মোংলা ও বুড়িমারী বন্দরে দুর্নীতি

একসময় দুর্নীতিতে বাংলাদেশ প্রথম সারিতে ছিল। বর্তমান সরকার দুর্নীতির সেই দুষ্টচক্র থেকে দেশকে বের করে নিয়ে আসতে নিরলসভাবে কাজ করছে। তারই ধারাবাহিকতায় বিশ্বে দুর্নীতির তালিকায় শীর্ষে থাকা অবস্থান থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু তার মানে যে দুর্নীতি একেবারে কমে গেছে বা সেই রাহুগ্রাস থেকে আমরা পুরোপুরি মুক্ত তা নয়। বরং দুর্নীতি এখনো আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলার জন্য তার সমস্ত আয়োজনই ঠিক করে রেখেছে। ফলে সরকারের আন্তরিকতার পরেও দেশে দুর্নীতিবাজদের শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয়েছে। একটি প্রভাবশালী মহল এখনো নানাভাবে দুর্নীতি করে যাচ্ছে। সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত ‘মোংলা বন্দর ও কাস্টম হাউস এবং বুড়িমারী স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশন: আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়ায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুড়িমারী স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশন এবং মোংলা বন্দর ও কাস্টম হাউস উভয় প্রতিষ্ঠানেই পণ্য ছাড় ও শুল্কায়নের প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই নিয়মবহির্ভূত আর্থিক লেনদেন হয়। পণ্য ছাড় ও শুল্কায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া; সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একাংশ এবং শ্রমিক, দালাল ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের একাংশের যোগসাজশে গড়ে উঠেছে এই অসৎ চক্র। দুর্নীতির বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ঘাটতি এবং পুরোপুরি ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় সেবা প্রদান ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে এসব প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটছে। আর এসব অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি। মোংলা ও বুড়িমারী বন্দর এবং সংশ্লিষ্ট কাস্টম হাউসের মাধ্যমে পণ্য আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান সুশাসনের চ্যালেঞ্জ পর্যালোচনাসহ চ্যালেঞ্জগুলো উত্তরণে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের উদ্দেশ্যে পরিচালিত গবেষণায় জুলাই ২০১৭ থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৮ সময়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, শিপিং এজেন্ট, স্টিভিডোর, ক্যারিয়ার, সাংবাদিক, ব্যবসায়িক নেতারা, শ্রমিক ও অন্যান্য অংশীজন থেকে প্রত্যক্ষজনের। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট বন্দর ও কাস্টম হাউস সংক্রান্ত বিভিন্ন দাফতরিক দলিল, প্রবন্ধ, সাময়িকী, ওয়েবসাইট এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রকাশনা থেকেও গবেষণার পরোক্ষ তথ্য সংগৃহীত বলে উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ২০১০ সালে বুড়িমারী বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা এবং বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে পণ্যের শুল্কায়ন ছাড়াই স্পট রিলিজ বা পণ্য ভর্তি ট্রাক পাচার, একই বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে একাধিক পণ্যের চালান পাচারের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি সংক্রান্ত অনিয়ম বন্ধ হয়েছে। বুড়িমারী বন্দর দিয়ে ১৮টি বাণিজ্যিক পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে মিস ডিক্লারেশন এবং ওভার-আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ কমে এসেছে। উভয় কাস্টমসের সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড ব্যবহার হচ্ছে। ফলে সব কাস্টম হাউসের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে ওভার-আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি কমার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে এখনো পেপারলেস অফিস প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং বিদ্যমান ওয়ান স্টপ সার্ভিস অকার্যকর। উভয় বন্দরে পণ্য ছাড়ের ক্ষেত্রে অটোমেশন অনুপস্থিত। উভয় বন্দর ও কাস্টম হাউসের সেবা প্রদানে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায়সহ রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা ঘটছে। সুশাসনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো ব্যবস্থা উপস্থিত থাকলেও তার কার্যকারিতায় ঘাটতি রয়েছে। সার্বিকভাবে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকরণ ঘটছে, যা নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬-২০১৭ সালে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রাক্কলনে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে কমপক্ষে ৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা এবং মোংলা কাস্টম হাউস থেকে কমপক্ষে ১৫ কোটি ৬৯ লাখ টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে আদায়ের কথা ধারণা করা হয়েছে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, দুর্নীতি এখন বৈশ্বিক সমস্যা। মোংলা ও বুড়িমারী বন্দরের দুর্নীতি প্রতিরোধে টিআইবি পণ্যের শুল্কায়ন, পণ্য ছাড় এবং জাহাজের আগমন-বহির্গমন প্রক্রিয়ায় কার্যকর ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রদান নিশ্চিতে সব পর্যায়ে অটোমেশন চালু করার সুপারিশসহ আট দফা সুপারিশ করেছে। আমরা মনে করি, দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকার টিআইবির সুপারিশগুলো পর্যালোচনায় নিতে পারে। আজ সর্বগ্রাসী দুর্নীতি বাংলাদেশের সব উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তাই শুধু দুর্নীতি নির্মূল নয়, এদের মুখোশ উšে§াচনও জরুরি। সমাজের সর্বস্তরে প্রতিরোধ গড়ে তোলা গেলে দুর্নীতি দূর করা কঠিন হবে না। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হতে হবে। আমরা আশা করব, সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় সমাজ একদিন দুর্নীতিমুক্ত হবে।