মিয়ানমারের একগুঁয়েমি ও মিথ্যাচার

গত সপ্তাহে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুতে উন্মুক্ত বিতর্কের আগের দিন জাতিসংঘ তথ্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ায় নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের ওপর তা এক ধরনের ‘বিবেকি দায়’ চাপিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের শুভেচ্ছা দূত অভিনেত্রী কেইট ব্লানচেট আবেগঘন বক্তব্য রাখেন। রোহিঙ্গা সংকট অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না মর্মে উল্লেখ করেন জাতিসংঘ মহাসচিব। জাতিসংঘের শুভেচ্ছা দূত কেইট ব্লানচেট বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনকালে তার বেদনাময় অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের সামনে।

তিনি বলেন, শরণার্থীরা মিয়ানমারকেই তাদের ঘর মনে করে তবে তাদের মধ্যে গভীর ভীতি কাজ করছে। জাতিসংঘ মহাসচিব নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদা এবং যথার্থ টেকসই প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ এখনো নিশ্চিত হয়নি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডাসহ নানা সদস্য রাষ্ট্র মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির কথা বলেছে। কিন্তু এর সুস্পষ্ট বিরোধিতা করেছে দুই ‘ভেটো’ অধিকারী দেশ চীন ও রাশিয়া।

ফলে নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়নি। চীন রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসার কথা বলেছে। চীন মিয়ানমারের ওপর কোনো প্রকার চাপ কিংবা অবরোধ আরোপের পক্ষপাতী নয়; রাশিয়াও নিরাপত্তা পরিষদের আলোচনায় চীনকে সমর্থন করেছে। তারা এই সংকটকে গভীর ও জটিল বলেছে।

বিশ্ব সম্প্রদায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করেছে মিয়ানমারকে। জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক আন্তর্জাতিক তথ্যানুসন্ধান মিশন তাদের প্রতিবেদনে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতাকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। গত ২৭ আগস্ট প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করার অভিযোগে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংসহ ৬ জেনারেলের বিচারের সুপারিশ করা হয়েছে। জাতিসংঘের এই রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেনাপ্রধানসহ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে নিষিদ্ধ করেছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ। মানবাধিকার লঙ্ঘন, ‘ঘৃণামূলক বক্তব্য ও ভুয়া তথ্য’ ছড়ানোর অভিযোগ করেছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ। জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন-নৃশংসতা বন্ধে সেনাবাহিনীর রাশ টানতে ব্যর্থ হওয়ায় মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচির সমালোচনা করা হয়েছে।

জাতিসংঘ তথ্যানুসন্ধানী দলকে মিয়ানমার সরকার রাখাইনে যেতে দেয়নি, তারা জাতিসংঘ ত্রাণ ও পুনর্বাসন টিম, মানবাধিকার সংগঠনের কর্মী, সাংবাদিকদের রাখাইনে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে বিশ্বের সামনে উন্মোচিত হওয়ার আশঙ্কায় তারা রাখাইনকে ‘নিষিদ্ধ এলাকা’ ঘোষণা করেছে কিন্তু বর্তমান বিশ্ব তথ্য প্রবাহের নির্বাধ সময়ে তা কি করে সম্ভব! মিয়ানমারের এই রোহিঙ্গা নির্মূল অভিযান চূড়ান্ত রূপ পায় গত বছরের আগস্টের মাঝামাঝি থেকে। এর আগে ২০১৬ সালে তাদের এই পরিকল্পিত অভিযান শুরু হয়। ওই সময়ে প্রায় ৯০ হাজার এবং ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

জাতিসংঘকে যদি বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বমূলক সংগঠন এবং বিশ্বশান্তি ও সভ্যতার অভিভাবক হিসেবে বিবেচনা করি তাহলে বলা যায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘ ও এর সহযোগী সংগঠনসমূহ ‘বিপন্ন মানবতা’কে রক্ষা করতে ‘ত্রাতার’ ভূমিকা পালন করছে। সভ্যতা ও মানবতাকে সুরক্ষা দিতে আজ বিশ্ব সম্প্রদায়কে ভূমিকা পালন করা ছাড়া বিকল্প নেই। রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সমস্যা কেন হবে? বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা আশ্রয় নিয়েছে এবং আমাদের দেশটির ওপর এই সমস্যার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ পড়েছে, এ জন্যেই বাংলাদেশ তাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চায়। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের অধিবাসী এবং তাদের ওপর নির্যাতন, নৃশংসতা চালিয়ে মিয়ানমার তাদের স্বদেশভূমি থেকে বিতাড়ন করছে এবং এটি তাদের রাজনৈতিক, উগ্র, আগ্রাসী সাম্প্রদায়িক অভিযানের অংশ। এখনো যেসব রোহিঙ্গা মিয়ানমারে বাস করছেন তাদের অবরুদ্ধ জীবন যাপন করতে হচ্ছে।

মিয়ানমার সরকারের দীর্ঘদিনের জাতিগত বিভাজনের নির্মম শিকার এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। এটি মিয়ানমারের নিজস্ব সমস্যা, এখানে বাংলাদেশের কোনো দায় তো নেই। চীন এবং রাশিয়া-একদার সমাজতান্ত্রিক দর্শনের এই দুটি দেশ মিয়ানমারের জাতিবিধ্বংসী ভূমিকা জেনেও চুপ করে আছে। জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকারের নীতির পরিপ্রেক্ষিতে তাদের ভূমিকা মোটেও সমর্থনযোগ্য নয়। শুধু চীন-রাশিয়া নয়, ভারত-জাপানের মতো গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার দেশও রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিশ্চুপ রয়েছে।

এশিয়ার দেশগুলো এশীয় সমাজের মানবিক ও অহিংস বৈশিষ্ট্যের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে কেন? তাহলে সভ্যতা কি ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ আর ধর্ম-সম্প্রদায়গত বিভাজনের কাছে পদানত থাকবে? রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার কয়েক মাস আগে চুক্তি করেছে, গত বছরের নভেম্বরে কিন্তু প্রত্যাবাসন এখনো শুরু হয়নি। জাতিসংঘ কনভেনশন অনুসারে শরণার্থী প্রত্যাবাসন এবং তাদের নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। বাংলাদেশের প্রতিনিধি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের উন্মুক্ত অধিবেশনে বলেছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, মর্যাদা ও স্বেচ্ছা অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে।

মিয়ানমার এখনো জাতিসংঘসহ মানবাধিকার সংস্থাকে রাখাইনে ঢুকতে দিচ্ছে না। জাতিসংঘের তথ্য অনুসন্ধানী কমিশন তাদের প্রতিবেদনে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের যে তথ্য দিয়েছে তাতে মিয়ানমারের জাতিবিরোধী ভূমিকা স্পষ্ট হয়েছে। যারা মিয়ানমারের এই জাতিবিরোধী ভূমিকা সমর্থন করছেন তারা কি বিশ্বসভ্যতা ও মানবতার অবমাননায় কোনো পীড়া অনুভব করছেন না? সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হবে, এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে তার সকল কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করে রোহিঙ্গা সমস্যা বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরতে হবে। এই ইস্যুতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য এখানে যে, সংকট শুরুর এক বছরের মধ্যেই বিশ্ব সম্প্রদায় মিয়ানমারকে ‘জাতিগত নির্মূল’ অভিযানের দায়ে অভিযুক্ত করেছে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে মানবিক ভূমিকা নিয়েছে তার প্রশংসা উচ্চারিত হয়েছে বিশ্বের গণমাধ্যমে, নিরাপত্তা পরিষদের সভায় বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের ভাষণে।

বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং সহযোগিতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয় তবে বাংলাদেশ চায়, যে সামাজিক অনিরাপত্তা, উগ্র জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় প্রচারণা এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভয়াবহ নৃশংসতা ও দমনীতির শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত হতে বাধ্য হয়েছে, সেই সব পরিস্থিতির অবসান হোক। এক্ষেত্রে বিশ্ব সম্প্রদায়ের ভূমিকা আশা করে বাংলাদেশ। নিরাপত্তা পরিষদে জাতিসংঘ মহাসচিবের সাম্প্রতিক ভাষণেও তার স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে, আর এটি জাতিসংঘের শরণার্থী প্রত্যাবাসন নীতির সঙ্গে সর্বাংশে সংগতিপূর্ণ। অর্থাৎ প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করেই। কফি আনান কমিশনের সুপারিশসমূহের পূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান, এর দায়িত্ব মিয়ানমার সরকারের।

রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন কিংবা তাদের দেশ ত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা গত ৫ দশক ধরেই ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। বাংলাদেশে এর আগে থেকেই ৪ লাখের মতো রোহিঙ্গা অনেকটা স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হবে ১২ লাখের মতো; আরো কয়েক লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে পাকিস্তান, সৌদি আরব, ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ নানা দেশে। রাখাইন, পূর্বে যে প্রদেশটির নাম ছিল আরাকান সেখানে রোহিঙ্গারাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়, এখন মিয়ানমার সরকারের ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ এর ফলে রোহিঙ্গারা নিজ ভূমে ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু এবং ‘পরবাসী’ সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে। এভাবে দেখা যাচ্ছে, মিয়ানমার ইতিহাসকে অস্বীকার করে মানব সভ্যতার বিবর্তন ও গতিপথকেই অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলেছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সাবেক হাই কমিশনার জেইদ আল হুসেইন ২০১৭ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতাকে ‘জাতিগত নিধনের পাঠ্যপুস্তকীয় দৃষ্টান্ত’ হিসেবে উল্লেখ করেন। জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধানী মিশন বলেছে মিয়ানমার জেনারেলদের উদ্দেশ্য ছিল গণহত্যা। শুধু রাখাইন নয়, কাচিন আর সান রাজ্যেও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংসতা আর নির্যাতনের বিষয় এ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশন মিয়ানমারে সংঘটিত অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে সুপারিশ করতে নিরাপত্তা পরিষদের পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে অভিমত প্রকাশ করে। তথ্যানুসন্ধানী মিশন নাগরিকত্বসহ সামগ্রিক মানবাধিকার সুরক্ষা এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছায় আর মর্যাদায় শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন এবং অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুতদের ফেরাতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিশ্চিত করতে সুপারিশ করেছে।

রোহিঙ্গা সমস্যা মিয়ানমারের আভ্যন্তরীণ সামাজিক-রাজনৈতিক সংকট থেকে সৃষ্টি হলেও তা এখন একটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ কারণে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আঞ্চলিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে আনান কমিশনের রিপোর্ট অনুসারে এই সমস্যার সমাধান মিয়ানমার সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরিয়ে নিয়ে তাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলো অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বোঝা বহনে বাধ্য নয়।

উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা সমস্যা মিয়ানমারের বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বিশেষত, উন্নয়নকামী ও বিনিয়োগ প্রত্যাশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করতে হলে রোহিঙ্গা ইস্যুর গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ সমাধান হওয়া জরুরি। – লেখক: কলাম লেখক

মানবকণ্ঠ/এএএম