মেলার প্রাণ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান

মেলার প্রাণ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান

এইতো মাত্র কয়েক বছর আগের কথা। বাংলা একাডেমি চত্বরে বসতো বাঙালির প্রাণের অমর একুশে বইমেলা। মেলাকে ঘিরে পুরো ফেব্রুয়ারি মাস একাডেমি প্রাঙ্গণ লেখক, কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার ও সংস্কৃতিকর্মীদের মিলনমেলায় মুখরিত হয়ে উঠত। বই আর সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের ভিড়ে স্টল ঘুরে প্রছন্দের বই কেনা দুষ্কর ছিল বইপোকাদের। সময় স্রোতে বেড়েছে মেলার পরিধি, বেড়েছে প্রকাশনা সংস্থার সংখ্যা। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় পার্শ্ববর্তী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একটি অংশকেও মেলার অংশ করা হয়। এরপর ক্রমেই বদলে যেতে থাকে মেলার চিত্র। এখনো দুই চত্বরে মেলা বসলেও মেলায় পূর্ণাঙ্গ রূপ থাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অংশে। লেখক, প্রকাশক, পাঠকসহ সবার সরব উপস্থিতি নান্দনিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে দেয় আলাদা এক প্রাণচাঞ্চল্যতা। অন্যদিকে বাংলা একাডেমি চত্বরের দিকে ঢু মারতে চান না কেউই। এক সময়ের জমজমাট এ চত্বরটি এখন লিটল ম্যাগ চত্বর এবং কয়েকটি রাজনৈতিক স্টলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

মেলার সংশ্লিষ্টরাও স্বীকার করলেন একথা। এ প্রসঙ্গ বিষয়ে তাম্রলিপি, অধ্যয়ন প্রকাশনার স্বত্বাধিকারী এবং প্রকাশক তাসনুভা আদিভা মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী মেলার প্রাণ হবে এটাই প্রত্যাশিত। কারণ মানুষ বই কেনার আগে একটু মনমতো করে ঘুরে দেখতে চায়। কিন্তু বাংলা একাডেমির ভেতরের স্থান অত্যন্ত স্বল্প। এত কম স্থানেতো আর মনের মতো করে ঘুরে ফিরে দেখেশুনে বই কেনা সম্ভব নয়। এ ছাড়া সোহরাওয়ার্দীতে দেখুন বিশাল জায়গা। খোলা আকাশ। পাশেই স্বাধীনতা স্তম্ভ। লেকের পানিতে স্তম্ভের ছায়া এখানে এক আলাদা স্বর্গীয় আবেশ সৃষ্টি করেছে। ফলে পাঠকরা এদিকটাতেই বেশি আসতে চান। আর আমরা যারা প্রকাশক তাদেরতো প্রত্যাশাই থাকে পাঠক যেখানে, সেখানে থাকার। সে অর্থে আমরাও সোহরাওয়ার্দী কেন্দ্রিক থাকতে চাইব এটাই প্রত্যাশিত।’ মেলা এরইমধ্যে পাঁচ দিন পার করে ষষ্ঠ দিনে পড়েছে। প্রতিদিনই মেলা ঘুরে দেখা যায়, লেখক, পাঠক এবং নাম করা অধিকাংশ প্রকাশকেরই অবস্থান এখন সোহরাওয়ার্দীতে। কর্তৃপক্ষও বলছে, পাঠকসহ সংশ্লিষ্ট সবার মানসিকতা বুঝে তারাও সোহরাওয়ার্দীকে সেভাবেই সাজিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে লেখক বলছি কর্নার, মোড়ক উন্মোচন মঞ্চ, কৃত্তিম ঝর্ণা, শিশু কর্নার, ক্যাফেটেরিয়াসহ সব আয়োজনও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে। বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোরও তাই এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি ভালো স্টল পেতে করে থাকেন নানা চেষ্টা তদবির।

এবারের মেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়টি হলো মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে বাঙালি জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের যে স্থানে দাঁড়িয়ে ৭ মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন সেখানে নির্মিত স্বাধীনতা স্তম্ভ এবং তত্সংলগ্ন লেক। এদিকটাতে এবারের মেলার প্রতিটি দিনই তুমুল ভিড় লেগে থাকতে দেখা গেছে। লেকের পানিতে বিশাল স্বাধীনতা স্তম্ভের ছায়া পড়ন্ত বিকেলে ইট-পাথরের রাজধানীর বুকে যেন এক স্বর্গীয় সৌন্দর্যের আবহ। আর তাই বইমেলায় আগত একজন পাঠকও এ সৌন্দর্য থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে চান না।

দুপুর তিনটায় মেলার দ্বার খোলার পর থেকে শেষ অবধি তাই এখানে জমে থাকছে সেলফিপ্রেমীসহ নানা বয়সের মানুষের যম্পেশ আড্ডা।
কথাসাহিত্যিক হামীম কামরুল হক বলেন, ‘বই মানুষকে মুক্তি দেয়। কিন্তু বই কিনতে যদি বদ্ধ জায়গায় যেতে হয় তবে তাতো বইপ্রেমীদের জন্য সুখকর হবে না। মুক্তমনা মানুষরাই বই কেনেন। তারা মুক্ত পরিবেশকেও বেশি পছন্দ করেন। যেটি আছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। কর্তৃপক্ষও মেনে নিয়েছেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানই মেলার প্রাণ। তাছাড়া এ উদ্যানের সঙ্গে আমাদের অস্তিত্ব এবং স্বাধীনতার সম্পর্ক। সে কারণেও অনেকে এখানে এসে নিজেদের অস্তিত্বেরও সন্ধান করে থাকেন।’

শোভা প্রকাশনার কর্ণধার মিজানুর রহমান বলেন, ‘মেলায় ছোটখাটো কিছু ত্রুটি থাকলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এখন মেলাকে ধারণ করছে। প্রকৃতি, খোলা আকাশ, স্বাধীনতা স্তম্ভ, লেকসহ এখানে রয়েছে সর্বাধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা, উন্নত মানের ক্যান্টিন, নামাজের স্থান। এসব মানুষকে আকর্ষণ করছে।’

লেখক-প্রকাশকের পাশাপাশি পাঠকরাও বিষয়টিকে একইভাবে দেখছেন। তারাও মনে করেন বাংলা একাডেমির চেয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানই এখন প্রকৃত মেলাকে ধারণ করছে। আর এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, তারা সোহরাওয়ার্দীতে এসে প্রকৃতির অগাধ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারছেন। এ ছাড়া ঘুরে ঘুরে দেখেশুনে বই কিনছেন। যে সুযোগ বাংলা একাডেমির চত্বরে নেই।

কথা হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরিফা জাহানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাংলা একাডেমির ভেতরের স্থানটি খুবই ছোট। এ ছাড়া ভালো স্টলগুলোও এখানে নেই। স্যানিটেশন, নামাজের স্থান, বিশুদ্ধ পানি, ফ্রি কফিসহ কত কিছুই আছে সোহরাওয়ার্দীতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কলি ইসলাম বলেন, ‘বাংলা একাডেমি এবং সোহরাওয়ার্দী দুটিই আমাদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটির সঙ্গে ভাষা আর অন্যটির সঙ্গে স্বাধীনতার স্মৃতি জড়িত। কিন্তু সোহরাওয়ার্দীকে বিশেষভাবে ভালো লাগার কারণ এর সৌন্দর্য। যেটা বাংলা একাডেমিতে নেই।’

মূল মঞ্চের আয়োজন: বিকেল ৪:০০টা গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় কবি সিকান্দার আবু জাফর: জন্মশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি নাসির আহমেদ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ড. শিরীন আখতার এবং কবি বায়তুল্লাহ কাদেরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

লেখক বলছি কর্নার: প্রথমবারের মতো এ বছর ভালো মানের ৫ জন লেখককে ২০ মিনিট করে নিজের বই নিয়ে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে মেলা আয়োজক কর্তৃপক্ষ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের লেক পাড়ে ‘লেখক বলছি কর্নার’-এর এ আয়োজনে মঙ্গলবারে নিজেদের সাহিত্যকর্ম বিষয়ে আলাপনে অংশ নেন অনুবাদক আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া (মিথের পথ), শিশুসাহিত্যিক আলম তালুকদার (দশ ফালি রোদ), কথাসাহিত্যিক হামীম কামরুল হক (মঙ্গলবারের জন্য অপেক্ষা), কবি অরবিন্দ চক্রবর্তী (রাত্রির রঙ বিবাহ) এবং কবি আয়েশা ঝর্ণা (কাভাফির কবিতা)। প্রত্যেকেই তাদের বইয়ের ওপর ২০ মিনিট কথা বলেন। এরপর চলে পাঠক প্রশ্নোত্তর পর্ব।

মোড়ক উন্মোচন: গত বছরের মতো এবারো মেলায় রয়েছে মোড়ক উন্মোচন কর্নার। প্রতিদিনই অনেক বই আসলেও মোড়ক উন্মোচন করান গুটিকয়েক লেখক। তবে যারা এ কর্নারে এসে মোড়ক উন্মোচন করাচ্ছেন তাদের বক্তব্য শুনে অনেক পাঠক আগ্রহী হচ্ছেন সেসব বই কিনতে। আর এ কারণে মোড়ক উন্মোচনের আলাদা একটা গুরুত্ব রয়েছে। গতকাল চারটিসহ এখনো পর্যন্ত মোট ২৪টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয়েছে এবারের বই মেলায়। মঙ্গলবার উন্মোচন হওয়া বইয়ের মধ্যে রয়েছে, ডি. এস. সাদ্দামের শিশির গল্প গ্রন্থ, মো. সেলিম খানের বর্তমান সরকার আমলের উন্নয়ন ও সফলতা, আব্দুর রহিমের কাব্যচাপ-কাব্যগ্রন্থ এবং উত্তর কুমার সরকারের বানার তীরের আনন্দ গান।

নতুন বই: গতকাল মেলায় ১৫২টি নতুন বই এসেছে বলে জানিয়েছে বাংলা একাডেমির জনসংযোগ অফিস। এর মধ্যে গল্প ২০টি, উপন্যাস ৩৩টি, প্রবন্ধ ১৫টি, কবিতা ৪০টি, গবেষণা ২টি, ছড়া ২টি, শিশুসাহিত্য ২টি, জীবনী ৫টি, মুক্তযুদ্ধ বিষয়ক ৭টি, বিজ্ঞান বিষয়ক ৩টি, ভ্রমণ বিষয়ক ৩টি, নাটক ২টি, রাজনীতি বিষয়ক ১টি, ধর্মীয় ১টি, অনুবাদ ২টি, সায়েন্স ফিকশন ১টি, অন্যান্য ১৪টিসহ মোট ১৫২টি নতুন বই এসেছে। উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে গ্রন্থকুটির প্রকশনা এনেছে লেখক মোজাফ্ফর আহমদের ‘বাংলা সাহিত্যের নানাদিক’ আগামী প্রকাশনী এনেছে নোমান মোহাম্মদের ‘ফুটবল পায়ের মুক্তিযুদ্ধ’, অনন্যা প্রকশনা এনেছে দিপু মাহমুদের ‘নতুন ডায়েরি-১৯৭১’, এবং মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের ‘সমাজ ও নানা চিন্তা’, শ্রাবণ প্রকাশনী এনেছে অশিস গোস্বামীর ‘শব্দাবলী স্টুডিও থিয়েটার কথা’, তৃণলতা প্রকাশনী এনেছে আহসান হাবীবের ‘বিজ্ঞান কল্প গল্প’, উত্স প্রকাশন এনেছে হাসান শাহরিয়ারের ‘নিউজউইকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বিজয় এবং তারপর’ নবযুগ প্রকাশনী এনেছে অধ্যাপক আব্দুল মান্নানের ‘এডুকেশন হিউম্যানিটি এবং হিরোইজম’, সানজীদা খাতুনের ‘অগ্রজজনের সৃষ্টিবীসা’, তৃণলতা প্রকাশ এনেছে অনুপম হায়তের ‘গণমাধ্যমে নজরুল’, তরফদার প্রকাশনী এনেছে হায়দার আকবার খান রানোর ‘মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থিরা’, কথা প্রকাশ এনেছে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘হস্তান্তর নয় রূপান্তর চাই’, পুথিনিলয় প্রকাশন এনেছে বিনয় দত্তের ‘এই শহর সুবোধদের’।

আজকের আয়োজন: আজ ৬ ফেব্রুয়ারি, অমর একুশে গ্রন্থমেলার ষষ্ঠ দিন। মেলা চলবে বেলা ৩:০০টা থেকে রাত ৯:০০টা পর্যন্ত। বিকেল ৪:০০টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়: জন্মশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন আবুল হাসনাত। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন বিমল গুহ, গোলাম কিবরিয়া পিনু এবং শোয়াইব জিবরান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন কবি আসাদ চৌধুরী। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, কবিতা-আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

মানবকণ্ঠ/এসএস