মা ও মাতৃভূমি স্বর্গ হতে শ্রেষ্ঠ

আগে জানলে জীবনে একবার তোমার মতো নিরহংকার নির্লোভী জননীর বুকে মাথা রেখে, স্পর্শ করে নিজের অন্তরাত্মা শুদ্ধ করে নিতাম। যখন চলে গেলে তখন বুঝতে পারলাম আমরা কী হারালাম। আমরা তো একটা সন্তান জন্ম দিয়ে মা হই আর মায়ের উপাধি পাই। তুমি তো এই দেশের সমগ্র সন্তানের জননী। তুমি আমাদের কাছে মাতৃভূমির মতো

টুম্পা ভট্টাচার্য্য
‘মা’ শব্দের সার্থকতা শুধুই সন্তানের জন্ম দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেটা আবারো প্রমাণ পেলাম জননী সাহসিকা রমা চৌধুরীর জীবন কাহিনী জেনে। দুর্ভাগ্য বড্ড দেরিতে জানলাম। আগে জানলে জীবনে একবার তোমার মতো নিরহংকার নির্লোভী জননীর বুকে মাথা রেখে, স্পর্শ করে নিজের অন্তরাত্মা শুদ্ধ করে নিতাম। যখন চলে গেলে তখন বুঝতে পারলাম আমরা কী হারালাম। আমরা তো একটা সন্তান জন্ম দিয়ে মা হই আর মায়ের উপাধি পাই। তুমি তো এই দেশের সমগ্র সন্তানের জননী। তুমি আমাদের কাছে মাতৃভূমির মতো। তোমার মতো মানুষ ছিল বলেই হয়তো পৃথিবীটা টিকে আছে। আমরা মেয়েরা সামান্য হারালে, আঘাত পেলে মৃত্যুকে চোখে দেখি। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চাই বার বার। হয়তো দুর্বল চিত্ত বিধায়। কিন্তু তুমি সে রকম একজন নারী যে সর্বহারা হয়েও সংগ্রামের মধ্যে কাজ করে টিকিয়ে রেখেছিলে নিজেকে তেজদীপ্ততার সঙ্গে। কী হারাও নাই! স্বামী, পরিবার,সম্ভ্রম সবকিছুই। এমনকি দুধের শিশুটিও। এরপরও নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলে দেশ ও দেশের সন্তানদের জন্য।
নিবেদিত প্রাণে অসহায় ছেলেমেয়েদের জন্য করেছ এতিমখানা, দাঁড়িয়েছিলে তাদের পাশে। দিয়েছো মাতৃস্নেহ। কী ছিল তোমার? শুধু সৎ ইচ্ছা আর সাহস, এই নিয়ে তুমি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছিলে। সমাজে অনেক রূঢ় বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েও পিছিয়ে পড়নি একবারো। হয়তো তোমার সততার জন্যই সন্তানতুল্য কোনো সৎ ব্যক্তি তোমার পাশে ছিল।
এমন পরিস্থিতি জেনে আজ শক্তির সঞ্চার হলো প্রাণে। সততা মানবতা বলে সত্যিই কিছু আছে। আর তার জন্য হয়তো মানুষ বাঁচার স্বপ্ন দেখে। মানবতার কাছে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র সবই তুচ্ছ।
রমা চৌধুরী তেমনই একজন নারী যিনি কলমকে করেছিলেন চলার সাথী। নিজের প্রকাশিত বই বিক্রি করে তিনি চলতেন। কখনো নেননি তার বাড়তি মূল্য।
যেই সন্তানরা মাটিতে মিশেছে তাদের মর্যাদা দিতে বাকি জীবন কাটিয়েছিলেন নগ্ন পায়ে। এই স্বার্থপর নিষ্ঠুর সমাজ থেকে কতটা মূল্যায়ন পেয়েছ জানি না। হয়তো পাওনি। তবুও তুমি হাজার নারীর প্রাণের সঞ্চার করে গেলে। মুক্তিযুদ্ধ আমি দেখিনি। মা-বাবার মুখে ও পাঠ্যপুস্তক থেকে মুক্তিযুদ্ধকে জেনেছি। কষ্ট হচ্ছে শুধু এই বুঝে, তুমি জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে বেঁচে থেকেও অনেকে তোমাকে জানতে পারেনি।
কীভাবে তোমাকে বীরাঙ্গনা বলব! তুমি যে মা গঙ্গার মতো পবিত্র। আবর্জনাতে জন্ম নিলেও তুলসী যেমন পূজনীয় তেমনি কোনো অসম্মান তোমাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তুমিও যে সম্মান ও শ্রদ্ধার মানসপটে পূজনীয়। মৃত্যুর মতো যমদূতও তোমার সাহস শক্তির কাছে পরাজিত হয়েছে। অনেক সুযোগ পেয়েও চাওনি কিছুই নিজের জন্য। শুধু নিরলস শ্রম দিয়ে গেছ। আজ হয়তো এ প্রজন্মের অনেকে তোমাকে চিনত না কিন্তু তোমার মৃত্যুও যে জন্মের মতো আবার জানিয়ে গেল চিনিয়ে গেল কে এই মহীয়সী রমা চৌধুরী। তুমি আমাদের কাছে অমর, অম্লান। আজ যতই কষ্ট, যতই দুর্ভাগ্য ঘিরে আসুক না কেন তোমার জীবনী আমাদের নারী জাতিকে বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগাবে। তোমাকে নিয়ে লেখার কী সাধ্য আমার? আমি যে নগণ্য শিশু তোমার। তবুও অন্তরাত্মা থেকে স্যালুট জানায় ‘মা’। বেঁচে থাকো উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো নারী জাতি ও দেশের বুকে।