মানসম্মত ও যুগোপযোগী বিজ্ঞান শিক্ষা জরুরি

মানসম্মত ও যুগোপযোগী বিজ্ঞান শিক্ষা জরুরি

দেশে তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব শুরু হয়েছে। তবে একই সঙ্গে আরেকটি বিষয়ে অবনমন ঘটছে। সেটি বিজ্ঞান শিক্ষায়। বর্তমানে সরকারের নানা প্রকল্পের মাধ্যমে মফস্বল বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও কম্পিউটার, প্রজেক্টরসহ ডিজিটালাইজেশনের নানা উপকরণ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞান শিক্ষার উন্নতিতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ আশা জাগাতে পারছে না। বিজ্ঞানে দক্ষ শিক্ষক, শিক্ষা উপকরণ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোসহ নানা কারণে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে বিজ্ঞান শিক্ষাব্যবস্থা প্রায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে শিক্ষার্থীরা। দিন দিন কমে যাচ্ছে এ বিভাগের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা। শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা ও অবহেলার কারণে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বিজ্ঞান শিক্ষা। আগ্রহ থাকলেও যোগ্য শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকায় ছাত্রছাত্রীরা বিজ্ঞান শিক্ষায় এগিয়ে আসছে না। বিজ্ঞানভীতি দূর করতে শিক্ষকদের পক্ষ থেকেও কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। দেশের বেশিরভাগ স্কুল ও কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষার বেহাল ও করুণ চিত্র। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নামমাত্র যে বিজ্ঞানাগার আছে, তাতে নেই কোনো বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আবার যেসব প্রতিষ্ঠানে সামান্য কিছু যন্ত্রপাতি ছিল তাও রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতার কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগ কোনো শ্রেণিতেই বিজ্ঞানের কোনো বিষয়ে হাতেকলমে (প্র্যাকটিক্যাল) শিক্ষা দেয়া হয় না। সারা বছর তালাবদ্ধ থাকে গবেষণাগার। এছাড়া বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষকরাও শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে তেমন উৎসাহ দেন না। তারা নিজেরাই অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মনে বিজ্ঞান ও গণিতভীতি ছড়িয়ে দিচ্ছেন। শিক্ষকরা পিছিয়ে থাকলে ছাত্রছাত্রীরা এগিয়ে আসবে কীভাবে? ফলে দিন দিন বিজ্ঞান শিক্ষায় ছাত্রছাত্রী কমে যাওয়ার পাশাপাশি নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে।

বর্তমানে প্রযুক্তির প্রসার ঘটছে। এই প্রযুক্তিও বিজ্ঞানেরই অবদান। আমাদের দেশে প্রযুক্তিকে একপেশে করে ফেলা হচ্ছে। প্রযুক্তি বলতে কম্পিউটার, স্মার্টফোন, প্রজেক্টরকেই বোঝানো হচ্ছে কিনা প্রশ্ন জাগে। পদার্থ, রসায়ন, জীববিদ্যাসহ নানা বিষয়ে গবেষণাগারে যে গবেষণা ও উদ্ভাবন, সে দিক থেকে সরে আসছে এ প্রজš§ ক্রমাগত অথচ বিজ্ঞানের যুগে বিজ্ঞান শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া অত্যন্ত দুঃখ ও দুর্ভাগ্যজনক। বিজ্ঞান শিক্ষা জনপ্রিয় করতে হলে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। বিষয়ভিত্তিক বিজ্ঞানমনস্ক ভালো শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। সেকেন্ডারি লেভেলে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের চিন্তাচেতনা ও কর্মপরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে অনেক কিছু। আধুনিক বিশ্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিশ্ব। এই বিশ্বে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদের বিজ্ঞান ও গণিতে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। তত্ত্বীয় শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবহারিক ক্লাসটি করা হলে শিক্ষার্থীদের আতঙ্ক অনেকাংশেই কেটে যেত। তবে বিজ্ঞান শিক্ষার এ দুর্দশা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। এটি ধারাবাহিক একটি নেতিবাচক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আজকের সংকটজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে উচ্চস্তর পর্যন্ত বিজ্ঞান শিক্ষার বইয়ের সংকট রয়েছে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত বই নেই। কয়েক লেখকের বই-ই ঘুরে ফিরে ছাত্রছাত্রীদের পড়তে হচ্ছে। শিশুদের বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে লোভনীয় ও আকর্ষণীয় অনেক বই উন্নত দেশে রয়েছে। আমাদের বই সংকটের বিষয়টি গুরুতর। জার্মানিতে অবস্থানকালীন একদিন লাইব্রেরিতে একটি ছোট বই দেখলাম। দেখেই ভালো লাগল। হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখি। একটু নাড়াচাড়া করেই বুঝে উঠি যে, এটি আসলে বিদেশের তথা উন্নত বিশ্বের একদম নিচু ক্লাসের বাচ্চাদের বিজ্ঞানের বেসিক কিছু বিষয়ে ধারণা দেয়ার বই। এক-পাতা, দু-পাতা করে উল্টাতে উল্টাতে মন্ত্রমুগ্ধের মতো প্রায় ১০ মিনিট ধরে বইটা নাড়াচাড়া করি। বিস্ময়ের সঙ্গে উপলব্ধি করতে পারি, তাদের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা উন্নত ও যুগোপযোগী! বুঝতে পারি, কেন আমাদের দেশে বিজ্ঞান শিক্ষার এই দুর্দশা।

আমাদের দেশে গণিত মানে তো অদ্ভুত এক পাঠ্যক্রম। তিন চার বছরের শিশু থেকে শুরু করে সেকেন্ডারি লেভেলের অনেক শিক্ষকও গণিত বলতে কেবল যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ বোঝেন। বাচ্চাদের শেখানোর ক্ষেত্রেও সরাসরি অনুশীলন করানো হয়। তাদের ক্যালকুলেটর ব্যবহার বা হাতে গুণে অংক কষা শেখানো হয় অথচ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের মূল অধ্যায়ে কী লেখা আছে তা আমরা কখনোই পড়ি না। এ লেখাগুলোও অবশ্য নীরস ও কঠিন করে লেখা। এটা পড়ার প্রতি কারো আগ্রহ তৈরি হয় না। কঠিন মনোযোগ ছাড়া এসব লেখা ধৈর্য ধরে পড়ে যাওয়া বেশ কষ্টের। স্বাভাবিকভাবে নিয়ম হওয়া উচিত, এসব পড়ে এরপর অনুশীলন বা অংক শেখা হবে। এসবের বর্ণনায় সহজভাবে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করা থাকবে। কিন্তু ঘটনা উল্টো। কিছু বুঝতে না পেরে অবশেষে শিক্ষক বা প্রাইভেট শিক্ষকের আনুকূল্য পাওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হয়।

শিক্ষার শুরুতে একটা বাচ্চা যখন অঙ্কগুলোকে বুঝে না, না বুঝেই ঝাড়া মুখস্থ করে যেতে থাকে, স্বাভাবিকভাবেই গণিতের প্রতি তার আকর্ষণ কমে যেতে থাকে। মুখস্থ থেকে ক্রমে ভুলে যাওয়াই তখন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায়। মাধ্যমিক পর্যায়ে এসব সমস্যার সঙ্গে যোগ হয়, অংকের নিয়ম সংক্রান্ত জটিলতা আবার সেকেন্ডারি লেভেলের কিছু শিক্ষক তার মুখস্থ ও আয়ত্ত করা নিয়মের বাইরে কখনো যেতে চান না। তিনি ওই নিয়মেই শেখান যা তিনি বছরের পর বছর ধরে প্র্যাকটিস করে যাচ্ছেন। এর বাইরেও যে নিয়ম থাকতে পারে, তাতে তিনি যেতেই চান না। মাঝে মধ্যেই এসব শিক্ষক ফতোয়া দিয়ে বসেন, অমুক নিয়মে অঙ্ক করলে তিনি নম্বর দেবেন না, উনার নিয়মটাই একমাত্র ঠিক। একই অবস্থা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও। সেকেন্ডারি লেভেলে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হলেও কলেজ পর্যায়ে বিজ্ঞান বিভাগ ত্যাগের নজিরও কম না।

কলেজ পর্যায়ে আধুনিক মানের বইয়ের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। গত কয়েক দশক থেকে একই মানের ও একই লেখকশ্রেণির বই বাজারে ঘোরাফেরা করছে। আসছে না নতুনত্ব। কলেজ পর্যায়ে বিজ্ঞান মানেই নানা ধরনের গাণিতিক ক্রম। কলেজ পর্যায়ে বিন্যাস ও সমাবেশের অংকের একটি বই আছে। এ বইয়ে বিন্যাস সমাবেশের অধ্যায়ে গেলে প্রথমেই ধাক্কা লাগবে। এ ধাক্কা আর অতিক্রম করা সহজ হয় না। কেউ হয়তো এক ধাক্কাতেই পার হয়ে আসেন, কেউবা সেই ধাক্কা সারা জীবনেও পার হতে পারেন না। পরের দলকে খুব বেশি দোষ দেয়া যায় না, কারণ এত সূক্ষ্ম বিষয়ের একটি অধ্যায়কে মোটামুটি সব বইতেই এত মোটা দাগে লেখা হয়েছে এবং বিশেষত ভাষার মারপ্যাঁচ দিয়ে এতটাই ধোঁয়াশা তৈরি করা হয়েছে যে সেটা বুঝতে পারা আসলেই বড় কৃতিত্বের ব্যাপার। এছাড়া বলবিদ্যার মতো বিষয়ের বইতেও যথেষ্ট পরিমাণ সচিত্র আলোচনা নেই। শুধু রয়েছে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা কিছু চর্বিত চর্বণ সমস্যা। ফলস্বরূপ, উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে শিখে আসা বলবিদ্যা ভুলে যেতে অধিকাংশ ছাত্রেরই ছয় মাসের বেশি সময় লাগে না।

উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে পদার্থবিজ্ঞানে কিছু অধ্যায় ছিল যা ছাত্রদের মোটামুটি কেউই ঠিকমতো বুঝতে পারত না। কিছু কমন প্রশ্ন মুখস্থ করে পাস করে আসত। তার মধ্যে আলোর সমাবর্তন, অপবর্তন, পৃষ্ঠটান ইত্যাদির কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। বইগুলোর মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বহুল অনুসৃত একটি পদার্থবিজ্ঞান বই মূলত ইংরেজিতে লিখিত একটি বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞান বইয়ের হুবহু বঙ্গানুবাদ। মজার ব্যাপার হলো, ইংরেজি সেই বইটি রচিত হয়েছিল সম্মান শ্রেণির জন্য। কিন্তু আমাদের উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে এর চেয়ে অধিক সচিত্র ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দরকার যার কিছুই সেই বইতে নেই। উচ্চমাধ্যমিক মূলত একটা কঠিন পর্যায়। রাজ্যের পড়া পড়তে হয় তুলনামূলকভাবে অনেক কম সময়ে। শুধু পাঠ্যবিষয়ের ভলিউম দিয়েই এই জটিলতা নিরসন করা যাবে না সম্পূর্ণভাবে। আগের ক্লাসগুলোর তুলনায় উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে পঠিত বিজ্ঞান ও গণিতের অধিকাংশ বিষয় বেশ নতুন। কিছুটা কঠিনও বটে। ক্যালকুলাস, বিন্যাস-সমাবেশ, দ্বিপদী কিংবা জটিল সংখ্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো খুব কম সময়ের মধ্যেই আমাদের শিখতে হয়। একই কথা খাটে পদার্থবিজ্ঞান কিংবা রসায়নের ক্ষেত্রেও। রসায়নে জারণ বিজারণ, জৈব যৌগ কিংবা শ্রেণি রসায়নের মতো ব্যাপারগুলো খুব কম সময়েই আত্মস্থ তথা মুখস্থ করতে হয়।

উন্নতমানের ল্যাবরেটরিরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে আমাদের। প্রাইমারি স্কুলে হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেনের নাম ছাত্রছাত্রীরা কোনোমতো শুনতে পারে। সেকেন্ডারি লেভেলে ল্যাব বলতে বোঝানো হয় মাইক্রোস্কোপকে। আর জীববিজ্ঞানে শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের ব্যাঙ কেটে নাড়িভুঁড়ি বের করা শেখান। কলেজ পর্যায়ে কিছু কলেজে ল্যাব থাকলেও শতকরা নব্বই ভাগেরও বেশি কলেজে ল্যাব নেই আর যেখানে ল্যাব আছে, সেখানেও গবেষণার সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। যন্ত্রপাতি অকেজো। মাদ্রাসাতেও বিজ্ঞান পড়ানো হয়। তবে সেখানে আরো করুণ অবস্থা। এসব প্রতিষ্ঠানে শেষ কবে যে ল্যাবের পেছনে টাকা খরচ করা হয়েছে, তা শিক্ষকসহ ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা পর্যন্ত বলতে পারবেন না। এসব প্রতিষ্ঠানে ল্যাব ও গবেষণার পেছনে আর্থিক বরাদ্দও থাকে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে নতুনভাবে উপস্থাপন করছে। তথ্যপ্রযুক্তিগত ব্যাপক উন্নয়নের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার এ দেশকে অচিরেই সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাল করার নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। তবে উন্নয়নের যে মহাসড়কে বাংলাদেশ যোগ দিয়েছে, শেখ হাসিনা ও তার সরকারের যে অভিনন্দন ও স্বীকৃতি মিলছে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে- সেটিকে টেকসই ও প্রত্যাশিত গন্তব্যে নিয়ে যেতে হলে সর্বাগ্রে দরকার মানসম্মত এবং যুগোপযোগী বিজ্ঞান শিক্ষা। এ ব্যাপারে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবার সচেতনতা জরুরি।
– লেখক : সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.