মৃত্যুযানের কবলে আমাদের রাজপথ

ক’দিন হলো সব কিছু রাস্তাতে আটকে আছে। রাস্তাতে মানে ঠিক রাস্তায় না। রাস্তায় চলাচল করা যানবাহনে। তাও সব যানবাহনে না। একটা বিশেষ যানে। যেটার নাম বাস। গত কয়েকদিন থেকেই বাসগুলো বড় বেশি শরীরের ওপরে উঠে পড়ছিল। গত ঈদে প্রায় ৩০০ মানুষকে মেরে ফেলেছে রাস্তাতে। এর পরে ঢাকা শহরে কখনো কারো হাত ছিঁড়ে নিয়ে গিয়েছে, কখনো পা।

কয়েকদিন আগে তো একবার একজন বাস ড্রাইভার একজনের পায়ের ওপরে বাস পার্ক করে রেখে চাবি নিয়ে পালিয়ে যায় আবার বাসের ড্রাইভার, হেলপার আর কন্ডাক্টর মিলে নিজের বাসের আহত এক যাত্রীকে মুখ থেঁতলে মেরে ব্রিজ থেকে ফেলে দেয়। এর পরেই স্কুলের বাচ্চা ছেলে-মেয়েদের ওপরে ‘জাবালে নূর’ নামের বাসের এক দানব ড্রাইভার বাস তুলে দিলে সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় দুই কিশোর। আহত হয় প্রায় আরো ১২ জন।

এর পরেই বাঙালি রেগে ওঠে আর রেগে উঠলেই বাঙালি গাড়ি ভাঙে, গাড়িতে আগুন দেয়। তবে এবার যেহেতু ব্যাপারটা ছাত্রদের হাতে ছিল, কোনো রাজনৈতিক দলের হাতে না, তাই গাড়ি ভাঙা আর আগুন দেয়া হয়েছে খুব হিসাব করে। শুধু বাসে। যারা এর জন্য দায়ী। কোনো প্রাইভেটকার ভাঙেনি। আর অদ্ভুত একটা ব্যাপার হয়েছে এবার। অনেকদিন পরে বাঙালি এই গাড়ি ভাঙার ইস্যুতে পক্ষ-বিপক্ষ দুটি দলে ভাগ হয়ে যায়নি। তারা এক ছিল। রাস্তা বন্ধ করে রেখেছিল বাচ্চাগুলো। মানুষের কষ্ট হয়েছে। বৃষ্টির মাঝে কষ্ট হওয়ারই কথা। কিন্তু কেউ বিরক্ত হয়নি। সবাই নীরব সমর্থন দিয়ে গিয়েছে। কষ্ট করেছে। কিন্তু সমর্থন দিয়েছে।

বাচ্চাগুলো বার বার বিচার চেয়েছে। খুনি ড্রাইভারের বিচার চেয়েছে। আমাদের একজন মন্ত্রী অনাবিল হাসি দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন যে, ‘দোষী হলে অবশ্যই বিচার হবে। সেই রায় সবাইকে মানতে হবে।’ তার পরের কথাগুলোর জন্য আমরা তার এই দামি কথাগুলো খেয়াল করিনি। সংবাদ সম্মেলনে তিনি কেন হাসলেন, ভারতকে টানলেন সেটা নিয়ে কথা বলা শুরু করে দিয়েছে অথচ তিনি কিন্তু খুবই সরলভাবে কঠিন একটা কথা বলে দিয়েছেন। সেটা ব্যাখ্যা করলে অনেকটা এমন দাঁড়ায়, বিচার হলেও ঘোড়ার ডিমই পাবে তোমরা এবং এই কথাটি উনি কিন্তু আইনত ঠিক বলেছেন। বিশ্বাস হচ্ছে না? চলেন দেখি কী আছে আইনে? ধরেন আপনি গাড়ি চাপা দিয়ে ৮ বা ১০ জনকে মেরে ফেললেন। তাহলে আপনার কী হতে পারে?

আপনার বিচার হবে যে আইন অনুযায়ী তার নাম হলো, Motor Vehicle Ordinance, 1983 [Modified upto 29th November 1990] (Ordinance No. LV of 1983)। এটির কয়েকটি ধারা, যা আপনার জন্য দরকার তা হলো ১৪২. Driving at excessive speed প্রথম বার ১ মাস, ২য় বার ৩ মাস জেল। সাথে জরিমানা অপশনাল। ১৪৩. Driving recklessly or dangerously ১ম বার ৬ মাস, ২য় বার ৩ বছর জেল। সাথে জরিমানা অপশনাল। ১৪৪. Driving while under the influence or drink or drug ১ম বার ৩ মাস, ২য় বার ২ বছর জেল। সাথে জরিমানা অপশনাল। ১৪৫. Driving when mentally or physically unfit to drive ১ম বার ৫০০ টাকা, ২য় বার ৩ মাস জেল।

মজার ব্যাপার হলো এখানে কিন্তু কোথাও বলা নেই চাপা দিয়ে মেরে ফেললে কী হবে। মেরে ফেললে বা যাকে বললে হত্যা করা হলে আমরা জানি পেনাল কোডের ৩০২ ধারাতে যাবে বিচার। সবাই আমরা বাংলা সিনেমা দেখেছি। আর জানি ৩০২ ধারা অনুসারে সর্বোচ্চ শাস্তি হলো মৃত্যু দণ্ড। তাহলে আপনি ভাবতে পারেন আপনার ফাঁসি হয়ে যেতে পারে। মোটেই সেটা নিয়ে চিন্তা করবেন না। কারণ আপনি হয়তো ভুলে গেছেন আপনি বাংলাদেশে আছেন। অনেক আগে যখন আমরা কিছুটা সভ্য ছিলাম, তখন গাড়ি চাপায় মারা গেলে ৩০২ ধারাতে বিচার চাওয়া যেতো। কিন্তু আন্দোলন করে পরিবহন শ্রমিক এবং তাদের নেতারা আপনার বিচার চাওয়ার জন্য ৩০২ বন্ধ করে ৩০৪ বি তে পাঠিয়ে দিয়েছে। এতে লিখা আছে, গাড়িচালকের ওভার স্পিড বা অবহেলায় কেউ মারা গেলে যদি তা ইচ্ছাকৃত না হয়, তাহলে সর্বোচ্চ শাস্তি ৩ বছর জেল। সাথে জরিমানা অপশনাল।

মানে আপনি ইচ্ছে করে কাউকে বা অনেক মানুষকে চাপা দিয়ে মারলে এবং শুধু যদি প্রমাণ করতে পারেন যে, ইচ্ছে করে মারেননি তাহলে শুধু ৩ বছর কারাদণ্ড আর একটু (বেশি না) কষ্ট করে যদি প্রমাণ করে দেন যে, ব্রেক ফেল করেছে অথবা স্টিয়ারিং জ্যাম হয়ে গিয়েছে তাহলে ৩ মাস জেল। অর্থাৎ আপনি ৮, ১০, ৫০ বা ১০০ জন মানুষকে একবারে খুন করে মাত্র ৩ মাস জেলের শাস্তি পেতে পারেন। অসাধারণ ডিসকাউন্ট দেয়া আছে বাস, ট্রাকসহ সব ড্রাইভারকে। তাহলে বলেন তারা কেন গাঁজা খেয়ে গাড়ি চালাবে না? আপনার আমার উপরে উঠিয়ে দেবে না?

মন্ত্রী সাহেব তার কাজ অনেক আগেই করে রেখেছেন। রাজনীতিবিদরা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হন। তিনি তো প্রায় মঙ্গল গ্রহও খালি চোখে দেখতে পারেন। জানতেন এমন সময় আসতে পারে। তাই সব ড্রাইভার ভাইকে বাঁচাতে সফল আন্দোলন করে তাদের ৩ মাস জেলের ব্যবস্থা রেখেছেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নে তাই হাসি তার পাবেই। বাচ্চাগুলো রোদে পুড়ে, পুলিশের মার খেয়ে, বন্ধুর লাশের দুঃখে আর হাসপাতালে ব্যথায় কাতর সহপাঠীর জন্য রাস্তা আটকিয়েছে ৩ মাস জেলের দণ্ডের জন্য। হাসির কথা না? আপনিও হাসুন। আপনিও সিরিয়ালে আছেন। হ লেখক: সহকারী অধ্যাপক শান্ত-মরিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি

মানবকণ্ঠ/এএএম