মায়াবীনি ঝরনাটিলা

অরণ্যের গভীরে যত প্রবেশ করা হবে, নদীর গভীরতা ততই বাড়বে। শেষমেশ পরিস্থিতি এমন দাঁড়াবে-হেঁটে আর এগোনোর উপায়ই থাকবে না। অতঃপর ভাসতে থাকা একটি গাছের গুঁড়ির উপর চড়ে বসে লম্বা একটি বাঁশকে বৈঠা বানিয়ে প্রবেশ করায় শ্রেয় অর্ধেক চাঁদ আকারের সে মঞ্চের ভেতর।
বহু উপরে উপত্যকার ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ছ’টি পাথর যেন ছ’টি ভাই। অর্ধচন্দ্রাকৃতি এই মঞ্চটি যেন একটি গ্রিক কলোসাম।
ভেতরে ঢুকে একপাশে বালির চর দেখা যাবে। এটাই হলো পানছড়ির ঝরনাটিলা।
জলে নামতেই অদ্ভুত একটা ব্যাপার। উপরের প্রাচীন গাছগুলোর ডালে হৈচৈ করতে থাকা পাখিগুলো হঠাৎ নীরব হয়ে গেল, ছ’টি পাথর যেন একই সঙ্গে নড়ে উঠল আলতো ভাবে। স্বচ্ছ জলে ডুব দিতেই আমি মুখোমুখি হয়ে গেলাম পাথরদলের সপ্তম ভাইটির, উšে§াচিত হলো অভূতপূর্ব এক রহস্যের স্বরূপ। ছ’টি পাথরের ঠিক মাঝখানটায় যেখান থেকে ঝরনা বেরিয়ে এসেছে, ঠিক সেখানটাতেই ছিল তাদের সাত নম্বর ভাইটি। উপত্যকার শেষ মাথায় এসে ছয় ভাই যথাসময়ে ব্রেক কষে ফেললেও তাদের সবচেয়ে দুরন্ত ছোটভাইটি থামতে পারেনি। অনেক নিচের অতল গহ্বরে তার সলিল সমাধি হয়ে গেছে বহুদিন হলো। আর তারপর বাকি ছ’ভাই আর ফিরে যায়নি, হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেখানটাতেই, উপত্যকার কিনারায়…
পেছনের পাহাড় তাদের ডাকে, ফেরার জন্য। কিন্তু আদরের ছোট ভাইটিকে ফেলে তারা যায় কীভাবে! দুরন্ত সময়কে খুব গভীরে বন্দি করে তারা স্থির হয়ে আছে, যদি কখনো তাদের ছোট ভাইটি ফিরে আসে! মৌন পাহাড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে, একবার গেলে না ফেরার দেশ থেকে কেউ কি ফিরেছে কখনো! একবার গেলে সেখান থেকে ফেরার আর কোনো উপায় কি অবশিষ্ট থাকে!!
যেভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে যেতে হলে ঈগল/শান্তি অথবা শ্যামলী পরিবহনের (কলাবাগান বাসস্টপ) খাগড়াছড়িগামী বাসে চড়ে বসুন। খাগড়াছড়িতে নেমে লোকাল বাস অথবা সিএনজিচালিত ট্যাক্সিতে চড়ে যেতে হবে পানছড়ি বাজারে।
পানছড়ি বাজার হতে চাঁদের গাড়িতে চড়ে বসলে সেটিই আপনাকে পৌঁছে দেবে ঝরনাটিলা সংলগ্ন বিজিবি চেকপোস্টে। সেখানে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সরবরাহ করে অতঃপর হেঁটেই রওনা দিতে হবে ঝরনাটিলা ঝরনার দিকে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে বিজিবি সদ্যসরা আপনাকে আঁটকে দিতে পারে। যে কারণে উত্তম হবে যাওয়ার আগে সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে নিলে। চেকপোস্টের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে আপনাকে আরো দুই কিলোমিটারের মতো হাঁটতে হবে, পাড়ি দিতে হবে দু’দুটো পাহাড়। স্থানীয়দের মতে এ পাহাড়ে বিশাল আকৃতির একটি অজগর বাস করে, তথ্যর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত নই। তবে সতর্কতা অবলম্বন করাই শ্রেয়। হঠাৎ করে একটি অজগরের সামনে পড়ে গিয়ে কি করি, কি করি করার চেয়ে আগেভাগে চিন্তা-ভাবনা করে নেয়া ভালো না! দ্বিতীয় পাহাড়টি শেষ হলে সরু একটি খালের সন্ধান পাবেন, যেটি ধরে সোজা এগিয়ে গেলে দেখা পাবেন ঝরনাটিলার। বিজিবি চেকপোস্ট থেকে শুরু করে বাকি পথটি বেশ দুর্গমই। সব মিলিয়ে খুব কম মানুষই সে পথ অতিক্রম করার সামর্থ্য রাখেন। অতএব ঝরনাটিলা যেতে চাইলে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে তবেই রওনা হোন।
যেখানে থাকতে পারেন : পানছড়িতে থাকার জন্য সেরকম মানের খুব বেশি হোটেল/মোটেল নেই। পানছড়ি বাজারে শুকতারা বোর্ডিংয়ে কাজ চালিয়ে নিতে পারেন। দৈনিক গুনতে হবে একশ’ টাকা।
আরো যা কিছু : অজগর সাপের ব্যাপারে একটু ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে, তবে একটা ব্যাপার নিশ্চিত করে বলতে পারিÑপানছড়ি বাজার থেকে ঝরনাটিলা যাওয়ার পথে আপনি একবার ডুববেনই…না নদী নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা বলছি। যাওয়ার পথে অজস্র বন, জংলি ফুল, পাহাড়ি পথ আপনার চোখে পড়বে। চাইলে পথের ধারের আদিবাসী চা দোকানিটির আতিথেয়তায় খেয়ে নিতে পারেন পাহাড়ি কলা আর চা। আর পাহাড় তো আছেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য এলাকার মতো খাগড়াছড়িতেও আপনার চোখে পড়বে অজস্র পাহাড় আর টিলা। তবে এতগুলো নিরেট পাহাড় মিলেও কিন্তু থামাতে পারেনি চেঙ্গি নদীর প্রবাহকে। স্নিগ্ধ আর স্বচ্ছ জলের চেঙ্গি নদী পুরো খাগড়াছড়ির এ মাথা থেকে শেষ পর্যন্ত ছুঁয়ে গেছে নিবিড়ভাবে। পাহাড়গুলো যতই দৃঢ়ভাবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, নদী ততই তার নমনীয়তা আর তারল্যগুণে এগিয়ে গেছে, খুঁজে নিয়েছে নিজস্ব পথ। বলা হয় শিক্ষা গ্রহণের জন্য প্রকৃতিই সর্বোত্তম স্থান।
সাদিয়া আফরিন লোপা