চা শ্রমিকদের কষ্টের জীবন ২

মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে চা শ্রমিকরা

চা বাগানে শ্রমিকদের অধিকাংশ সদস্যই কোনো না কোনো রোগে আক্রান্ত। রোগবালাই যেন ওদের নিত্যসঙ্গী। চা বাগানের লেবার লাইনে গাদাগাদিভাবে বসবাস। অসচেতনতা, কাজের নোংরা পরিবেশ, পরিচ্ছন্ন পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব, মাদকাসক্ত, অপুষ্টি, নালা ও খালের পানির ব্যবহার, বাল্যবিবাহ, বেশি সন্তান নেয়া, নিয়ন্ত্রণহীন যৌনাচারসহ অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতার কারণেই চা শ্রমিকরা মূলত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

তারা দৈনিক যে মজুরি পান তা দিয়ে চিকিৎসা করানো তো দূরের কথা পরিবারের খরচ জোগানোই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। আর অধিকাংশ চা বাগানের নির্ধারিত কম্পাউন্ডারে (হাসপাতাল) গেলে সব রোগের ওষুধ হিসেবে দেয়া হয় কয়েকটি প্যারাসিটামল ট্যাবলেট। এদিকে বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, চা বাগানে বসবাসকারী নারীদের মধ্যে ১৫ শতাংশ নারী প্রাথমিকভাবে জরায়ুমুখে ক্যান্সার ও অধিকাংশ পুরুষ যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত। তাদের পরিবারে জন্ম নেয়া শিশু প্রায়ই খর্বাকৃতির। এসব শ্রমিকদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার নিয়েও উদাসীন মালিক পক্ষ।

সরেজিমন চা বাগানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ চা শ্রমিক পরিবারে একজনের দৈনিক ১০২ টাকা মজুরির ওপর নির্ভরশীল ৫ থেকে ৮ সদস্যের পরিবার। ফলে খাবারে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টির অভাব। অপরদিকে মানসম্মত পয়ঃনিষ্কাশনের অভাবে কলাপাতা, পলিথিন দিয়ে বেড়া দিয়ে আর উন্মুক্ত স্থানে মলমূত্র ত্যাগের কারণে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই বেড়ে উঠছে চা শ্রমিক সন্তানরা। পুষ্টিকর খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসার অভাব, বাসস্থান ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের অপর্যাপ্ততার কারণে চা শ্রমিকরা জীবনমান উন্নত করতে পারছে না। আর্থিক অসচ্ছলতা, ভূমির সমস্যা, লোকবল বৃদ্ধি ও কিছুটা অভ্যাসগত কারণে চা বাগানের শ্রমিকদের ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নাজুক। বাগান কর্তৃপক্ষ, ইউনিয়ন পরিষদ ও এনজিওসমূহের মাধ্যমে কিছু ল্যাট্রিন বিতরণ করা হলেও বিশাল শ্রমিক পরিবারের মধ্যে সেগুলো পর্যাপ্ত নয়।

অপরদিকে পুরুষ শ্রমিকদের কোম্পানির নির্দেশে প্রতিদিনই নির্ধারিত (নিরিখ) এক একর জমির পরিমাণ চায়ের টিলাভূমিতে কীটনাশক স্প্রে করতে হয়। ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক স্প্রে করার কাজে নিয়োজিত থাকলেও তাদের জুতা ব্যতীত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষামূলক কোনো সামগ্রী সরবরাহ করে না অধিকাংশ বাগান কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকদের চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যেই কাজ করতে হয়। আর নারী শ্রমিকদের প্রতিদিনই মশা আর নানা পোকামাকড়ের কামড় খেয়ে পাতা তুলতে হয়।

চা শ্রমিকরা বলেন, আমরা যে মজুরি পাই তা দিয়ে পরিবারের খরচ জোগাতেই পারি না। পুষ্টিকর খাবার আর চিকিৎসা করব কী দিয়ে। আমাদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে মালিক পক্ষ কোনো উদ্যোগ নেয় না। বাগানের নির্ধারিত হাসপাতালে গেলে সব রোগের ওষুধ হিসেবে দেয়া হয় প্যারাসিটামল। বেশি অসুস্থ হলে সামান্য চিকিৎসা দেয়া হয়।

চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অত্যন্ত নিম্নমানের কথা উল্লেখ করে চা শ্রমিক নেতা বিজয় হাজরা বলেন, অধিকাংশ চা বাগানের মেডিকেলে রোগীদের জন্য বসার কোনো ব্যবস্থা নেই। তিনি বলেন, একজন অসুস্থ চা শ্রমিক মেডিকেলে সিক লিস্টে নাম লেখাতে গেলে দীর্ঘসময় ধরে মেডিকেলের বারান্দায় বসে অপেক্ষা করতে হয়। রোগীদের জন্য স্যালাইন, নাপা, ইসটাসিন, প্যারাসিটামল, মেট্রিক আর কুইনাইন ছাড়া এখানে আর কোনো ওষুধ পাওয়া যায় না।

চা শ্রমিক নেতা পরেশ কালিন্দী বলেন, চা বাগানের মেডিকেলগুলোতে কোনো জরুরি বিভাগ নেই। সাধারণ রোগীরা ডাক্তার দেখাতে হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মেডিকেলে যেতে হয়। মারাত্মক কোনো রোগীর প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা না দিয়েই তাদের অন্যত্র রেফার্ড করা হয়।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান চা শ্রমিক নেতা প্রেমসাগর হাজরা বলেন, বাগানের ডিসপেনসারিগুলোতে ভালো কোনো টেকনিশিয়ান নেই। অধিকাংশ বাগানেই এলএমএএফ বা কম্পাউন্ডারের মাধ্যমে চলে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। তাছাড়াও উপজেলার ৫-৬টি বাগানের জন্য একজন করে এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োজিত থাকলেও তিনি প্রতিদিন সব বাগানে সময় দিতে পারেন না।

চা শ্রমিকদের মধ্যে ১৫ শতাংশ নারী প্রাথমিকভাবে জরায়ুমুখে ক্যান্সারে আক্রান্ত এমন ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে গবেষণামূলক সংস্থা সিআইপিআরবির এক জরিপে। এ বছরের মে মাসে জরিপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেখা গেছে দেশে মোট চা বাগান ১৬৪টি। বাগানে প্রায় ৯ লাখ চা জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারী শ্রমিক। এই অর্ধেক নারী শ্রমিকের ১৫ শতাংশের শরীরে বাসা বেঁধেছে মরণব্যাধি ক্যান্সার। মৌলভীবাজারের রাজঘাট, খেজুরিছড়া, আমরাইলছড়া, সাতগাঁও, হোসেনাবাদ, আলীনগর, শমসেরনগর, মিরতিংগা, মাধবপুরসহ ১০টি বাগানে পরিচালিত এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেহেতু দেশের সব চা বাগানে একই কাজ ও বাসস্থানের পরিবেশ বিদ্যমান সেহেতু চা বাগানগুলোতে একই অবস্থা থাকার সম্ভাবনা প্রবল।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) অর্থায়নে জাতীয় স্বাস্থ্য উন্নয়ন ও গবেষণামূলক সংস্থা সিআইপিআরবির কারিগরি সহযোগিতায় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে মৌলভীবাজার জেলার চা বাগানে প্রজনন ও মাতৃস্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়নে বিবাহিত নারীদের জরায়ুমুখের ক্যান্সার শনাক্তকরণের জন্য বিনামূল্যে ‘ভায়া’ টেস্ট কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

সিআইপিআরবি সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজারের ৯২টি চা বাগানের মধ্যে ১০টি চা বাগানে মোট ৩ হাজার নারীর ভায়া টেস্ট সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৫১৯ জন দুরারোগ্য ক্যান্সার নামক ব্যাধিটি পজিটিভও এসেছে। এই ভায়া টেস্টের যে ভয়াবহ ফলাফল এসেছে তা চমকে দেয়ার মতো। তথ্যমতে চা বাগানে কর্মরত নারীদের শতকরা ১৫ জনের জরায়ুমুখে ক্যান্সারের লক্ষণ পাওয়া গেছে। এই কার্যক্রমে অংশ নেয়া নারীরা সাধারণত ২১ থেকে ৬৫ বছরের। চা বাগানে শিক্ষার অভাব থেকে ক্যান্সার তথা স্বাস্থ্য নিয়ে অসচেতনতা, কাজের নোংরা পরিবেশ, অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতা যা জরায়ুমুখে ক্যান্সারের জন্য দায়ী।

বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মূলত বাল্যবিবাহ, বেশি সন্তান নেয়া, অসচেতনতা, অপরিষ্কার, অপরিচ্ছন্নতা ও নিয়ন্ত্রণহীন যৌনাচারের ফলে জরায়ুমুখে ক্যান্সারের সূত্রপাত হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আক্রান্ত নারীদের লেটেস্ট ডায়াগনস্টিক টুল ভিডিও কল্পস্কোপির মাধ্যমে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতালে তাদের চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এদের ‘ভিডিও কল্পস্কোপি’র মাধ্যমে ‘সারভাইকেল ক্যান্সার’ কোন স্টেজে আছে সে অনুযায়ী চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।

প্রাথমিকভাবে জরায়ুমুখে ক্যান্সার শনাক্তকৃত মিরতিংগা চা বাগানের রুপা উরাং, অঞ্জনা ভূমিজ, রূপালি গোয়ালাসহ কয়েকজন নারীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বিভিন্নভাবে চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত এই নারীরা প্রাথমিকভাবে ক্যান্সারের লক্ষণ ধরা পড়ার আগেই সচেতন হতে পারছেন এবং চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ থাকার স্বপ্ন দেখছেন।

সিআইপিআরবির মৌলভীবাজার জেলা সমন্বয়কারী মো. আলতাফুর রহমান জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ইউএনএফপিএ ও সিআইপিআরবির যৌথ উদ্যোগে ১০টি চা বাগানে মোট ৩ হাজার নারীর ভায়া টেস্ট সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৫১৯ জনের জরায়ুমুখের ক্যান্সারপূর্ব অবস্থা (ভায়া পজিটিভ) শনাক্তকরণ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে জরায়ুমুখের ক্যান্সারপূর্ব অবস্থা শনাক্তকৃত ৫২৩ জন নারীকে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসা প্রদান করে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

অপরদিকে ১৯৭৬ সালে মৌলভীবাজার জেলায় যক্ষ্মা প্রতিরোধে কার্যক্রম শুরু করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা হিড বাংলাদেশ। চা বাগান এলাকায় যক্ষ্মার সংক্রামক বেশি পাওয়া যায় তাই চা বাগানকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে যক্ষ্মা নিয়ে কাজ করে চলছে চ্যালেঞ্জ টিবি প্রকল্প। বর্তমানে হিড বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ টিবি প্রকল্প মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলার ১৫টি উপজেলার ১৮৪টি চা বাগান, ৭২টি খাসিয়া পুঞ্জি ও ৫৪টি রাবার বাগানে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।

হিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, মৌলভীবাজার জেলায় ২৮ হাজার ৪৭৩ জন রোগীকে সন্দেহভাজন যক্ষ্মা রোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে গত বছর জেলায় ৪৬৮৮ জন যক্ষ্মা রোগী চিহ্নিত করে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। যার মধ্যে চা শ্রমিক ছিল ১৩৫০ জন আর শিশু ছিল ২৮৮ জন।

শমশেরনগর চা বাগানের ইউপি সদস্য সীতারাম বীন বলেন, চা বাগানে মদের পাট্টায় গিয়ে মদ পান, স্থান সংকুলানের অভাবে গাদাগাদি আর নোংরা পরিবেশে বসবাস ও সচেতনতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। ফলে এসব রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে চা শ্রমিকরা।

হিড বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ টিবি প্রকল্পের পরিচালক মনরো জ্যাকব বলেন, অপুষ্টি আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস ও অতিরিক্ত চোলাই মদ আর ধূমপান করায় চা শ্রমিকদের মধ্যে যক্ষ্মা রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চা বাগান মালিক পক্ষের সংগঠন বাংলাদেশি চা সংসদের প্রতিনিধি জেম্স ফিনলে কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক জি এম শিবলী বলেন, চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবাসহ জীবনমান উন্নয়নের জন্য আমরা কাজ করছি। স্বল্প সংখ্যক বাগান ছাড়া সব বাগানেই চিকিৎসার পরিপূর্ণ ব্যবস্থা আছে। শ্রমিকের চিকিৎসার প্রয়োজনে সব ধরনের প্রদক্ষেপ গ্রহণ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।

চা বাগান এলাকায় যক্ষ্মা ও মাতৃমৃত্যু ও জরায়ু ক্যান্সারের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করে মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) ডা. বিনেন্দু ভৌমিক জানান, জেলার প্রতিটি হাসপাতালে যক্ষ্মা রোগীদের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কফ পরীক্ষা এবং চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। গুরুত্ব দিয়ে চা শ্রমিকদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের জন্য স্বাস্থ্যসেবা খাতে প্রশিক্ষিত জনশক্তি বাড়াতে হবে।

তাছাড়া চা বাগানে জন্ম নিয়ন্ত্রণ ও প্রসবকালীন পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে পরিবার পরিকল্পনার বিষয়টি নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। চা বাগানে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবায় সরকার পঞ্চায়েত, শ্রমিক প্রতিনিধি, মালিক পক্ষ ও ইউপি জনপ্রতিনিধির সমন্বয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। আগামীকাল: শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত চা শ্রমিকের সন্তানরা

মানবকণ্ঠ/এএএম

Leave a Reply

Your email address will not be published.