মুরাদনগরে অবহেলিত নজরুলের স্মৃতি

যার পরম পরশে কবি অগ্নিবীণা বাজিয়েছেন সেই নার্গিসের জন্মভূমি ও কবিতীর্থ দৌলতপুর আজও চরম অবহেলিত। প্রতি বছরই জ্ঞানী, গুণী ও বড় মাপের অনেকেই এখানে বক্তব্যে নানান কিছু করে দেয়ার প্রতিশ্রুতির ফুল ফুটিয়েছেন, বাস্তবে আদতে কবি বিজড়িত স্থানটির কোনো পরিবর্তনের বিন্দুমাত্র ছোঁয়া নেই বলে স্থানীয়দের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। এখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে কবির নামে হয়নি কোনো প্রতিষ্ঠান। নেই কবির একটি ম্যুরালও। এ অবস্থার মধ্য দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার কবির ১১৯তম জন্মবার্ষিকী পালনের ৩ দিনের বর্ণাঢ্য নানান আয়োজন শুরু হয়েছে।

সরেজমিনে, মুরাদনগরের কোম্পানীগঞ্জ-নবীনগর সড়ক ধরে সামনে এগোলেই দৌলতপুর গ্রাম। এ গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়বে নজরুল তোরণ। তোরণের দুই পাশে ইট-সিমেন্টের তৈরি কালো রঙের টুকরো টুকরো বোর্ডে সাদা কালিতে লেখা কবির পঙ্ক্তিমালা। ওই পথ ধরে আধা কিলোমিটার এগোলেই খানবাড়ি। যে বাড়িকে কেন্দ্র করে নজরুলময় হয়ে ওঠেন ভক্তরা। ওই বাড়ি আর গ্রাম দীর্ঘদিন থেকে পরিচিত হয়ে ওঠে নজরুল-নার্গিসের গ্রাম হিসেবে। এখানে রয়েছে আলী আকবর খানের সুনিপুণ কারুকাজে শোভিত দ্বিতল বাড়ি। এ বাড়িতেই কবি ছিলেন। এ বাড়ির পলেস্তারা খসে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে হচ্ছে না সংস্কার। এ ভবনের পেছনে বাঁশঝাড় পার হলেই কবির বাসরঘর।

এলাকাবাসী জানান, ওই মঞ্চে বছরের অধিকাংশ সময় গরু চরে। শিশুরা হামাগুড়ি দেয়। নজরুল-নার্গিস শিল্পকলা একাডেমির সভাপতি নুরুল ইসলাম মাস্টার বলেন, ময়মনসিংহের ত্রিশালে কবির নামে অনেক কিছু হয়েছে। অথচ দৌলতপুরে এসেই কবি অগ্নিবীণা ও বিদ্রোহী কবিতা লেখার দীক্ষা পেয়েছেন। আর এখানে কিছুই হলো না কবি বা নার্গিসের নামে।

তিনি আরো বলেন, কবি এখানে দুই মাস ১১ দিন ছিলেন। এখানে তিনি যৌবনে প্রেম ও বিয়ে করেছেন। অনেক কবিতা ও গান রচনা করেছেন। দৌলতপুরে কবির নামে বড় ধরনের কোনো স্থাপনা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

কবিপত্নী নার্গিস বংশের উত্তরসূরি বাবলু আলী খান বলেন, এ বাড়ির পুকুর ঘাটের আমগাছ তলায় কবি দুপুরে শীতলপাটিতে বসে গান ও কবিতা লিখতেন। খানবাড়ির ছেলেমেয়েদের নাচ, গান ও বাদ্যযন্ত্র শেখাতেন। পুকুরের পানিতে সাঁতার কাটতেন। শখ করে পুকুরে জাল আর পলো দিয়ে মাছ শিকার করতেন। কবির ওই স্মৃতিচিহ্ন ধরে রাখার জন্য দৌলতপুরে বানানো হয়েছে নজরুল মঞ্চ। প্রতি বছর কবির জন্মদিনে সেখানে জেলা প্রশাসন ও মুরাদনগর উপজেলা প্রশাসন অনুষ্ঠান করে থাকে। এর বাইরে আর কিছুই এখানে হয়নি।

নজরুল গবেষক অধ্যাপক শ্যামা প্রসাদ বলেন, কবি নজরুলের নামে দৌলতপুরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় করার দাবিসহ আলী আকবর খানের সুনিপুণ কারুকাজে শোভিত দ্বিতল বাড়িটিকে জাদুঘর বানিয়ে কবিপত্মী নার্গিসের ব্যবহার করা কাঠের সিন্দুক ও বাসর খাটটি সংরক্ষণের দাবি জানাচ্ছি। বছরে একবার অনুষ্ঠানে এসে নানান প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে আর কেউ খবর নেয় না। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।

যেভাবে কবি মুরাদনগরে এলেন : কবি কলকাতায় আলী আকবর খানের কাছাকাছি থাকতেন। কবি নজরুলকে আলী আকবর খান তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা বাজার থানার দৌলতপুরে নিয়ে আসেন ১৯২১ সালে। বেড়াতে এসে আলী আকবর খানের বোনের মেয়ে সৈয়দা আসার খানমের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে গিয়েছিলেন কবি। গভীর ভালোবাসায় আচ্ছন্ন হয়ে ইরানি এক সাদা গুল্মপুষ্পের নামে কবি তার নাম দিলেন নার্গিস। দীর্ঘ দু’মাসের আবেগঘন প্রেমের পর নার্গিসের সঙ্গে পরিণয়ের রাতেই এক অভিমানে কবি তাকে ত্যাগ করে চলে যান। তবে কবির মানসলোকে নার্গিস ছিলেন দীর্ঘকাল।

১৯৩৭ সালে কলকাতার চিৎপুর থেকে কবি নার্গিসকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন, ‘তোমার ওপর আমি কোনো ‘জিঘাংসা’ পোষণ করি না এ আমি সকল অন্তর দিয়ে বলছি। আমার অন্তর্যামী জানেন তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কি গভীর ক্ষত, কি অসীম বেদনা! কিন্তু সে বেদনার আগুনে আমিই পুড়েছি তা দিয়ে তোমায় কোনোদিন দগ্ধ করতে চাইনি। তুমি এই আগুনের পরশ মানিক না দিলে আমি ‘অগ্নিবীণা’ বাজাতে পারতাম না। আমি ধুমকেতুর বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতাম না। তোমার যে কল্যাণ রূপ আমি আমার কিশোর বয়সে প্রথম দেখেছিলাম, যে রূপকে আমার জীবনের সর্বপ্রথম ভালোবাসার অঞ্জলি দিয়েছিলাম, সে রূপ আজও স্বর্গের পারিজাত-মন্দিরের মতো চির অম্লান হয়েই আছে আমার বক্ষে। অন্তরের সে আগুন- বাইরের সে ফুলহারকে স্পর্শ করতে পারেনি।’

মানবকণ্ঠ/এফএইচ