মোমবাতির মতো জীবন!

মোমবাতির মতো জীবন!

আজানের ধ্বনি কানে আসছে। বনানী থেকে এয়ারপোর্ট রোড। মাঝে মাঝে একটি দুটি করে গাড়ি যাচ্ছে। রাস্তায় কাজে ব্যস্ত বেশ কয়েক নারী ও পুরুষ। তারা সবাই পরিচ্ছন্নতা কর্মী। উঁচু ঝাড়– হাতে গায়ে সিটি কর্পোরেশনের কটি। একমনে তারা রাস্তায় পড়ে থাকা সারাদিনের ময়লা পরিষ্কার করছেন। যানবাহনের চাপ আস্তে আস্তে যত বাড়ছে তাদের কাছের গতিও তত বাড়ছে। কারণ শহরের রাস্তা ব্যস্ত হওয়ার আগেই তাদের কাজ শেষ করতে হবে। এটি প্রতিদিনের চিত্র।

পরিচ্ছন্নতায় নেই কোনো ঘাটতি। পুরোটাই দোলায়িত হয়েছে। তবে তা শুধু নাম গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে। নামটা তাদের ‘পরিচ্ছন্নতা কর্মী’। সমস্ত শহর পরিচ্ছন্ন করে বাড়ি ফিরলেও নিজেকে পরিষ্কার রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই। এ যেন অনেকটা মোমবাতির মতো। চার পাশ আলোকিত করলেও নিজের উঠান নিমজ্জিত থাকে অন্ধকারে। কেননা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে রাজধানীর বর্জ্য অপসারণের কাজ করছেন এই কর্মীরা।

তথ্যমতে, গত এক দশকে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ৮৮৩ জন তালিকাভুক্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী মারা গেছেন কর্পোরেশনের অবহেলাজনিত কারণে। জীবিকার তাগিদে এই কর্মীদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে হয়। আর এ কাজ করতে গিয়েই তারা ক্যান্সার, অ্যাজমা, হৃদরোগ, স্ট্রোক, বক্ষব্যাধিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন এবং প্রতিনিয়তই তা অব্যাহত থাকছে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংখ্যা ৭ হাজার ৯৫৯ জন। এর মধ্যে দক্ষিণে ৫ হাজার ২১৭ এবং উত্তরে ২ হাজার ৭৪২ জন। বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা অনেকটা বাধ্য হয়ে এ কাজে অংশ নেন। তারা যা বেতন পান, তা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির তুলনায় নগণ্য বললে বেশি বলা হবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এ কাজে সম্পৃক্ত থাকলে ধীরে ধীরে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। আর প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে নানা রোগের অভয়ারণ্যে পরিণত হয় একসময়ের সুঠাম দেহটি। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে সে কাহিনী।

কথা হয় কয়েক পরিচ্ছন্নতা কর্মীর সঙ্গে। এয়ারপোর্ট রোডের ট্রাফিক বক্সের সামনে কাজ করছেন রাবেয়া বেগম। ভোর সকাল থেকে তিনি এই রাস্তায়। রাবেয়া বেগম জানান, কে নেয় আমাদের খবর। কোনো রকমে জীবন কাটানো। মোমবাতি চেনেন, উপরের দিকে আলো আর নিচে অন্ধকার। ভোর সকাল থেকে রাস্তা পরিষ্কার করলেও নিজের জীবন অপরিষ্কার। এলোমেলোও বলতে পারেন। আয় নেই আর কোনো আমার। এখান থেকে যা পাই সেটি দিয়েই চলতে হয়।

তিনি আরো বলেন, কত মানুষের কত পরিবর্তন হয়। হাজার হাজার গাড়ির চাকা ঘুরতে দেখি কিন্তু আমার ভাগ্যের চাকা একটুও ঘোরে না। ঠিক আগেও যেমন ছিল এখনো আছে। এই কাজে এত পরিশ্রম। শরীরও খারাপ থাকে মাঝে মাঝে। তারপরও কাজ চালিয়ে যাই। শুনেছি আমাদের অনেকে মারা গেছে বিভিন্ন রোগে।

রাজধানী ঘুরে আরো কয়েক পরিচ্ছন্নতা কর্মীর সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা তাদের কষ্টের জীবন নিয়েও কথা বলেছেন। তাদেরই একজন প্রশান্ত। থাকেন রাজধানীর ওয়ারী কলোনিতে। ছোট এক রুমের একটি বাসায় দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে তার সংসার। তিনি জানান, রুমটা এতই ছোট যে একটি ডাবল খাট ভেতরে ঢুকাতে গিয়ে জায়গা না হওয়ায় খাটের কিছু অংশ কেটে ফেলতে হয়েছে। সারাদিনের পরিশ্রম শেষে একটু আরামে ঘুমানোর মতো জায়গা নেই। এক রুমের বাসায় খাওয়া ঘুম এবং সন্তানদের লেখাপড়া সবই করতে হয়। কোনো আত্মীয় বাসায় রাখার সুযোগ নেই।
রাজধানীর ধলপুর কলোনিতে পরিবার নিয়ে বাস করেন পরিচ্ছন্নতা কর্মী আবদুল কাদের। তার এক রুমের এই বাসায় দুই বউসহ দুই ছেলে, বিবাহযোগ্য মেয়ে এবং নিজের স্ত্রীসহ ৭ সদস্য বসবাস করেন।

আবদুল কাদের বলেন, প্রথমত আর্থিক, দ্বিতীয়ত সামাজিক কারণে আমাদের এই কষ্টের জীবন কাটাতে হয়। সিটি কর্পোরেশন থেকে যে বেতন ভাতা পাই তা দিয়ে সংসার চলে না। এর বাইরে আছে সামাজিক বঞ্চনা। টাকা থাকলেও আমাদের মতো শ্রমজীবীদের কলোনির বাইরে থাকার সুযোগ নেই। সামাজিক কারণে কেউ আমাদের বাসা ভাড়া দেয় না।

মানবকণ্ঠ/এসএস