মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে আরসার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ

সংগঠনটির কাউকে কোনোদিন দেখেননি রোহিঙ্গারা

রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নজিরবিহীন গণহত্যা ও নির্যাতনে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা মনে করে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) কারণেই তাদের এই দুর্দশা। রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়কারী সংগঠন হিসেবে আরসা নিজেদের দাবি করলেও খোদ এ জনগোষ্ঠীরই কেউ কোনো দিন দেখেননি তাদের। আরসা নামের সংগঠনটি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সৃষ্টি এবং তাদের হাতিয়ার হিসেবেই কাজ করছে বলে মনে করে রোহিঙ্গারা। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও মনে করছেন রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের উৎখাত করতেই আরসার গেইম খেলছে মিয়ানমার।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুর রশিদ জানান, আরসা নিয়ে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। সংগঠনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তারা যেভাবে বলছে আসলে সেই পরিমাণ জনবল বা অস্ত্র তাদের আছে বলে মনে হয় না। মিয়ানমার সরকার আরসা বিষয়ে কী ভাবছে সেটি আমাদের জানা নেই।

বাংলাদেশ সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, আরসা মিয়ানমারের সৃষ্টি। তাই এ ব্যাপারে তারাই ভালো বলতে পারবে। আরসার কর্মকাণ্ড নিয়ে আমাদের কিছু জানায়নি তারা। রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের উৎখাত করার পরিকল্পনা তারা ১৯৭৮ সাল থেকে করে আসছে। এবার একটি অজুহাত তুলে সেই কাজটি তারা করেছে। আমরা দ্বিপাক্ষিকভাবে এবং আন্তর্জাতিক সহায়তায় সমস্যাটির সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছি।

আরসার সৃষ্টি নিয়ে সাবেক এক রাষ্ট্রদূত জানান, রোহিঙ্গাদের বিষয়ে কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের পরদিনই সেনা চৌকিতে আরসার হামলার বিষয়ে মিয়ানমারের অভিযোগ রহস্যজনক। এই আরসার কোনো অফিস খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারা রোহিঙ্গাদের কোনো স্বার্থ রক্ষা করেছে এমন প্রমাণও নেই। তবে তারা মিয়ানমারের স্বার্থ রক্ষা করছে সেটি স্পষ্ট।

যুদ্ধ ও সংঘর্ষ নিরসন ও প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী কাজ করা গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ আরসা নিয়ে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) ও আরসার যোগসাজশে ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের ছেড়ে দেয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এমন তথ্য প্রকাশের পর অনেকেই মনে করেন, মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে আরসার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতারা দাবি করেছেন, ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর এবং ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইনে পুলিশ চৌকিতে আরসার হামলার যে দাবি করা হয়, তা রোহিঙ্গাদের জন্য বড় বিপদ বয়ে এনেছে। আরসা রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ের কথা বললেও মূলত এটি মিয়ানমার সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। কারণ, যখনই রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে সমঝোতার দিকে যায়, ঠিক তখনই আরসার হামলার ঘটনা ঘটে। আর এ হামলার অজুহাত দেখিয়ে সমঝোতার পথে বাধা সৃষ্টি করা হয়। রোহিঙ্গাদের প্রশ্ন, রাখাইনে পুলিশ চৌকিতে আদৌ কি আরসা হামলা করেছিল?

কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আবু ছিদ্দিক সাংবাদিকদের জানান, রাখাইনে আরসা নামে কোনো সংগঠন নেই। আরসা আছে বলে আমরা বিশ্বাস করি না। এটি মিয়ানমার সরকারের সৃষ্টি। রাখাইনে বসবাসরত মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বিতাড়িত করার ষড়যন্ত্রের অংশ। আমরা আমাদের দেশে ফিরে যেতে চাই।

উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুর জানান, গত বছরের ২৪ আগস্ট রাতে সেনা চৌকিতে আরসার হামলা কথা বলা হলেও এটি সাজানো নাটক। কারণ, আনান কমিশনের রিপোর্ট দেয়ার একদিন পর হামলা এবং সর্বশেষ আগামী ১৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ-মিয়ানমারের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে রোহিঙ্গাদের তালিকা হস্তান্তরের আগেও হামলার দাবি করেছে মিয়ানমার সরকার। বিষয়টি আমাদের রোহিঙ্গাদের ভাবিয়ে তুলেছে। রাখাইনে আরসা নামে কোনো সংগঠন নেই। এটি মিয়ানমার সরকারের সাজানো নাটক। মিয়ানমার সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চোখে বার বার ধুলো দিচ্ছে। মূলত আরসা মিয়ানমারের সৃষ্টি। আরসা নামের কোনো সংগঠন রাখাইনে আছে বলে মনে হয় না।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর রাখাইনে পুলিশ পোস্টে হামলার পর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানে ৮৭ হাজার ৯০০ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমার সরকারের এই বর্বর নির্যাতনের নিন্দা জানায় এবং অং সান সুচির নির্দেশে গঠন করা কফি আনান কমিশন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট দেয়ার এক দিনের মাথায় গত বছরের ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইনে পুলিশ চৌকিতে আবারো হামলার অভিযোগ তোলে মিয়ানমার সরকার। পরে রাখাইনে তল্লাশির নামে রোহিঙ্গাদের ওপর নেমে আসে নৃশংস নির্যাতন। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও ব্যাপক নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু। এর আগেও বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেয় প্রায় সাড়ে ৫ লাখ রোহিঙ্গা। নতুন-পুরনো মিলিয়ে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন ১২ লাখের ওপরে। এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে দিতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই উদ্যোগকে বানচাল করতে কয়েক দিন আগে আবারো আরসার হামলার অভিযোগ তুলেছে মিয়ানমার সরকার।

মানবকণ্ঠ/এসএস