মার্কেটিং পেশায় চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ

আহমেদ ইফতেখার সানি

একটি কোম্পানিকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে মার্কেটিংয়ের কোনো বিকল্প নেই। যে কোম্পানির মার্কেটিং ডিপার্টমেন্ট যত গতিসম্পন্ন ও সফল সে কোম্পানি ততটুকু প্রতিষ্ঠিত। তাই মার্কেটিংকে গুরুত্ব দেয়া হয় বেশি। আর মার্কেটিংয়ের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের সব সময় চ্যালেঞ্জ নিয়েই কাজ করতে হয়। আজকের ফিচারে থাকছে মার্কেটিং পেশায় চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা। কথা বলেছেন, টিপস ও গাইড লাইন দিয়েছেন অপোর মার্কেটিং অপারেশন বিভাগের প্রধান আহমেদ ইফতেখার সানি। তার এয়ারটেল বাংলাদেশের কর্পোরেট রিলেশনশীপ অফিসার, বাংলালিংক কাস্টমার কেয়ার সেন্টারের কাস্টমার সার্ভিস অফিসার, জেটিসি গ্রুপ অ্যান্ড কোম্পানিজের ম্যানেজার কর্পোরেট অ্যান্ড সেলস হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। লিখেছেন- নাজমুল হক ইমন

প্রতিদিন বাজারে আসছে নতুন নতুন বাহারি পণ্য। আসছে দেশি ও বিদেশি কোম্পানি। সময়ের চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তৈরি হচ্ছে হরেক রকম পণ্য যা বাজারজাত করতে দরকার ক্রেতা আকৃষ্ট করার মতো উদ্যমী, মেধাবী, চৌকস, স্মার্ট, বিপণন কাজে আগ্রহী পরিশ্রমী কর্মী। মার্কেটিং পেশায় নিজেকে উপস্থাপন করতে হয় একটু ভিন্ন আঙ্গিকে। ক্রেতা আকৃষ্ট করার চিন্তা মাথায় রাখতে হয় সবসময়। পাশাপাশি ক্রেতার বিশ্বাস এবং আস্থাভাজন হওয়া এই পেশার অন্যতম মৌলিক চাহিদা। ক্রেতার পরিতৃপ্তির মধ্যেই এ পেশার আনন্দ। মার্কেটিং কাজটি করতে হয় একটি মার্কেটিং প্ল্যানের মাধ্যমে, যা শুরু হয় একটি লক্ষ্যস্থির করে। পরে কোম্পানির প্রয়োজন হয় কীভাবে এ লক্ষ্য অর্জিত হবে তা নির্ধারণ করা বা মার্কেটিং কৌশল নির্ধারণ করা।

আজকাল সব প্রতিষ্ঠানেই চৌকস, মেধাবী, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বিপণন নির্বাহী বা মার্কেটিং কর্মকর্তা দরকার। পণ্যের পাশাপাশি সেবাও আজকাল মার্কেটিংয়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা থেকে শুরু করে বিমানের যাত্রী সেবা, সেলুন ও বিউটি পার্লারের সেবা- সবই মার্কেটিং করতে হয়। তাছাড়া যুগটা অর্থনীতির, একইসঙ্গে বিশ্বায়নের। চলমান সময় সবকিছুই পণ্য, এমনকি মানবিক সেবাও। তৈরি হচ্ছে নতুন ভোগ্যপণ্য, আবির্ভাব হচ্ছে সেবা পণ্যের। সুতরাং ভবিষ্যতে মার্কেটিংয়েই সর্বাধিকসংখ্যক লোক কাজ করবে যা বর্তমানেও করছে। মার্কেটিং পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পদ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ, ব্র্যান্ড ম্যানেজার, প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার, অ্যাডভার্টাইজিং ম্যানেজার, মিডিয়া ডিরেক্টর, মিডিয়া বায়ার, মার্কেটিং অ্যানালিস্ট, মার্কেটিং রিসার্চ ম্যানেজার, মার্কেটিং ডেভেলপমেন্ট অফিসার ইত্যাদি।

আহমেদ ইফতেখার সানিএ পেশায় আসতে হলে শিক্ষাগত যোগ্যতা কোম্পানিভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়। কেউ হয়তো এমবিএ ডিগ্রিধারী প্রার্থী চায়, কেউ হয়তো বিবিএ ডিগ্রিধারীতেই সন্তুষ্ট। তবে শিক্ষাগত যোগ্যতা যাই চাওয়া হোক না কেন, অভিজ্ঞদের সবসময়ই অগ্রাধিকার দেয়া হয়। পাশাপাশি একজন মার্কেটিং কর্মকর্তাকে কিছু আবশ্যক গুণাবলীর অধিকারী হতে হয়। যেমন- সততা, নিয়মানুবর্তিতা, সহজ ও নিখুঁত বাচন ও অঙ্গভঙ্গী, পরিপাটি পোশাক-পরিচ্ছদ, সৃজনশীল, সুক্ষ বিশ্লেষণী ক্ষমতা, স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি, পরমতসহিষ্ণুতা, উন্নত যোগাযোগ দক্ষতা প্রভৃতি। মার্কেটিং পেশার বেতন কাঠামো পদভেদে ১০ হাজার থেকে লক্ষাধিক টাকা পর্যন্ত রয়েছে।

দেশে মার্কেটিং পেশাটি একইসঙ্গে জনপ্রিয়, সম্ভাবনাময় ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। চুল কাটানোর সেলুন থেকে হাসপাতালসহ অধিকাংশ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেই মার্কেটিং পেশাজীবীদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাই এ ব্যাপারে আপনার কিছু দক্ষতা অর্জন করতে হবে। সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন, তা হলো আপনাকে অবশ্যই স্মার্ট হতে হবে, ইংরেজিতে দক্ষতা থাকতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে কম্পিউটারও জানা থাকতে হবে। মার্কেটিংয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে যে বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়া হয় সেটা হলো নিয়োগ পরীক্ষা। এই পরীক্ষার জন্য ভালো প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে আপনাকে ভাইভার জন্য ডাকা হবে। ভাইভার পারফরম্যান্স সন্তোষজনক হলে বদলে যাবে আপনার জীবনের গতিপথ। মার্কেটিংয়ে পদ যাই হোক না কেন, আপনাকে উন্নতি করতে হলে পরিশ্রম করতে হবে। প্রয়োজনে আপনাকে চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। আপনার আচরণ ও কথা কারও মনে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়- এমন কোনো কাজ কখনও করবেন না। তার পরিবর্তে আপনার অতীত কাজের স্যাম্পলসহ সংক্ষিপ্ত ও মনোমুগ্ধকর পরিচিতিমূলক একটি চিঠি পাঠান। এ ছাড়া ই-মেইল বা ফোন কল দ্বারাও যোগাযোগ করতে থাকুন। ট্রেড শো থেকে শুরু করে সেমিনার, ইন্ডাস্ট্রি ফোরাম- যেখানে সম্ভাব্য ক্রেতারা উপস্থিত থাকেন, সেখানে যতটা সম্ভব উপস্থিত থাকুন। নতুন সুযোগ খোঁজার চেয়ে বিদ্যমান সুযোগই আপনার জন্য অধিক কাজ এনে দেবে। সেজন্য পরিচিতি ও নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি করুন। একসময় আপনি নিজ গুণাবলীর বলে মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ থেকে প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার কিংবা মার্কেটিং ম্যানেজার পদে পদোন্নতি পেতে পারেন।

জানতে হবে আদব কায়দা
সাফল্যে নেই কোনো সহজ উপায়। দীর্ঘ দিনের পরিশ্রম আর সাধনার পরই দেখা পাওয়া যায় সাফল্যের পরশ। ব্যবসায় কিংবা চাকরিতে কিন্তু এই সাফল্যের পথে সহকর্মী-বস-কিংবা অধস্তন দের সঙ্গে কথা বলতে হতে হয় সাবধানী।

এক. আপনার কর্মচারীরা হচ্ছে প্রতিবিম্ব। যারা আপনার জন্য কাজ করে তারা আত্মহীন নয়। তাদের নানা আচরণেই নিজের চাকরি সম্পর্কে তাদের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আপনি যদি আপনার কর্মীদের সঙ্গে ভদ্রতা ও সম্মানজনক আচরণ করেন যা আপনি আপনার কাস্টমারের সঙ্গে করেন, তাহলে পরবর্তী সময়ে তাদের আচরণেও এটি প্রকাশ পাবে।

আহমেদ ইফতেখার সানিদুই. বিশ্বস্ত কাস্টমার হিসেবে আপনার কর্মীদের মূল্যায়ন করুন। তাহলে সবসময় তারা আপনার সাথে থাকবে। ক্লায়েন্টের মতো আপনি আপনার কর্মীদের অংশগ্রহণ এবং সামর্থ্যরে কথা কখনও ভুলে যাবেন না। উৎসাহ দেয়া ভালো তবে বাস্তব পুরস্কার আরো বেশি ভালো। কর্মীদের প্রণোদনা নিশ্চিত করতে কম্পেনসেশন বা ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্যাকেজ এবং বোনাস প্রোগ্রাম চালু করুন।

তিন. কথা-বার্তা বা আলাপ-আলোচনা সহজ নয়। তবে এই কাজটির চর্চাও রাখতে হবে। আপনি যেমন আপনার কাস্টমারকে কোনো কিছু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, সে রকম আপনার কর্মীদের সঙ্গেও নিয়মিত কথা বলুন। তাদের অনুরোধের ফিডব্যাক দিতে হবে এবং তাদের নতুন প্রোডাক্টস, সার্ভিস অথবা প্রসিডিউরের সঙ্গে আপডেট করার সুযোগ দিতে হবে।

চার. স্পষ্টবাদী হতে হবে। আপনার এমন কাস্টমার থাকতে পারে যার ডিপ্লোম্যাসি/ কূটনীতি, বাউন্সড চেক কমনসেন্স কিংবা সাধারণ জ্ঞান আপনাকে বাধ্য করে তার সঙ্গে ব্যবসায় ভদ্রভাবে কোনো কিছু বলতে। একজন কর্মী যে আপনার আশানুরূপ কাজ করছে না তাকেও আপনি এই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে পারেন।

পাঁচ. আপনি যদি কর্মী হয়ে থাকেন, তাহলে প্রশ্ন করুন। একজন কর্মী হিসেবে জব/কাজ আপনার উপর চাপিয়ে দেয়া হয়, সেটা সম্পর্কে আপনার সম্যক ধারণা থাকা উচিত। আর তার জন্য প্রশ্ন করে কাজটি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিতে দ্বিধা বোধ করবেন না। তাতে ক্ষতিটা আপনারই হবে। আপনি কাস্টমার হিসেবে যেমন কোনো সেবা বা পণ্যের বিস্তারিত জানতে প্রশ্ন করে থাকেন, তেমনি কর্মী হিসেবেও আপনার উপর অর্পিত কাজগুলো সম্পর্কে প্রশ্ন করে বিস্তারিত জেনে নিন।

ছয়. ব্যবসায় অভিজ্ঞতা সীমাহীন অবাস্তব আশাকে ত্যাগ করতে বাধ্য করে। এটা একজন কর্মীর ক্ষেত্রেও সত্য। কাজেই আপনার কর্মীদের সঙ্গে সেভাবেই আচরণ করুন, যেন তাদের অভিজ্ঞতাগুলো প্রতিষ্ঠানের ভালোর জন্য ব্যবহার করা যায়। আর আপনি কর্মী হলে আপনার অভিজ্ঞতা যাতে প্রতিষ্ঠানের সুফল বয়ে আনে, তার জন্য কাজ করুন।

সাত. না বলতে ভয় পাবেন না, সেটা আপনি কর্মীই হোন আর বসই হোন। কর্মী হলে আপনার গন্ডির বাইরে কোনো কাজ দেয়া হলে সেটা ভদ্রভাবে নাকচ করে দিন। কারণ এতে কাজটি সঠিকভাবে নাও হতে পারে যা প্রতিষ্ঠানের জন্য সুফল আনবে না। আবার কর্মীর অবৈধ আবদারকেও প্রশয় দেবেন না। সেক্ষেত্রে সরাসরি না বলাই ভালো।

মানবকণ্ঠ/এসএস