যা বললেন মনোনয়ন বঞ্চিতরা!

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ দলীয় প্রতীক নৌকায় নির্বাচন করার জন্য এরই মধ্যে প্রার্থী চ‚ড়ান্ত করেছে। মনোনীত প্রার্থীরাও রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এবার ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ চার নেতা মনোনয়ন পাননি। মনোনয়ন না পাওয়াকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের মাঝে বিভিন্ন মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মনোনয়ন বঞ্চিত নেতাদের মধ্যে থেকে অনেকের জনপ্রিয়তা রয়েছে মনোনীত প্রার্থীর তুলনায় অনেক বেশি। দলের সিদ্ধান্তেই নির্বাচনী মাঠে মনোনীতদের পক্ষে কাজ করছেন তারা।

মনোনয়ন বঞ্চিতদের মনোনয়ন দেয়ার জন্য এরই মধ্যে সারা দেশের বেশ কয়েকটি জেলাতে বিক্ষোভ করেছেন বঞ্চিত নেতার সমর্থকরা। রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে, সড়ক অবরোধ করে ছিলেন তৃণমূলের সমর্থকরা। কিন্তু কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো কিছু না করার সিদ্ধান্তে অনড় ছিল মনোনয়ন বঞ্চিতরা। দলের সভাপতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই এখন কাজ করছে তারা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া চ‚ড়ান্ত তালিকার প্রতি সম্মান রেখেই মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার জন্য সমর্থকদের অনুরোধ করেছেন মনোনয়ন বঞ্চিতরা।

মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পরই দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনার কেন্দ্রের মনোনয়ন বঞ্চিতদের গণভবনে নিয়ে সান্ত¡না দেন এবং নির্বাচন পরিচালনা ও মনিটরিংয়ের কাজে লেগে যাওয়ার কথা বলেন। সভানেত্রীর সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েই মনোনয়ন বঞ্চিতরা নির্বাচনী কাজে লেগে গেছেন। তাদের সমর্থিত নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, দলের সভাপতির মনোনীত প্রার্থীকে বিজয়ী করে নিয়ে আসাই হবে আমাদের বিজয়- এমনটাই জানিয়েছেন মনোনয়নবঞ্চিত কয়েক নেতা।

মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের নিয়ে যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া চলছে তার অবসান ঘটানোর জন্য মনোনয়ন বঞ্চিতরা নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন। দলকে বিজয়ী করতে অনেক নেতাই তার সমর্থকদের নৌকার পক্ষে কাজ করার আহ্বান জানান। এ নিয়ে দৈনিক মানবকণ্ঠের সঙ্গে বেশ কয়েক মনোনয়ন বঞ্চিতদের কথা হয়। সমর্থকদের উদ্দেশে বলা কথাগুলো হলো-

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান এমপি জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘আমি যে দিন থেকে এই এলাকায় নৌকা তুলে নিয়েছিলাম, সেই দিন থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে গেছি। আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা এবার নৌকা তুলে দিয়েছেন সাদেক খানের হাতে। তাই সব ভেদাভেদ ভুলে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এ দেশকে রক্ষার স্বার্থে নৌকার স্বার্থে আমাদের এক হতে হবে।’

তিনি বলেন, সাদেক খান এই এলাকার মাটি ও মানুষের নেতা, আমার ভাই। তিনি দীর্ঘদিন এই এলাকায় আমাদের দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা এবার নৌকা প্রতীক সাদেক খানের হাতে তুলে দিয়েছেন। এ জন্য আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। সাদেক খানের পক্ষে কাজ করে যেতে হবে।

দলের আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান মানবকণ্ঠকে বলেন, দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত সু-চিন্তিতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেই সিদ্ধান্তকে আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানাই। আমার নির্বাচনী এলাকার সিদ্ধান্তের জন্য আমি প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাই। আমার নির্বাচনী এলাকার যে সমস্ত নেতাকর্মী আছেন আমি ইতিমধ্যে তাদেরকে বলেছি নৌকার জন্য কাজ করতে। তারা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে নৌকাকে বিজয়ী করে নিয়ে আসবে। একই বার্তা সারা দেশের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের জন্য বলি যে, বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার জন্য আগামী ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করার জন্য নৌকাকে বিজয়ী করে শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করবে। পুনরায় তাকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ করে দেবে।

আওয়মী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক মানবকণ্ঠকে বলেন, আমাদের দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাকে মনোনীত করেছেন আমি তাকে বিজয়ী করার জন্য সকল নেতাকর্মীকে কাজ করার আহ্বান করেছি। দলের এই সময়ে সব ভুল ভুলে গিয়ে নৌকা প্রতীকের জন্য কাজ করতে হবে। নৌকাকে বিজয়ী করতে পারলেই আমাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকে থাকবে। দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতার জন্য হলে নৌকাকে আবার বিজয়ী করতে হবে। এবার নৌকা হারলে দেশ আবার কয়েকশ’ বছর পেছনে পড়ে যাবে। সব উন্নয়ন থমকে যাবে। তাই সবাই নৌকাকে ভোট দিয়ে শেখ হাসিনাকে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম মানবকণ্ঠকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই চ‚ড়ান্ত এবং সেই সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে সবাইকে কাজ করতে হবে, এই প্রশ্নে কোনো আপস নেই। জননেত্রী শেখ হাসিনাকে পুনর্বার আমরা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই। শেখ হাসিনা থাকলে বাংলাদেশ থাকবে, বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে এবং এর ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না। যারা বাংলাদেশকে ধ্বংস করতে চায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করতে চায় সেই অশুভ শক্তির হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হবে।

আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক আব্দুস সবুর বলেন, আমি মনোনয়ন না পেলেও প্রধানমন্ত্রী যাকে নৌকার পক্ষে মনোনয়ন দিয়েছেন তার পক্ষে কাজ করব। নৌকাকে বিজয়ী করতে আমি যে সব পদক্ষেপ নেয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম, এখনো তা করব। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জ্বালাও পোড়াও, খুন, গুম, জঙ্গি-সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বিএনপি-জামায়তের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশকে আবারো অস্থিতিশীল করতে পারে। সেই ক্ষেত্রে নেতাকর্মীদের কঠোর নজর রাখতে হবে। আমি আমার সমর্থকদের বলে দিয়েছি, যে কোনো মূল্যেই নৌকাকে বিজয়ী করতে হবে। এখন থেকে মানুষের কাছে গিয়ে মনোনীত ব্যক্তির পক্ষে ভোট চাইতে হবে। নির্বাচনে রেজাল্ট না দেয়া পর্যন্ত মাঠে সক্রিয় থাকতে হবে।

নেত্রকোনা-৫ (পূর্বধলা) আসন থেকে নৌকা মার্কার মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন সাবেক ছাত্রনেতা বর্তমান লন্ডন যুবলীগের আহ্বায়ক তুহিন। তিনি মানবকণ্ঠকে বলেন, যারা যারা মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলাম, আমরা অনেকেই বলেছি, ‘আমাদের এত জনমত, দুপুরের আগে পাস করে চলে আসব’। কিন্তু মনোনয়ন পায়নি। প্রধানমন্ত্রী যাকেই মনোনয়ন দিয়েছেন। তাকে দুপুরের আগে পাশ করিয়ে নিয়ে আসলে সেখাই বুঝা যাবে কে কতটুকু পাবে। সারা বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী যাকে মনোনয়ন দিয়েছেন তাকে যেন জয় লাভ করিয়ে নিয়ে আসতে পারি।

তিনি আরো বলেন, রাজনীতি করার ক্ষেত্রে গ্রুপিং হয়ে যায়। যা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। আমি আশা করব, সব গ্রুপ এক হয়ে প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে। কেউ যদি ভাবে, আমার একটা আসনে হারলে কী হবে। আরেক জন পাস করবে। তাহলে আমাদের অস্তিত্ব থাকবে না। আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য হলেও যাকে মনোনয়ন দিয়েছে তাকে পাস করাতে হবে।

নরসিংদী-৪ (বেলাব-মনোহরদী) আসনে এবার মনোনয়ন চেয়েছেন এ এইচ আসলাম সানী। কিন্তু তাকে মনোনয়ন না দিয়ে বর্তমান এমপিকে আবার মনোনীত করা হয়। এ নিয়ে এই আসনের মধ্যে ঢাকা-সিলেট অবরোধ করেন আসলাম সানীর সমর্থকরা। কিন্তু আসলাম সানী প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে তার সমর্থিত নেতাকর্মীদের মনোনীত প্রার্থীর হয়ে কাজ করা আহ্বান করেন।

তিনি মানবকণ্ঠকে বলেন, বেলাব-মনোহরদীবাসীর ভালোবাসার প্রতিদানে শুধু বলব আমি তোমাদেরই লোক, যে মানুষকে তোমরা নেতা, অভিভাবক এবং এমপি হিসেবে দেখতে চাও। তোমরা চাও শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও নীতিবোধ। কোনো অন্যায়, লোভ ও ঘৃণা যাকে স্পর্শ করবে না। আমাকে হয়তোবা তোমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় অনেক অনেক বেশি আপন করে নিয়েছ। আমার প্রতি তোমাদের ভালোবাসার জায়গা থেকে বলছি, নৌকাকে বিজয়ী করতে যাকে মনোনীত করা হয়েছে আমরা তার পক্ষে কাজ করব।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ