত দিবে বলে টাকা চাইলে বুঝে নিবেন সে দালাল চক্রের সদস্য।

ফেসবুক কর্তৃপক্ষ থেকে স্বীকৃতি পেয়েছে সংগঠকটি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক টিম বাংলাদেশে এসে রক্তদান নিয়ে একটি সেমিনারের আয়োজন করে সে আয়োজনে বাংলাদেশ ব্লাড ডোনারস ফোরামকে সম্মাননা তুলে দেয় ফেসবুক কর্তৃপক্ষ। কামরুল বললেন, আমরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম প্রোগ্রামে যাবো কিনা, যাবার পর তাদের কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে কাজের গতি আরো বেড়ে গেল। তাছাড়া পুলিশ ব্লাড ব্যাংক, লায়ন ক্লাব, বীর প্রতীক কর্নেল (অবঃ) দিদারুল ফাউন্ডেশন সহ ১২ টি সংগঠন থেকে সংবর্ধিত হয় সংগঠনটি।

মানবকণ্ঠ/ডিএইচ