ইসিতে অভিযোগের ফিরিস্তি নিয়ে বিএনপি

যত দোষের দোষী পুলিশ আর প্রশাসন!

যত দোষের দোষী পুলিশ আর প্রশাসন!

নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি না হওয়া এবং বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, মামলা, গ্রেফতার ও হয়রানি করে নির্বাচনী পরিবেশ বিনষ্ট করা, নির্বাচনকালীন নানা অনিয়মের জন্য সিভিল প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনই দায়ী। দলীয় সরকারের অধীনে মাঠ পর্যায়ে ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা), এসপি (পুলিশ সুপার), ইউএনও (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা), এবং ডিসি (জেলা প্রশাসক) হিসেবে কর্মরতরা সরকারি দলের পক্ষ নেয়ায় নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হচ্ছে না। এ ছাড়া নির্বাচনকালীন এসব কর্মকর্তা নির্বাচন দেখভালের দায়িত্বে থাকায় পক্ষপাতহীন আচরণ করার সম্ভাবনাও থেকে যায়। যে কারণে নির্বাচন কমিশন (ইসি) চাইলেও একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা কোনোক্রমেই সম্ভবপর হয়ে উঠবে না।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এবং নির্বাচন কমিশন সচিবের কাছে মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে গিয়ে দেয়া বিএনপি মহাসচিব ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত চিঠিতে এসব আশঙ্কার কথা জানানো হয়। একই সময়ে পৃথক আরেকটি চিঠিতে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে ক’দিন আগে সংঘটিত সংঘর্ষের ঘটনার জন্য নির্বাচন কমিশন ও পুলিশের চার কর্মকর্তাকে দায়ী করে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, ইসির যুগ্ম সচিব ফরহাদ আহম্মদ খান এবং ডিএমপির সংশ্লিষ্ট জোনের উপপুলিশ কমিশনারের বিচার দাবি করেছে দলটি। একইসঙ্গে পুলিশ ও প্রশাসনে মাঠপর্যায়ে কর্মরতদের অতিদ্রুত অন্যত্র বদলি ও প্রত্যাহারেরও দাবি জানানো হয়েছে।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদের চিঠিগুলো তুলে দেন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি করে ৮ নভেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। সরকারি দল ৯ নভেম্বর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত দলীয় কার্যালয়ের সামনে রাস্তা বন্ধ করে যানজট সৃষ্টির মাধ্যমে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিতরণ করে। মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে মোটরসাইকেল, গাড়ি, পিকআপসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ধানমণ্ডির মতো জনাকীর্ণ এলাকায় রাস্তা বন্ধ করে মনোনয়ন সংগ্রহ করে। এ ছাড়া নিজেদের প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষে দু’জন নিহত হয়। এ সময় পুলিশি তত্পরতা দৃশ্যমান ছিল না। এমনকি হতাহতের ঘটনায় মামলা কিংবা তাদের কোনো নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছে এমন সংবাদও গণমাধ্যমে আসেনি।

বিএনপি কার্যালয়ের সামনে স্বতঃস্ফূর্ত জনগণের ঢল দেখে নির্বাচন কমিশন সচিব ও ডিএমপি কমিশনারের গায়ে জ্বালা ধরে, কমিশন নড়েচড়ে বসে। কথিত আচরণবিধির খড়ক নেমে আসে বিএনপির ওপর। ইসি সচিব গণমাধ্যমে আচরণবিধি প্রতিপালনের কঠোর হুঙ্কার দিয়ে, এটাকে আচরণবিধির লঙ্ঘন বলে চিহ্নিত করেন। আমরা মনে করি কমিশনের এ পক্ষপাতমূলক বিধিমালার ব্যাখ্যা যথোপযুক্ত নয়।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ১৩ নভেম্বর নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি প্রতিপালনের নির্দেশনা নেতাকর্মী-সমর্থকসহ জনগণের অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করেছে। নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদের দেয়া বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য এবং ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামানের বক্তব্যে ঘটনা সংঘটনের ইন্ধনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। চিঠিতে প্রশ্ন রাখা হয়, গত ১২-১৩ নভেম্বর নজিরবিহীন জনসমাগম সত্ত্বেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি, তাহলে কেন ১৪ নভেম্বর এ ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনা সংঘটিত হলো? চিঠিতে দাবি করা হয়, এই সন্ত্রাসী হামলায় বিএনপির অনেক নেতাকর্মী আহত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তিনটি মামলায় ৪৭২ জনকে অভিযুক্ত করেছে। ৭০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং ৩৮ জন নেতাকর্মীকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর যেখানে বিএনপি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল, সেখানে নির্বাচন কমিশন তার চিঠির মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে চরম বিঘ্ন সৃষ্টি, নিরপরাধ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়েরে সরাসরি ইন্ধন জুগিয়েছে।

এই অবস্থায়, নির্বাচন কমিশনের সচিব, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, সংশ্লিষ্ট জোনের উপপুলিশ কমিশনার এবং উদ্দেশ্যমূলক জারিকৃত পত্রে স্বাক্ষরকারী নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের যুগ্ম সচিবের (নির্বাচন পরিচালনা-২) বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি। তাছাড়া তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনের আশ্রয় নেয়া হবে।

এদিকে প্রশাসনে ৯ দফা রদবদলের সুপারিশ করে দেয়া পৃথক আরেকটি চিঠিতে নির্বাচন কমিশন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশ সদর দফতরের মাঠ পর্যায়ের বদলির দাবি জানিয়েছে বিএনপি। চিঠিতে বলা হয়, ৮ নভেম্বর আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় সিইসি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বলেন। অথচ আজ পর্যন্ত তা দৃশ্যমান হচ্ছে না। এ অবস্থায় মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনে রদবদলের অনুরোধ জানিয়ে এই চিঠি দেয়া হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সব জাতীয় নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়। সেই হিসেবে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনেও সব বিভাগীয় কমিশনার, উপমহাপুলিশ পরিদর্শক, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে প্রত্যাহার করতে হবে। এতে ব্যাচভিত্তিক সিনিয়রিটি অনুসরণের দাবিও জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, মেট্রোপলিটন এলাকার উপপুলিশ কমিশনার পদে যারা একই জায়গায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে আছেন তাদের বদলির কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অন্য জেলায় বদলির দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ছিলেন বা আছেন, মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী/উপমন্ত্রী/উপদেষ্টা বা সম মর্যাদার ব্যক্তি, পিএস, এপিএস হিসেবে যারা দায়িত্ব পালন করছেন তেমন কর্মকর্তাদের নির্বাচনী সংশ্লিষ্ট পদে বদলি না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

মানবকণ্ঠ/এসএস