মানসম্পন্ন শিক্ষার বিস্তার ও একটি প্রস্তাবনা

স্বয়ংসম্পূর্ণ, স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ দেশ-জাতি গঠনে শিক্ষার বিকল্প নেই। কেবল সার্টিফিকেট নয়, এটি হতে হবে গুণগত ও মানসম্মত শিক্ষা। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত, যে জাতি যত সমৃদ্ধ, উন্নত ও নেতৃত্বের শীর্ষে আসীন ছিল, জ্ঞানের রাজ্যেও তারা ছিলেন শ্রেষ্ঠ পাণ্ডিত্যের অধিকারী। অগাধ জ্ঞান আর পাণ্ডিত্যের কারণেই সভ্যতা বিকশিত হওয়ার পূর্বেই সক্রেটিস, এরিস্টটল, আর্কিমিডিসরা আবিষ্কার করেছিলেন গ্রহ, নক্ষত্র, সৌরজগৎ, পৃথিবীর ঘূর্ণায়মান গতির মতো অবিস্মরণীয় ঘটনা। বর্তমানেও দারিদ্র্য, অভাব-অনটন, কর্মসংস্থানের অভাব, অবকাঠামোগত স্থাপনাসহ বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা কেবল তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতেই দেখা যায়।

নিঃসন্দেহে অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কার বা শিক্ষার অনুপস্থিতিই এর অন্যতম প্রধান কারণ। সময় পাল্টেছে। এখন প্রতিবাদের অর্থ হচ্ছে- প্রতিপক্ষের সম্মুখে উন্নত প্রযুক্তি, প্রকৌশল উপস্থাপন করা , প্রতিযোগিতা হচ্ছে উন্নততর প্রযুক্তি দ্বারা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা, এখন উন্নত শিক্ষার অর্থ পৃথিবীর জ্ঞানের পরিধিতে নতুন কিছু সংযোগ। ঢাল, তলোয়ার নিয়ে, ছুরি যুদ্ধের পরিবর্তে সূক্ষ্ম জ্ঞান, অত্যাধুনিক আবিষ্কারের ক্ষেত্রে কে কত এগিয়ে থাকবে, তার প্রতিযোগিতা চলছে। পৃথিবী জয়ের পর মঙ্গলগ্রহে আলুর চাষ বা মানুষের বসবাস নিয়ে স্নায়ু পরীক্ষা চলছে। মধ্যম সারির দেশগুলোও উপগ্রহ নিয়ন্ত্রণের দৌড়ে নিজেদের শামিল করছে। এসবের ভিত্তি হলো গুণগত ও মানসম্মত শিক্ষা আর মানসম্মত শিক্ষার পূর্ব শর্ত হলো যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক।

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষকের গুরুত্ব সর্বাধিক। একজন শিক্ষক একটি জাতিগঠনের দায়িত্বে নিয়োজিত অথচ কিছু শিক্ষকের ধ্যান-ধারণা, সামাজিক বিবেচনা, প্রশাসনিক মূল্যায়ন সব মিলিয়ে শিক্ষকের অবস্থান কেবল একটি ‘চাকরি’তে পরিণত হয়েছে। মৌলিক দায়িত্ব থেকে শিক্ষক সমাজ বিচ্যুত। শিক্ষাদানের মহান যে ব্রত, তা আজ প্রাথমিক পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত, সর্বস্তরের শিক্ষক সমাজের মাঝে অনুপস্থিত।

বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের শিক্ষকদের বর্তমান অবস্থানের মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণে হতাশার একটি চিত্র ভেসে ওঠে। কিছু ব্যতিক্রম সবক্ষেত্রেই আছে, তবে সিংহভাগই আলোচ্য, তারাই সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। সারাদেশের গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-নগরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিন্ডারগার্টেন। প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে নিত্যনতুন আরো প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে নানাধর্মী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের মান নিয়ে যথেষ্ট ‘বিতর্ক’ আছে। সেবার পরিবর্তে বাণিজ্যিক লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের মালিকরা দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের পরিবর্তে অধিক মুনাফা অর্জনেই মনোযোগী। বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও একই চিত্র।

যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে বেশিরভাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও অথচ এই স্তরের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের সারাজীবনের বীজ রোপিত হয় শিক্ষার এ স্তরেই। উচ্চারণের অশুদ্ধতা, ভুল বানান, সঠিক লেখনী, গাণিতিক ভুল প্রয়োগ প্রভৃতি বিষয় শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক স্তরেই শিখে থাকে। তারা যদি ভুল শিখে, সারাজীবন ভুল প্রয়োগ করবে। কিছু পরিবারে শিক্ষিত বাবা-মা শিশুর আধো বুলির উচ্চারণেই সঠিক শিক্ষাটা দেয়ার সুযোগ পান।

কিন্তু দেশের বেশিরভাগ পিতা-মাতা সন্তানের পড়ালেখা ব্যাপারে অসচেতন। ব্যস্ততা কিংবা পারিপার্শ্বিকতার কারণেও তাদের সুযোগ হয়ে ওঠে না সন্তানের পড়ালেখার মেন্টর হতে। এ কারণেই বাণিজ্যিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা গৃহ শিক্ষকের ওপর নির্ভর হয়ে ওঠেন তারা। শিশুদের এ অবস্থায় শিক্ষকরা যেটা বলে থাকেন, তাদের কাছে সেটাই অমিয় বাণী মনে হয়। তারা ভাবে, শিক্ষকরা কখনো ভুল শেখাতে পারেন না। এ কারণে শিক্ষার্থীদের মেধার ভিত্তিটা শক্ত ও পাকাপোক্ত করতে দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক অপরিহার্য।

শিক্ষক সম্পর্কে ধারণাও পাল্টে যাচ্ছে। একজন শিক্ষক মূলত নিয়মিত জ্ঞানের চর্চা বা অনুশীলনের মধ্যে থাকেন। তিনি জ্ঞানের সেই জ্যোতি দ্বারা সমাজকে আলোকিত ও জ্যোর্তিময় করে তোলেন। তিনি তার আচার-আচরণ, মন ও মননে নিজেই বটবৃক্ষের ছায়া। তার সাফল্যের ভিত্তি হলো পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা। নির্মল চারিত্রিক গুণাবলি, জ্ঞান সঞ্চারণে আন্তরিক সদিচ্ছা ও প্রচেষ্টা তাকে এগিয়ে রাখে আদর্শ ব্যক্তিত্ব হিসেবে। শিক্ষার্থীর জ্ঞান অন্বেষণ ও আহরণ, মেধা বিকাশ ও উন্নয়নে, শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠনে, নৈতিক ও মানসিক গুণাবলি বিকাশে শিক্ষকের অগ্রণী ভূমিকা থাকে। শিক্ষার্থীদের মন-মনন, মানসিক উৎকর্ষ সাধন, দৈনন্দিন আচার, আচরণ, মন ও আত্মার ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন ঘটাতে শিক্ষক ভূমিকা রাখেন দক্ষ মেন্টর হিসেবে।

এক্ষেত্রে শিক্ষককে হতে হয় ভদ্র, শান্ত, অমায়িক ও অগাধ জ্ঞানের অধিকারী। শিক্ষকের মেজাজ ও উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষার্থীদের ওপর সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের প্রভাব ফেলে। এই তো, কয়েক দশক আগের কথা। শিক্ষক মানেই বোঝা হতো, তিনি জ্ঞানের নিরবচ্ছিন্ন সাধক। হয়তো সেই শিক্ষকের বিদ্যালয়ে একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার আছে, তিনি সে লাইব্রেরির তত্ত্বাবধান করেন, নয়তো তার নিজ বাড়ি বা এলাকায় একটা পাঠাগার গড়ে তুলেছেন। তিনি বিনাপয়সায় দরিদ্র বা সমাজের অবহেলিত অংশকে পাঠদান করাচ্ছেন, নয়তো শিক্ষার কর্মসূচিতে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।

এখন তেমনটি দেখা যায় না। এখন শিক্ষকদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ মহান এ পেশাকে কেবলই ‘চাকরি’ হিসেবে দেখছেন। আর ক’টা চাকরির মতো ৯টা-৫টা অফিস করেন। এ অবস্থা শিক্ষকদের সব স্তরেই দেখতে পাওয়া যায়। শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রকাশ, তাদের মাঝে লুক্কায়িত মেধার দুরন্ত বিস্মৃতি, মেধাবী শিক্ষার্থীকে জাগ্রত করে তোলা, অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীদের শিক্ষায় আগ্রহী করা, বেশি পরিশ্রমে উৎসাহ প্রদান এসব তো একজন আদর্শ শিক্ষকেরই বৈশিষ্ট্য। বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার জন্য একজন শিক্ষককে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করতে হবে। বর্তমানে ক’জন শিক্ষকের মাঝে এমন চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়?

সর্বক্ষেত্রে গুণগত শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হলে প্রাথমিক পর্যায়কে গুরুত্ব দিতে হবে সর্বাগ্রে। এ লক্ষ্যে দরকার সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতায় আসা। সেটা প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকতা। কচি, কোমল প্রাণ শিশুদের মস্তিষ্কে সঠিক শিক্ষার বীজটি বপন করে দেয়া, অল্প বয়স থেকেই শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তোলা, বই ও জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করা, মানবিক গুণসম্পন্ন নাগরিক করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মেধাবী শিক্ষকরাই কাক্সিক্ষত ভূমিকা রাখতে পারেন। অভিভাবকদেরও সচেতন করে তুলতে পারেন। এ কারণে শিক্ষকতায় মেধাবী শিক্ষকের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে আগে একটি সমস্যা ছিল- শিক্ষকদের বেতনভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদির ব্যাপারে আপত্তি ছিল। বর্তমানে সে সমস্যাটি নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীটি এখন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন প্রাথমিক স্তরে শিক্ষক হওয়ার। শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের বেতন-কাঠামো আকর্ষণীয় ও সন্তোষজনক করা, নিয়োগ-প্রক্রিয়া সুষ্ঠু করা এবং শিক্ষক-প্রশিক্ষণের বর্তমান ধারার সংস্কার করা জরুরি। আশার কথা হলো, সরকার এক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে যে কয়েকটি খুব ভালো উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদটি দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীতকরণ এর অন্যতম উদাহরণ। এর ফলে এই শিক্ষকরা তুলনামূলকভাবে বেশি বেতনভাতাসহ সুবিধাদি পাবেন। ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ ৮৯৮ জনকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের সুপারিশ করে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। এসব প্রার্থীকে দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডার পদমর্যাদায় নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গুণগত শিক্ষার ধারা নিশ্চিত করতে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

এ নিয়মে শিক্ষকদের বেতন স্কেল, সামাজিক মর্যাদা, অন্য সুযোগসুবিধা বেড়েছে। আরেকটি বড় ব্যাপার হলো, শিক্ষার্থীর নিজের উপজেলায় প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকরি করার বিধান রয়েছে। গ্রামের বাড়ির প্রতি আমাদের সবারই একটা টান থাকে। অনেক অভিভাবকসহ চাকরিপ্রার্থীরাও প্রত্যাশা করেন, যদি গ্রামের বাড়ি থেকে চাকরি করা যেত! সরকার সেই সুযোগটি এনে দিয়েছে। এর ফলে বিসিএসের মতো কঠিন চাকরির পরীক্ষায় নিজের মেধার পরীক্ষা দিয়েই শিক্ষার্থীদের এই পদে আসতে হবে। মেধাবী শিক্ষকদের কমিটমেন্টের মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মান অনেক বেশি বেড়ে যাবে।

তবে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মান আরো বাড়নো উচিত। চলমান পদ্ধতিতে প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে যে-ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে, তার আরো আধুনিকায়ন করা অত্যাবশ্যক। বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থা প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। শিক্ষকদের প্রযুক্তিবান্ধব হওয়া উচিত। ডিজিটাল বাংলাদেশের কার্যক্রম প্রাথমিক অবস্থা থেকেই শুরু হবে। শিক্ষার নীতিনির্ধারকদের প্রাথমিক-স্তরে শিক্ষার শতভাগ মান নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্ব দিতে হবে।

এ লক্ষ্যে, প্রাথমিক শিক্ষাকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। পিছিয়ে থাকা জনপদ ও এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা করে কাজের পদক্ষেপ নিতে হবে। বিদ্যালয় পরিচালনায় দায়সারা গোছের কমিটি নয়, সমাজের সক্রিয় ব্যক্তিদের বিদ্যালয় পরিচালনায় সম্পৃক্ত করতে হবে। নিয়মিত তদারকি ও সভার মাধ্যমে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে গতিশীল করে তুলতে হবে। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি, অভিভাবক কমিটি, ইউনিয়ন পরিষদের স্থায়ী কমিটি ও উপজেলা শিক্ষা অফিসের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নিয়ে এসে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার উন্নয়নে একজন করে উপদেষ্টা নিয়োগ করে তাদের মাধ্যমে লক্ষ্য বাস্তবায়নে একটি নির্দিষ্ট সময় (স্বল্পমেয়াদি) নির্ধারণ করে দেয়া যেতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বীজ মানসম্মত হলে ভালো ফলের আশা করা বাঞ্ছনীয়। তেমনি প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষকের মান ভালো হলে তখনই দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষার্থী পাওয়া সম্ভব। এ লক্ষ্যে সরকারি পদক্ষেপের পাশাপাশি নিজ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে শিক্ষকদেরই এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি শিক্ষকের নিজস্ব কর্মতৎপরতায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে এক একটি মানসম্মত মানুষ গড়ার কারিগর- এমনটাই প্রত্যাশা। -লেখক : সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়

মানবকণ্ঠ/এএএম