মেধার প্রাচুর্যে হেসে উঠুক বাংলাদেশ!

মেধার প্রাচুর্যে হেসে উঠুক বাংলাদেশ!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একজন শিক্ষক টিভি টকশোতে এসে বললেন, ইতিহাস জেনেই বলছি পৃথিবীর কোথাও এ ধরনের আন্দোলন হয়নি। বাংলাদেশেই প্রথম শিশু-কিশোরদের এমন আন্দোলন। এমন একটি তথ্য জানতে পেরে গর্বে বুক ভরে গিয়েছে। আমার দেশের সন্তান বলে। সহপাঠীর মৃত্যুর প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে এক অভূতপূর্ব, অভাবনীয় নীতিনিষ্ঠ আন্দোলন করেছে আমাদের কোমলমতি শিশু-কিশোর। ওদের আন্দোলনটা ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতর অনেকটা সংস্কারের মতন। ওদের ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ডে যা দৃশ্যমান ছিল। দৃশ্যমান ছিল সড়কে ওদের কার্যকলাপে। মন্ত্রী, পুলিশ, আমলা, বিচারপতি এমন অনেকের গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকার অপরাধটা তারা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে অথচ এসব দায়িত্বশীল মানুষ প্রত্যহ নীতি কথা বলেন, নীতি তৈরি করেন। আইন তৈরি করেন। আইনানুসারে শাসন করেন। শিশু-কিশোরদের সাত দিনের নিরাপদ সড়কসহ নয় দফা দাবির এই আন্দোলন প্রত্যক্ষ করেছি স্বচক্ষে। দেখেছি, অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তারা বৃষ্টিতে ভিজে এই কাজটি করছে। ফলে মন্ত্রী, পুলিশ, আমলা, আর্মি কিংবা অন্য কেউ সাধারণ পথচারী শিশু-কিশোরদের এই দায়িত্বপ্রবণ আচরণে বিন্দুমাত্র বিব্রত, বিরক্ত হননি বরং নিজেদের ভুল স্বীকার করেছেন, অবনত হয়েছেন। পুলিশের গাড়ির কাগজপত্র না থাকায় তারা পুলিশ সার্জেন্টকে দিয়েই মামলা করিয়েছে। এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে। যেন মূল্যবোধহীন একটি রাষ্ট্রের ভেতর বোধ জাগাতে হঠাৎ করেই জেগে উঠল আমাদের শিশু-কিশোর। অভাবনীয় এক কৌশলে জাগিয়ে দিল আমাদের। মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা আমরা, নড়েচড়ে উঠলাম। ভাবলাম, কে ওদের এভাবে জাগিয়ে দিল, সহপাঠীর মৃত্যু নাকি ছোট একজোড়া চোখে দেখা আশপাশের বঞ্চনার গল্পগুচ্ছ, যা পুঞ্জীভূত হয়েছিল ক্ষোভে, অভিমানে? অনেকের মতে, এটা দীর্ঘদিনের জমা থাকা মেঘ।

সরকার স্বীকার করেছে, শিশু-কিশোরদের এই আন্দোলন যৌক্তিক। সরকার মেনে নেয়ার মৌখিক ঘোষণাও দিয়েছে। ধন্যবাদ সরকারকে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন এই আন্দোলনের সফলতা থেকে আগামীতে করণীয় উদ্যোগের আভাস দিয়েছেন। সাধুবাদ তাদের। সুশীল সমাজের বুদ্ধিওয়ালারা অভিভূত এবং তারা এটাকে কাজে লাগানোর জন্য কেউ কেউ সরকারকে পরামর্শ দেন। ছোটরাও যে অনেককিছু বোঝে, এই সত্য অনুধাবনের জন্য বুদ্ধিওয়ালাদেরও অভিবাদন। আজ সরকার থেকে শুরু করে যারাই শিশু-কিশোরদের এই আন্দোলনকে যৌক্তিক বলেছেন, শিক্ষণীয় বলেছেন, তারা দূর থেকেই বলেছেন। কাছে গিয়ে বলার ফুরসত পাননি। তবে মোদ্দা কথা কেউই এই আন্দোলন নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাননি। দেখার সুযোগ ছিল না, নেইও। এটাই সত্য।

আর এই সত্যই কাল হয়ে দাঁড়াল। একদিকে, সরকার শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেয়ার মৌখিক ঘোষণা দেবার মুহূর্ত থেকেই নৌমন্ত্রীর পরিবহন সেক্টর অঘোষিত ধর্মঘট শুরু করে। যেন কোমলমতি শিশু-কিশোরদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াল বাংলাদেশের দুর্ধর্ষ গোটা পরিবহন সেক্টর। এই সেক্টরের নেতা নৌপরিবহনমন্ত্রী। সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তার অশোভনীয় আচরণের জন্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাকে সংযত হয়ে কথা বলতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেই পরামর্শমতো তিনি দুঃখও প্রকাশ করেছেন। ব্যস ওইটুকুই। নিরাপত্তার অজুহাতে তার সেক্টরের গাড়ির চাকা সব বন্ধ হয়ে গেল। দূরপাল্লার যাত্রীদের চলাচলে মারাত্মক দুর্ভোগ সৃষ্টি হলো। অবাক হলাম সরকারের ভূমিকা দেখে। উচ্চকণ্ঠে হুঁশিয়ারি শুনতে পেলাম না, চাকা চালাও ! এটাকে শিশু-কিশোরদের আন্দোলনকে প্রতিহত করার কৌশল মনে হলো। অন্যদিকে শিশু-কিশোরদের এই আন্দোলনের অর্জনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের জন্য উঠেপড়ে লাগল রাজনৈতিক দলগুলো। নিজেদের কোনো মেধা সৌন্দর্য নেই রাজনৈতিক দলগুলোর, নেই দলগুলোর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা। অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে রেখে দেখতে হবে না, খালি চোখে স্পষ্ট দেখা যায়- কী পরিমাণ ক্ষমতালোভী এই রাজনৈতিক দলগুলো। জাতির স্বার্থের চাইতে দলের স্বার্থ বড় হয়ে থাকে। দলের প্রয়োজনে যে কোনো হিংস্র কাজ এরা দিব্যি ঘটিয়ে থাকে। জ্বালাও, পোড়াও, মারো, ধ্বংস কর, চাপাতির কোপ দাও, হাতুড়ি দিয়ে পেটাও, রগ কাটো এমন একটি গ্রুপ পোষা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক সংস্কৃতি। যে সংস্কৃতির চর্চায় রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যাওয়ার কথা ভাবেন কিংবা ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার মনস্থির করেন। ঠিক এমন একটি মুহূর্তে সমর্থনের অজুহাতে শিশু-কিশোরদের এই সামাজিক আন্দোলনকে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করতে বিএনপি, জামায়াত যখন তৈরি, ঠিক ততক্ষণে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন কোমলমতি শিশু-কিশোরদের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। শুরু হয়ে যায় কোমলমতি শিশু-কিশোরদের এই অভূতপূর্ব সামাজিক আন্দোলনের অর্জনকে ইস্যুকে করে রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি জবাব। এই অশুভ, অপরাজনীতির শিকার হয় নিরীহ শিশু-কিশোররা, ছিনতাই হওয়ার উপক্রম হয় তাদের অরাজনৈতিক সামাজিক আন্দোলন। আন্দোলনের সপ্তম দিনের ঘটনা নিয়ে কেউ কেউ বললেন, পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার প্রয়োজনে এটা বিএনপি, জামায়াত ঘটিয়েছে। যদি তাই হয়, তাহলে পত্রিকার পাতায় বেশ স্পষ্ট করে যাদের আক্রমণাত্মক ছবি ছাপা হয়েছে, কেন তাদের ধরা হলো না, হচ্ছে না ? তাদের ধরেই তো স্পষ্ট প্রমাণ জনগণকে দেয়া সম্ভব হতো, নয় কি? আর পুলিশের উপস্থিতিতে বিরোধী দল বা অন্যদলের কর্মীরা এতটা দুঃসাহসিক, ঘৃণ্য কাজ নির্বিঘ্নে দেখিয়ে যাবে, সেটাই বা ভাবছি কী করে?

অনেক প্রশ্ন। অনেক হতাশা। আজ সরকার বলছে, তৃতীয় পক্ষ ঢুকে গেছে। আমি একমত। কিন্তু তার দায় কার বা কাদের ওপর বর্তায়, একটু ভাবার অনুরোধ করি। সড়ক দুর্ঘটনার পরপরই আন্দোলনরত শিশু-কিশোরদের পাশে গিয়ে একটা স্পর্শকাতর উদ্যোগ নেয়া যেত সরকারের পক্ষ থেকে। আমার মন বলছিল, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে হয়তো পাশে চাইছিল তারা। যদি তিনি বলতেন, বেশ করেছ তোমরা। এবার ঘরে যাও, বাকিটা আমাকে করতে দাও! কী হতো তাহলে? শিশু-কিশোরদের এই সামাজিক আন্দোলন নিয়ে কোনো রাজনীতি হতো না হয়তো।

একটা বিষয় আবারো পরিষ্কার হয়েছে যে, আইন যতই থাক একটি রাষ্ট্রে, আইন রক্ষাকারী বাহিনী ও তার সাজ আর ক্যারিশমা যতই থাক, মানবাধিকার ও মানবতার যত দোহাই আর পুরস্কার থাক রাষ্ট্রে, যতই থাক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, এদেশের শিশু-কিশোর, তরুণরা মোটেও নিরাপদ নয় এবং তা স্রেফ রাজনৈতিক সদ্বিচ্ছার অভাবে। অতীতের মতো, বর্তমানে সেই সত্য দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। শুনতে খারাপ লাগলেও, তা সত্য। দেশের প্রতি পবিত্র দায়কে স্পষ্ট করতে না পারলে, আগামীর দেশটা হয়ে পড়বে অস্পষ্ট। যারা রাজনীতি করেন, খেয়াল করেছি প্রতিটি দলের নেতাকর্মীদের মাঝেই দলান্ধতা বেশ প্রবল এবং একমাত্র আচরণে পরিণত হয়। যা দলকে লাভবান করে, দেশকে নয়। এসব নেতাকর্মীর ছোবল থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য আজকের এই শিশু-কিশোরদের অভিনব সামাজিক আন্দোলনটাই জরুরি ছিল। মনে একটা শঙ্কা উঁকি দেয়, হয়তো এই ধ্রুব সত্য সব রাজনৈতিক দলই অনুধাবন করেছিল আর তাই শিশু-কিশোরদের ওপর আঘাত করে তা নস্যাৎ করার নির্মম ঘটনাই ঘটিয়ে দিল।

পরিশেষে বলি, শিশু-কিশোরদের এই আন্দোলন শেষ হয়নি বরং শুরু। এই আন্দোলনকে সক্রিয় রাখতে হবে শিক্ষায়, জ্ঞানে এবং আদর্শে। ভালো চিন্তার মধ্য দিয়ে এই বোধ এগিয়ে নিতে হবে। সরকার যদি রাজনৈতিক হয়, তাহলে তার কাছে দল বড় হয়। অতীতেও হয়েছে। সুতরাং দ্বন্দ্বে না গিয়ে, মেধার প্রাচুর্যে গণজাগরণ ঘটতে হবে। পরাস্ত করতে হবে সব অপশক্তিকে। কারণ, আগামীর নেতৃত্ব তোমাদের হাতেই। আসুন, এই শিশু-কিশোরদের জন্য একটি নিরাপদ রাষ্ট্র গড়তে যে যার জায়গায় দাঁড়িয়ে কাজ করি! মানুষ হিসেবে আরো একবার আত্মপ্রকাশ করি।
– লেখক: কথাসাহিত্যিক

মানবকণ্ঠ/এসএস