মুঘল আমলেই ঢাকা মসজিদের নগর

মুঘল শাসকদের সুবাদে সতেরো শতকে রাজধানী শহর হিসেবে ঢাকার গোড়াপত্তন। এর আগে কেমন ছিল ঢাকা, তার আঁচ পাওয়া যায় সুলতানি আমলের কিছু স্থাপনা থেকে। এর মধ্যে আছে দু-একটি মসজিদ। তবে মুঘল আমলেই ঢাকা মসজিদের নগরে পরিণত হয়। তার সাক্ষ্য বহন করে এখনো দাঁড়িয়ে আছে একাধিক মুঘল মসজিদ। কোনো কোনো মসজিদের ভবন এখনো অক্ষত, কোনোটার ভবন আমূল পাল্টে গেছে।

বিনত বিবির মসজিদ : ঢাকার প্রথম মসজিদের মর্যাদা পেয়েছে নারিন্দার বিনত বিবির মসজিদ। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ৮৬১ হিজরিতে (১৪৫৭ সালে)। তার মানে মসজিদটি সুলতানি আমলের।
এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক আহমদ হাসান দানী লিখেছেন, এটি সুলতানি আমলে নাসির উদ্দিন মাহমুদের রাজত্বকালে (১৪৩৫-১৪৫৯ সালে) নির্মিত হয়েছিল। নারিন্দা রোডের এই মসজিদ নির্মাণ করেন মারহামাতের মেয়ে মুসাম্মত বখত বিনত। তার নামেই মসজিদটির নাম হয়েছে বিনত বিবির মসজিদ। মসজিদের দুটো গম্বুজের একটির গায়ে আদি ভবন প্রতিষ্ঠার সাল লেখা আছে। আরেকটি গম্বুজের লেখা অনুযায়ী ভবনটি প্রথম সংস্কারের মুখ দেখে ১৩৩৭ বঙ্গাব্দে (১৯৩০ সালে)।
লালবাগ দুর্গ মসজিদ : লালবাগ কেল্লার ভেতরে থাকা লালবাগ দুর্গ মসজিদটি প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের তালিকায় থাকা একটি পুরাকীর্তি। মসজিদটি তার আদি অবয়ব ধরে রেখেছে।
ঐতিহাসিক ঢাকা মহানগরী: বিবর্তন ও সম্ভাবনা (সম্পাদনা ইফতিখার উল আউয়াল) গ্রন্থে সৈয়দ মাহমুদুল হাসান লিখেছেন, মসজিদটি ১৬৪৯ সালে নির্মিত হয়। খাঁজকাটা তিনটি গম্বুজ দাঁড়িয়ে আছে এর ছাদে। এর চার কোনায় রয়েছে চারটি মিনার। মসজিদের ভেতরে ঢোকার জন্য আছে খিলান দেয়া তিনটি দরজা। মসজিদের মেহরাবের ওপরে একটি ফারসি লিপি রয়েছে। আবার মেহরাবের ঠিক বিপরীতেও রয়েছে একটি লিপি।
কারতালাব খানের মসজিদ : বেগমবাজারে দাঁড়িয়ে আছে কারতালাব খান মসজিদ। এটি পাঁচ গম্বুজের দোতলা মসজিদ। এই মসজিদের নির্মাতা কারতালাব খান। সৈয়দ মাহমুদুল হাসানের বাংলাদেশের মসজিদ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, কারতালাব খানের প্রকৃত নাম মুহম্মদ হাদী। তিনি হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত হন। ১৭০০-১৭০৪ সালের মধ্যে নির্মিত হয়েছে কারতালাব খান মসজিদ। এই মসজিদ দেখতে হলে যেতে হবে ৬২, বেগমবাজার রোডে। মসজিদটি কিছুটা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। তাই নতুন ভবনের সিঁড়ি দিয়ে ওঠার পর মসজিদের আদি ভবনের মূল ফটকটি দেখা যায়। আদি ভবনের বাইরের দিকের দেয়ালে নতুন করে পলেস্তারা লাগানো হয়েছে। মসজিদের আদি ভবনের পাশে আছে একটি মাজার।
বায়তুল ইজ্জাত শাহী মসজিদ : উদু রোডের একটি অংশের নাম নন্দকুমার দত্ত রোড। এখানকার ৩ নম্বর হোল্ডিংয়ে রয়েছে একটি মসজিদ। এর নাম বায়তুল ইজ্জাত শাহী মসজিদ। এর দেয়ালে মসজিদের একটি পুরনো ছবি টাঙানো। এই ছবির একটি অনুলিপি জাতীয় জাদুঘরেও রক্ষিত আছে বলে জানান মসজিদ কমিটির একজন কর্মকর্তা।
উল্লেখ করা হয়েছে, ‘চকবাজার ও তš§ধ্যস্থিত কামান ও শায়েস্তা খার মসজিদ’। তার মানে, আগে এই মসজিদের নাম ছিল শায়েস্তা খানের মসজিদ। মসজিদে ঢোকার ফটকে একটি হাতে আঁকা মানচিত্র টাঙানো। তাতে মসজিদের পাশে একটি কূপ (ইদারা) চিহ্নিত করা হয়েছে।
এখন আর এটি নেই। মসজিদের দেয়ালের গায়ে থাকা একটি ফলক থেকে জানা যায়, এটি ১১৬৩ হিজরিতে (১৭৫০ সালে) প্রতিষ্ঠিত। ১৩১৫ হিজরিতে মসজিদটি ভূমিকম্পে ভেঙে যায়। ১৪০২ হিজরিতে (১৯৮২ সালে) মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করা হয়।
চকবাজার জামে মসজিদ : ঢাকার নায়েবে নাজিমরা চকবাজার জামে মসজিদে ঈদের নামাজ পড়তেন। তাওয়ারিখে ঢাকা গ্রন্থে এই বিবরণ দিয়েছেন মুন্শী রহমান আলী তায়েশ। ১৬৭৬ সালে শায়েস্তা খান মসজিদটি নির্মাণ করেন। এই মসজিদ এখন চকবাজার শাহী মসজিদ নামে পরিচিত। চক সার্কুলার রোডে এর অবস্থান। মসজিদটি একাধিকবার সম্প্রসারণ করা হয়েছে। তবে এই কাজের সময় আদি ভবন অক্ষত রাখা হয়েছে। এই মসজিদে এখন দুটি মিনার আছে। এর একটিতে রয়েছে সিরামিকের ভাঙা টুকরোর কারুকাজ। এটি আয়তনে ছোট। এর চেয়ে বড় মিনারটি লালরঙা। মসজিদের মূল ভবনের বাইরের দেয়ালে রয়েছে কালো রঙের একটি ফলক। স্থানীয় বাসিন্দা আমির হোসেন জানান, ফলকটি যে দেয়ালে রয়েছে সেটি আদি মসজিদের দেয়াল। আদি মসজিদের রূপ দেখতে হলে মসজিদের একেবারে ভেতরে ঢুকতে হবে।
হায়াত বেপারির মসজিদ : নারিন্দার ৭১ হƒষিকেশ দাস রোডে দাঁড়িয়ে আছে হায়াত বেপারির মসজিদ। মুনশী রহমান আলী তায়েশের তাওয়ারিখে ঢাকা গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৬৬৪ সালে এই মসজিদ নির্মাণ করেন হায়াত বেপারি। তিনি নারিন্দার পুলও তৈরি করেন।
এই মসজিদের জন্য তখনকার সুবেদার মসজিদের আশপাশে ১০০ বিঘা জমি দিয়েছিলেন। বর্তমানে হায়াত বেপারি মসজিদের আদি ভবন নেই। তিনতলা ভবনের নিচতলায় কিছু দোকান করা হয়েছে।
চুড়িহাট্টা মসজিদ : চকবাজারের কাছেই চুড়িহাট্টা। এখানকার ২৬, হায়দার বক্স লেনে একটি মসজিদের নির্মাণ কাজ চলছে। এখানেই ছিল ১৬৪৯ সালে নির্মিত চুড়িহাট্টা মসজিদ। বাংলাদেশের মসজিদ গ্রন্থে সৈয়দ মাহমুদুল হাসান লিখেছেন, সুবাদার শাহ সুজার কর্মচারী মুহম্মদ বেগ এই মসজিদ নির্মাণ করেন। চুড়িহাট্টা মসজিদের ভবন এখন নতুন রূপ লাভ করছে। মসজিদের দোতলার মেহরাবে আদি মসজিদের ফলকটি স্থাপন করা হয়েছে। আর নিচতলার মেহরাব ও মেঝে নতুন করে গ্রানাইট পাথরে ছেয়ে দেয়া হচ্ছে। মসজিদে একটি উঁচু মিনার তৈরির কাজও চলছে। এর আগের ভবনটি আদি ভবন নয় বলে জানান প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের পরিচালক (ঢাকা অঞ্চল) আবদুল খালেক। তিনি বলেন, পাকিস্তান আমলের কোনো এক সময় আদি ভবনটি ভাঙা হয়েছিল।
খান মুহাম্মদ মৃধার মসজিদ : ১২১, লালবাগ রোডে রয়েছে খান মুহাম্মদ মৃধার মসজিদ। এলাকাবাসী মসজিদটিকে ‘মৃধার মসজিদ’ বলেই চেনে। মুনশী রহমান আলী তায়েশের তাওয়ারিখে ঢাকা গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৭০৬ সালে মসজিদটি নির্মিত হয়। শহরের কাজী এবাদুল্লাহর নির্দেশে এটি নির্মাণ করেন খান মুহাম্মদ মৃধা। মসজিদের চারপাশে আছে আদি লাল ইটের প্রাচীর। ছোট্ট একটি ফোকর দিয়ে মসজিদের ভেতরে ঢুকতে হয়। দোতলা মসজিদটির নিচতলার ঘরগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে লালবাগ কেল্লার কর্মচারীদের থাকার ঘর হিসেবে।
মসজিদের দোতলার প্রধান ঘরটিতে নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। ঘরটির দেয়ালের ওপরের দিকে আছে কালো পাথরের একটি ফলক। দোতলায় আছে ইমামের থাকার ঘর। খাদেমদের থাকার জন্যও একটি ঘর রয়েছে। আর অতিথিদের থাকার জন্য একটি বিশ্রামঘর রয়েছে।
লালবাগ শাহী মসজিদ : লালবাগ শাহী মসজিদের অবস্থান শায়েস্তা খান রোডে। লোকমুখে এটি ‘লালবাগ বড় মসজিদ’ নামে পরিচিত। এই মসজিদ ১৭০৩ সালে তৈরি হয়।
এর সম্পর্কে কিংবদন্তির ঢাকা গ্রন্থে নাজির হোসেন লিখেছেন, এই মসজিদ মুঘল স্থাপত্যশৈলীর ছোঁয়া পায়নি। নকশায় সাদাসিধে হলেও আকারে ছিল বড়। তখন এই মসজিদের ভেতরের তিনটি কাতারে একসঙ্গে দেড় হাজার লোক নামাজ পড়তেন। ১৭১৭ সালে মুর্শিদ কুলি খান মসজিদের জন্য কিছু জমি দেন। তিনি মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য মাসে ২২ টাকা সাহায্য দেয়ার ব্যবস্থা করেন। ১৮৭০ সালে নওয়াব আবদুল গনির অর্থায়নে লালবাগ শাহী মসজিদের ছাদ পাকা করা হয়। লালবাগ শাহী মসজিদ পরিচালনা কমিটির কাছ থেকে জানা যায়, ১৯৭২-১৯৭৫ সালের মধ্যে মসজিদের চারপাশের আদি দেয়ালগুলো অক্ষত রেখে এটি নতুন করে নির্মাণ করা হয়। সে সময় মসজিদের নতুন মেহরাব নির্মিত হয়। মেহরাবের নকশা লালবাগ কেল্লার সুড়ঙ্গপথের একটি কারুকাজ থেকে নেয়া হয়েছিল। নাজির হোসেন লিখেছেন, এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকার সময় মসজিদটি আরেক দফা সংস্কার ও সম্প্রসারণের কাজ করা হয়। তখন মসজিদের বর্তমান স্থাপনার থামগুলোর ওপরে সুদৃশ্য কারুকাজ করা হয়।
সূত্র ও ছবি: ব্লগ এবং ইন্টারনেট – নগরে নাগরিক ডেস্ক