যুদ্ধাপরাধী লিয়াকত-আমিনুলের ফাঁসির রায়

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে হবিগঞ্জের লাখাই থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত আলী ও কিশোরগঞ্জের আমিনুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যনাল। সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।ট্রাইব্যুনালের অন্য বিচাপতিরা হলেন- বিচারপতি আমির হোসেন ও সদ্য বিচারপতি মো. আবু আহমেদ জমাদার।

এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ছিলেন অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত ও রেজিয়া সুলতানা চমন। অপরদিকে পলাতক দুই আসামির পক্ষে রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবী ছিলেন গাজী এমএইচ তামিম।

রায়ে বলা হয়, আসামিদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা সাতটি অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে। মৃত্যু পর্যন্ত ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে তাদের সাজা কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এই রায়ের এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ পাবেন আসামিরা। তবে সেজন্য তাদের আত্মসমর্পণ করতে হবে।

তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সাত অভিযোগ

  • প্রথম অভিযোগ: ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি সেনা সদস্য ও রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে লাখাই থানার কৃষ্ণপুর গ্রামে গণহত্যা, লুটপাট। ওইদিন কৃষ্ণপুর গ্রামে নৃপেণ রায়ের বাড়িতে রাধিকা মোহন রায় ও সুনীল শর্মাসহ ৪৩ জন হিন্দুকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
  • দ্বিতীয় অভিযোগ: হবিগঞ্জের লাখাই থানার চণ্ডিপুর গ্রামে গণহত্যা ও লুটপাট।
  • তৃতীয় অভিযোগ: লাখাই থানার গদাইনগর গ্রামে গণহত্যা ও লুটপাট।
  • চতুর্থ অভিযোগ: অষ্টগ্রাম থানার সদানগর গ্রামে শ্মশানঘাটে হত্যা।
  • পঞ্চম অভিযোগ: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর থানার ফান্দাউক গ্রামের বাচ্চু মিয়াকে অপহরণ এবং রঙ্গু মিয়াকে অপহরণ ও হত্যা।
  • ষষ্ঠ অভিযোগ: অষ্টগ্রাম থানার সাবিয়ানগর গ্রামে চৌধুরী বাড়িতে হামলা চালিয়ে হত্যা।
  • সপ্তম অভিযোগ: সাবিয়ানগর গ্রামে খাঁ বাড়িতে হত্যাকাণ্ড।

সংশ্লিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, আড়াই মাস আগে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচার কাজ শেষ হয়েছিল। সেদিন আদালত আদেশে বলেছিল যে কোনো দিন রায় ঘেষণা করা হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে ২০১৬ সালের ১ নভেম্বর লিয়াকত আলী ও আমিনুল ইসলামের বিচার শুরু করেন। পরে ওই বছর ৪ ডিসেম্বর শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। সোমবার এটি হবে সংশ্লিষ্ট এ ট্রাইব্যুনালের ৩৫তম রায়। ৩৫টি মামলার ৮৫ আসামির মধ্যে পাঁচজন বিচারাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। মোট ৮০ জনের সাজা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৫৩ যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ সাজার রায় এসেছে।

মামলার অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, লিয়াকত একাত্তরে ছিলেন মুসলিম লীগের কর্মী। আর আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব আলী ওই সময়ে ছাত্র সংঘের সদস্য ছিলেন। পরবর্তীতে লিয়াকত আলী ২০০৩ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১০ বছর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। সভাপতি থাকা অবস্থাতেই যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ২০১০ সালে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। ২০১৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাশাপাশি তিন থানা হবিগঞ্জ জেলার লাখাই, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর ও কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে ব্যাপক যুদ্ধাপরাধ ঘটান দুই আসামি। পরে ২০১৬ সালের ১৮ মে সন্দেহভাজন দুই যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব না হওয়ায় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়। শেষ পর্যন্ত তাদের পলাতক দেখিয়েই বিচার চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দেয় আদালত।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ