যুগে যুগে নারী আন্দোলন

সেলিনা হোসেন :
সময় ১৮৫৭ সাল। নিউইয়র্কের পোশাক কারখানায় কাজ করত হাজার হাজার নারী শ্রমিক। তাদের ১৫ ঘণ্টারও বেশি সময় শ্রম দিতে হতো। কিন্তু ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হতেন তারা। কারখানায় পোশাক তৈরি করতে সুই, সুতা, বিদ্যুৎসহ আনুষঙ্গিক যা শ্রমিকরা ব্যবহার করতেন তার বাবদ তাদের বেতন থেকে একটা অংশ কেটে নেয়া হতো। এ ছাড়া কারখানায় পৌঁছাতে দেরি হলে, টয়লেটে বেশি সময় নিলে ইত্যাদি নানা কারণ দেখিয়ে শ্রমিকদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হতো। দিনের পর দিন এমন সব অমানবিক নির্যাতন সহ্য করতে করতে একসময় বিদ্রোহী হয়ে ওঠে শ্রমিকরা। উপযুক্ত বেতন ও ১০ ঘণ্টা কর্মসময়ের দাবিতে সে বছরের ৮ মার্চ রাস্তায় নামেন তারা।
সেদিন প্রতিবাদমুখর হাজার হাজার নারী শ্রমিককে দমন করতে তাদের ওপর গুলি চালায় পুলিশ। এ আন্দোলনের ফলে পুরোপুরি দাবি আদায় না হলেও এরই পথ ধরে ১৮৬০ সালে নিউইয়র্ক শহরের পোশাক কারখানার নারীরা ‘ট্রেড ইউনিয়ন’ গঠন করেন। বলা যায়, এটা ছিল নারীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাফল্যের প্রথম ধাপ। তবে নারীদের সোচ্চার হওয়ার ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়েছিল তারও আগে ১৬৪৭ সালে। সে বছর যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম নারী অধিকার নিয়ে কথা বলেন মার্গারেট ব্রেন্ট। তিনি মেরিল্যান্ডের অ্যাসেম্বলিতে প্রবেশের দাবি জানান। কিন্তু তার এ দাবি নাকচ করা হয়।
এরপর ১৭৯২ সালে ইংল্যান্ডের ওলস্ট্যানক্রাফট, যিনি একজন লেখক ও দার্শনিক, তিনি তার ‘নারী অধিকারের ন্যায্যতা’ নামক গ্রন্থে নারীদের ওপর পুরুষতন্ত্রের নির্যাতন-নিপীড়নের বর্ণনা দেন। ১৮৪০ সালে আমেরিকায় দাসপ্রথা ও মদ্যপান বিলোপ আন্দোলনের মাধ্যমে ঊনবিংশ শতাব্দীতে নারীবাদী চেতনা বিকশিত হয়। এর আগে ১৮৩৭ সালে আমেরিকায় প্রথম দাস প্রথাবিরোধী নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৮৪৮ সালের জুলাইয়ে নারীবাদীদের উদ্যোগে নিউইয়র্কের সেনেকা ফলসে-এ দুদিনব্যাপী বিশ্বের প্রথম নারী অধিকার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ইউরোপ কিংবা আমেরিকার মতো অবিভক্ত ভারতবর্ষে নারী আন্দোলন সেই অর্থে গতিময় ছিল না। অবশ্য এই অনগ্রসরতার পেছনে কাজ করেছে সেখানকার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং প্রচলিত মূল্যবোধ।
মজার ব্যাপার হলো ভারতে নারী আন্দোলনের শুরুটা করেছেন একজন পুরুষ। এই মহান ব্যক্তি হলেন রাজা রামমোহন রায়। ১৮২৯ সালে তারই উদ্যোগে সতীদাহ প্রথা রদ করা হয়। এরপর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাল্যবিয়ে বন্ধ করেন এবং বিধবা-বিয়ে চালু করেন। বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে এ সময় ভারতবর্ষে ৪৩টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। উনিশ শতকের মাঝামাঝি কৃষ্ণভামিনী দাসী, কামিনী সুন্দরী, বামাসুন্দরী দেবী, মোক্ষদা দায়িনী প্রমুখ সাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়ে নারী অধিকারের কথা বলতে শুরু করেন।
১৮৮৫ সালে এ দেশে প্রথম নারীবাদী সংগঠন ‘সখী সমিতি’ গড়ে তোলেন স্বর্ণকুমারী দেবী। ১৮৮৯ সালে মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস সম্মেলনে ছয়জন নারী যোগ দেন। এ ছাড়া রাজনৈতিক আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন, তেভাগা, নানকা, টংক বিদ্রোহসহ বিভিন্ন সংগ্রামে নারীদের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। এরা হলেন- মাতঙ্গিনী হাজরা, উর্মিলা দেবী, আশালতা সেন, কমলা দেবী চট্টোপাধ্যায়, প্রভাবতী বসু, লীলা নাগ, জোবেদা খাতুন চৌধুরী, দৌলতন নেসা খাতুন, রাজিয়া খাতুন, হোসনে আরা খাতুন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত, শান্তি ঘোষ, রানী দাস, ইলা মিত্র, সন্তোষ কুমারী দেবী প্রমুখ।
বাংলাদেশে নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া। তৎকালীন পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজে নারী শিক্ষা, অধিকার সুরক্ষায় নারীর আত্মসচেতনতা, নারীকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াস ইত্যাদি ক্ষেত্রে বেগম রোকেয়া তার সাহিত্য ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলায় নারীমুক্তির আন্দোলন শুরু করেন। নারীবাদ প্রতিষ্ঠার প্রবাদপুরুষ বেগম রোকেয়ার দেখানো পথ ধরে স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের সার্বিক ক্ষেত্রে নারীর সফলতা লক্ষণীয়। নূরজাহান বেগম, বেগম সুফিয়া কামাল, বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ, হেনা দাস, সালমা সোবহান প্রমুখ নারীনেত্রী নারী মুক্তির লক্ষ্যে বিশেষ অবদান রেখেছেন।
আমাদের নারীরা সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সর্বত্র সরব, সোচ্চার। তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হচ্ছেন। পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার বাইরে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে। তারপরও নারীর প্রতি সহিংসতা ও নারী স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন অনেকখানি বাকি থেকে যায়। তাই বর্তমানে নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম কর্মসূচি হলো সহিংসতা থেকে নারীকে মুক্ত করা। অপরদিকে বিগত বছরে মাতৃমৃত্যু ও শিশু মৃত্যুহার কমলেও আমরা এখনো প্রত্যাশা থেকে অনেকখানি দূরে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(১), ২৮(২) ও ২৮(৪) উপধারায় সুস্পষ্টভাবে নারী-পুরুষের সমতা, সমধিকার এবং সমমর্যাদার কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, সম্পদের মালিকানা নির্ধারণসহ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখনো নারী ও পুরুষের মধ্যে বিরাট বৈষম্য লক্ষণীয়। এ ছাড়া ব্যাপকভাবে বেড়েছে ইভটিজিং ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা। এখনো যৌতুকের বলি হচ্ছে নারী, বন্ধ হয়নি বাল্যবিয়ে। তাই নারী আন্দোলনের পাশাপাশি সরকারি হস্তক্ষেপে আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন ও সর্বোপরি জনসচেতনতা একান্ত জরুরি।
বাংলাদেশের নারীরা নারী আন্দোলনের বিষয়টিকে গভীরভাবে বুঝেছিলেন ’৪৭-পরবর্তী সময় থেকেই। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন তারা কোনো সংগঠন বা দল থেকে আসেননি, তারা নিজেরা ভাষা আন্দোলনের বিষয়টিকে গভীরভাবে অনুভব করে যুক্ত হয়েছিলেন। এতেই বোঝা যায়, বাংলাদেশে নারীদের আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার গৌরবময় অতীত আছে। দেশের সংকট মোকাবিলায় কিংবা সমস্যার বেড়াজালে আটকেপড়া নানা ঘটনার সঙ্গে তাদের এই জড়িত হওয়ার পেছনে ছিল পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং আন্দোলনের বিস্তার ব্যাপক করার জন্য পুরুষের সঙ্গে একই সমান্তরালে অংশগ্রহণ করা। এই পরিপ্রেক্ষিতে যদি বিবেচনা করি তাহলে বাংলাদেশে নারী আন্দোলনের স্বরূপ কী, তা আমরা বুঝতে পারি।
১৯৭০ সালে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সভাপতি ছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মালেকা বেগম। স্বাধীনতা-উত্তর সময় থেকে নারীরা সাংগঠনিকভাবে ‘নারী’ ইস্যুতে অনবরত কাজ করেছেন, বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলা করেছেন। আমাদের নারীদের শিক্ষায়-স্বাস্থ্যে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে এবং আজকের দিনের নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়ে তাদের এই আন্দোলন ভূমিকা রেখেছিল। এখনো নারীর প্রতি সহিংসতা কমেনি। নারীরা সরকারপ্রধান থেকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পর্যন্ত প্রশাসনিক কাঠামোয় নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। বিশ্বের যে কোনো দেশের নারীর অবস্থান বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের নারীদের অবস্থানের কথা বিশেষভাবে মূল্যায়িত হবে। তারপরও সহিংসতার জায়গাটিতে নারীর শতভাগ মুক্তি আসেনি। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, আধিপত্য, দমন-পীড়নের পৈশাচিক আচরণ দ্বারা নারী নানাভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। তাই নারী আন্দোলনের প্রয়োজন এখনো একশ’ ভাগ।
নারীকে তার জায়গা বোঝার জন্য এই আন্দোলনকে বেগবান করতে হবে। নইলে পারিবারিক নির্যাতনের মতো বর্বর আচরণ নারীকে ক্রমাগত ঘায়েল করবে। তাই নারী আন্দোলনের বেগবান গতি থাকুক সমাজ ও দেশের সবখানে।