মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে পরিকল্পিত জনদুর্ভোগ!

সড়ক প্রশস্তে ‘মিডিয়ান’ ভাঙবে ডিএসসিসি: ফ্লাইওভারের উপরে পাঁচ স্থানে বাস স্টপেজ

রাজধানীতে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে ফ্লাইওভার (উড়াল সড়ক) তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল যানজট নিরসন করা। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বড় মেয়র মোহাম্মদ হানিফ উড়াল সড়কটি খুলে দেয়ার পরও এটির নিচের প্রায় ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার সড়ক রাজধানীবাসীর দুর্ভোগের কারণে পরিণত হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, পিপিপি ভিত্তিতে তৈরি ও এ ফ্লাইওভারটি পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড পরিকল্পিতভাবে নিচের রাস্তা সংকুচিত করে দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। আর এর পেছনের ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মদদ রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে নিচের সড়কের এই দুর্ভোগ পুরো উড়াল সড়কের সুফলকে ম্লান করে দিচ্ছে। তাছাড়া উড়াল সড়কের উপর মানুষ চলাচল করলে কিংবা গাড়ি থেকে লোকজন ওঠানামায় যানবাহনের চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এমনকি এখানে একের পর এক দুর্ঘটনাও ঘটছে।
২০১৩ সালের ১২ অক্টোবর যাত্রা শুরু করে মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার। চার লেনবিশিষ্ট এই ফ্লাইওভারটি শনিরআখড়া থেকে বকশীবাজার মোড় পর্যন্ত বিস্তৃত। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারীর (পিপিপি) ভিত্তিতে এ ফ্লাইওভার নির্মাণে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ছিল ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। আর সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু যাত্রাবাড়ী থেকে চাঁনখারপুল পর্যন্ত ফ্লাইওভারের নিচে স্তম্ভগুলোর মাঝামাঝি দুপাশে চওড়া দেয়াল তুলে মিডিয়ান বানানো হয়েছে। এই মিডিয়ানের প্রশস্ত কোথাও-কোথাও মূল রাস্তার থেকেও বেশি হওয়ায় একটি করে বাস সেখান থেকে যাতায়াত করতে হয়। আর এ কারণেই এসব এলাকায় যানজট লেগেই থাকে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা থেকে যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুল, সায়েদাবাদ জনপথ মোড় থেকে টিকাটুলী মোড় পর্যন্ত দুই স্তরের মিডিয়ান রয়েছে। এ অংশে সড়কের প্রায় অর্ধেক চলে গেছে মিডিয়ানে। এখানে আট লেইনের রাস্তা চার লেইনে নেমে এসেছে। টিকাটুলী থেকে জয়কালী মন্দির, গুলিস্তান হয়ে চাঁনখারপুল পর্যন্ত সড়কে এক স্তরের মিডিয়ান রয়েছে। ফ্লাইওভারের নিচের মিডিয়ানগুলো স্থান ভেদে সাড়ে তিন মিটার থেকে ছয় মিটার পর্যন্ত চওড়া। মিডিয়ানের ওপর নানা অস্থায়ী স্থাপনা গড়ে উঠেছে। চাঁনখারপুল এলাকায় মিডিয়ানের ওপর রাখা হচ্ছে ঘোড়ার গাড়ি, ঘোড়া, বিভিন্ন দোকানের মালামাল। বঙ্গবাজার থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত অংশে পুরো মিডিয়ানজুড়ে খাবারের দোকান। ফুলবাড়িয়া থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত অংশে মিডিয়ানজুড়ে বসানো হয়েছে অস্থায়ী জুতার দোকান। মিডিয়ানের কারণে ফ্লাইওভারের নিচের সড়ক সঙ্কুচিত হয়ে পড়ায় যানবাহন চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম। তিনি বলেন, চিটাগাং রোড থেকে ফ্লাইওভারের গোড়া পর্যন্ত ৮ লাইন করছে। এখন সেখান পর্যন্ত গাড়িগুলো তাড়াতাড়ি আসে। ফ্লাইওভারের নিচে এসে গাড়ির গতি কমে যায়। রাস্তা চিকন হয়ে যাওয়ায় টার্মিনাল থেকে গাড়ি বের হওয়ার সময় জ্যাম লেগে যায়।
এদিকে ফ্লাইওভারের নিচে অবৈধ দখল করে রিকশা-ভ্যানের স্ট্যান্ড থেকে শুরু করে ভাতের হোটেল, ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। শনিরআখড়া থেকে নিমতলী পর্যন্ত এই উড়ালসড়কের নিচে পুরোটাই আবর্জনা আর দখলে জর্জরিত। টিকাটুলীর রাজধানী মার্কেট এলাকায় ফ্লাইওভারের নিচে ছিন্নমূল মানুষের বসবাস। গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া অংশে ফ্লাইওভারকে ছাদ বানিয়ে জুতার দোকান, ফলের দোকান, ভাতের হোটেল বসেছে। ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ডের সামনে ফ্লাইওভারের নিচে বাসচালকদের ক্লাবঘরও গড়ে উঠেছে। বঙ্গবাজার থেকে নিমতলী গেটের আগ পর্যন্ত ঘোড়ার আস্তাবল আর ময়লার ভাগাড়। ঘোড়ার বিষ্ঠা আর পাশের মুরগির বাজারের বর্জ্যে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ। কাপ্তান বাজার অংশে মুরগির খাঁচা ও বর্জ্যরে কারণে দুর্গন্ধে উড়াল সড়কের নিচ দিয়ে চলাই দায়। জানা গেছে, প্রতিদিন এখানে বেচাকেনা হয় হাজার হাজার প্রাণী। যেগুলোর খালি খাঁচা রাখা হয় ফ্লাইওভারের নিচে। এসব আড়তে প্রতিদিন স্বাভাবিকভাবেই অনেক মুরগি মারা যায়। এভাবে যেখানে-সেখানে ফেলে রাখায় পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি ছড়ায় রোগ-জীবাণু।
অন্যদিকে এই ফ্লাইওভারের যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও রাজধানী সুপার মার্কেট প্রান্তে বাস বা অন্য গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। সম্প্রতি সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ীতে নিচের রাস্তা থেকে ওপরে পথচারী ওঠানামার জন্য সিঁড়িও যুক্ত করা হয়েছে। ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে মানুষের চলাচলের কারণে চালক ও পথচারী উভয়েই ঝুঁকিতে পড়ছে। ফ্লাইওভারে বাস স্টপেজ রয়েছে বেশ কয়েকটি। ফ্লাইওভারের ওপরে পাঁচটি স্থানে বাস স্টপেজ তৈরি করা হয়েছে। যাত্রীদের ফ্লাইওভারে ওঠানামার জন্য তিনটি স্থানে সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। ফ্লাইওভারে ওঠানামার র‌্যাম্পগুলোর সংযোগস্থলে অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীরা এ সিঁড়ি দিয়েই ওঠানামা করছেন। বাস ছাড়াও হিউম্যান হলারের যাত্রীরাও ওঠানামা করে ওই স্টপেজগুলোতে। রাস্তার দুই পাশে এভাবে যাত্রী ওঠানামা করানোই শুধু নয়, বাস থেকে নেমে ঝুঁকি নিয়ে দৌড়ে ফ্লাইওভারের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যাচ্ছেন যাত্রীরা। বাসের যাত্রীরা দিব্যি ঘোরাফেরাও করেন ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে, চঞ্চল পায়ে ছোট শিশুদের বিপজ্জনক ছোটাছুটিও দেখা যায়। দুনিয়ার অন্য কোনো দেশের ফ্লাইওভারে বাস থেকে যাত্রী ওঠানামা বা যথেচ্ছভাবে লোকজন চলাচলের ঘটনা না ঘটলেও আমাদের দেশে তা অহরহ ঘটছে। কোনো কোনো ফ্লাইওভারে মানুষকে দল বেঁধে আড্ডা দিতেও দেখা যায়। ফ্লাইওভারের ওপর গাড়ি থামিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনাও প্রায়ই ঘটছে।
এভাবেই মেয়র মোহাম্মদ হানিফ উড়াল সড়কের নিচে ও উপরে নানা অনিয়ম দেখা গেছে। তাছাড়া প্রায় পরিত্যক্ত সড়কগুলো যাত্রী ও যানবাহন চালকদের জন্য ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। আর এ দুর্ভোগ পুঁজি করে সিটি কর্পোরেশন থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার সংস্কার কাজ করা হলেও পরিস্থিতি পাল্টায় না। স্থানীয়দের অভিযোগ, যানজট কমানোর অজুহাতে নিচের রাস্তার দিকে একেবারেই নজর দিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ।
এ ব্যাপারে ডিএসসিসি মেয়র সাঈদ খোকন বলেছেন, মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারের নিচের প্রশস্ত মিডিয়ানগুলোর সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য চিন্তা করেছিলাম। কিন্তু পর্যবেক্ষণ করে দেখলাম এই মিডিয়ানের কারণে ফ্লাইওভারের নিচের সড়কের প্রশস্ততা কমে গেছে। এ কারণে যানবাহন চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যে কোনো কারণেই হোক এটা শুধু শুধু করা হয়েছে। এটা কোনো স্ট্রাকচার না, এটা একটা ‘অবস্টাকল’। যানবাহন চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে এই মিডিয়ান ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে’ করা হয়েছিল বলে মনে করছি, তাই এগুলো ভেঙে ফেলা হবে। মিডিয়ান ভাঙার পর যে খালি জায়গা পাওয়া যাবে, সেখানে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে। গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকায় যে বাসগুলো এলোমেলো দাঁড় করিয়ে রাখা হয়, সেখানে এমন অনেক বাসের জায়গা হয়ে যাবে। এটা করলে গুলিস্তান এলাকায়ও শৃঙ্খলা আসবে। মিডিয়ানগুলো ভাঙার সব প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা হয়েছে। আর্থিক ও প্রশাসনিক অনুমোদন দেয়ার জন্য আমরা ফাইল ইতিমধ্যে কল করেছি। এটি অনুমোদন দেয়ার পর টেন্ডারে যাবে। টেন্ডার হওয়ার পর আগামী তিন-চার মাসের মধ্যে এ কাজটা কমপ্লিট হয়ে যাবে।
বাংলাদেশে প্রথম সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে নির্মিত এ ফ্লাইওভার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করছে ওরিয়ন গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির প্রকৌশলী শাহজাহান আলী পাটোয়ারী দাবি করছেন, ফ্লাইওভারের সুরক্ষা এবং যানবাহন যেন দ্রুতগতিতে চলতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রেখেই মিডিয়ান নির্মিত হয়েছে। একজন নিরপেক্ষ বিদেশি ইঞ্জিনিয়ার এই ফ্লাইওভারের ডিজাইন করেছেন। তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে ডিজাইন করেননি, আবার সিটি কর্পোরেশনের দিকে তাকিয়েও ডিজাইন করেননি। মিডিয়ানগুলো থাকার কারণে ফ্লাইওভারের নিচের সড়কে দুর্ঘটনা অনেক কম হয়। তবে সিটি কর্পোরেশন মিডিয়ান ভেঙে ফেলতে চাইলে তাদের কোনো আপত্তি নেই বলে জানান তিনি।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.