মানব পাচার: অন্ধকারের বিস্তার ঘটছেই

মামুন রশীদ :
দআমাদের সামনে সম্ভাবনা অফুরন্ত। সামনে সীমাবদ্ধতাও অনেক। তবে এই দুইয়ের মধ্যেই রয়েছে যুক্তি। এই দুইয়ের মধ্যেই রয়েছে আশাবাদ ও আশঙ্কা। এই দুইয়ের মিশ্রণেই এগিয়ে যাওয়া। এগিয়ে যাওয়ার অনুভূতিটা এমন, যেখানে আমরা কেউই পিছিয়ে থাকতে চাই না। সব আশঙ্কাকে তুড়িতে মেরে উড়িয়ে প্রত্যেকেই স্বপ্ন দেখি-সম্ভাবনার। উৎসাহ শুধুই আমাদের সামনের দিকে। কিন্তু সেই সামনের পথটা কেমন? তা কি পিচ্ছিল? তা কি বন্ধুর? তা কি কর্দমাক্ত? না পুরোপুরি মসৃণ? অতিরিক্ত আগ্রহে প্রায়ই আমরা পথের খোঁজ নিতে ভুলে যাই অথবা চোখে আঙ্গুল দিয়ে কেউ পথের বিপদের কথা মনে করিয়ে দিলেও, তাকে ভাবনায় আনি না। অক্লান্তভাবে আমরা শুধু স্বপ্ন দেখি, সেই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে চাই। আর সেই চাওয়া থেকে পথের সন্ধান না করেই পথে বেরিয়ে পড়া। স্বীকার করা ভালো, আমাদের সীমাবদ্ধতার যে প্রাচীর, তা ভাঙার সাধ্য এখনো নাগালের মধ্যে নেই। তবু উৎসাহে সেই প্রাচীর ডিঙানোর স্বপ্ন তারুণ্যের মাঝে। অর্থনীতির যে যান্ত্রিকতা, অর্থের যে দাসত্ব আমাদের মেনে নিতে হয়েছে, সেই অর্থের দিশাতেই আমাদের পথচলা। যেহেতু আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, রয়েছে তার উপযুক্ত ব্যবহারেও ঘাটতি। ফলে, হেথা নয় হোথা নয়, অন্য কোথাওয়ের সন্ধান করতে হয়। আর সেই সন্ধানের পথ যে কতটা বিপদসঙ্কুল, কতটা কণ্টকময়-তা জেনেও গা শিউরে ওঠে।
ব্যক্তির কাছে অর্থের প্রবাহের ঘাটতি থেকেই তৈরি হয় সামাজিক সংকট। এর সুরাহার জন্য মানুষ দেশান্তরী হয়। মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় পুরে- অজানা-অচেনা পথে বেরিয়ে পড়ে। নিজের অস্তিত্বের সংকটকে স্বীকার করে নিয়েই ফুটিয়ে তুলতে চায় পরিবারের অন্য সবার মুখে হাসি। কিন্তু তার জন্য যে কি উদ্বেগজনক, ভয়াবহ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়, চলতি সপ্তাহে-একটি দৈনিকে এমন একজন অসহায় বর্ণনা উঠে এসেছে। স্বপ্নসন্ধানী সেই মানুষটির ভয়াবহ অভিজ্ঞতা- ‘টানা ছয় দিন অনাহার। পাহাড়ের এক জঙ্গল থেকে আরেক জঙ্গলে ছুটছি। আমার মতো আরো অনেকেই। পেছন থেকে আমাদের কুকুরের মতো তাড়া করছিল বন্দুক আর লাঠি হাতে কয়েকজন। আমাদের চলার গতি কমতে থাকলেই বন্দুক বা লাঠি দিয়ে সজোরে আঘাত করা হতো। তাদের দেখানো পথে তাই প্রাণপণ ছুটে চলা। একপর্যায়ে পৌঁছে যাই তাদের আস্তানায়। অন্ধকার গুহা। সেখানে নিয়েই মারধর। টাকার জন্য অকথ্য নির্যাতন। সহ্য করতে পারছিলাম না। গলগল করে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বেরচ্ছিল। তাদের টর্চলাইটের আলোয় দেখতে পাই, ভিতরের একপাশেই পড়ে আছে তিনটি রক্তাক্ত লাশ। একটার ওপর আরেকটা। মারধর আর গগনবিদারী চিৎকারে সেখানে তখন বিভীষিকাময় পরিবেশ। আমাদের সামনে যেন যমদূত সব দাঁড়ানো। আমি নিশ্চিত, আমার মৃত্যু হচ্ছে যখন-তখন। মায়ের মুখটা চোখের সামনে ভাসছিল। বড় ভাই যখন ট্রলারে উঠিয়ে দেন, বারবার বলছিলাম, বিদেশে গিয়েই ফোন দেব। সে কথাও মনে পড়ছিল বারবার। আর ফেরা হবে না বাড়িতে। জঙ্গলেই লাশ পচে-গলে যাবে। “টাকা, টাকা’ বলে ওরা চিৎকার করছিল আর হায়েনার মতো আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিল। শরীরে একটা প্রচণ্ড আঘাত পেয়েই কেমন যেন হয়ে পড়ি। একসময় নিজেকে দেখতে পাই ওই তিনটি লাশের ওপর পড়ে আছি। পরে জানতে পারি, ওরা আমাকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায় লাশের স্তূপের ওপর।’ এই অভিজ্ঞতা একজন ২০ বছরের স্বপ্নবান তরুণের। যিনি সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার ট্রানজিট থাইল্যান্ড জঙ্গলে নির্যাতনের কথা বর্ণনা করেছেন।
বাকরোধ করা নির্যাতনের যে নৃশংস বর্ণনা-এই বর্ণনার সঙ্গে আগেও আমাদের পরিচয় হয়েছে। এর চেয়েও বর্বরতম উপায়ে মানুষকে নির্যাতন ও হত্যার কথাও আমরা জেনেছি। তা আমাদের উদ্বেগের কারণ হয়েছে। আমরা এই অমানবিকতা এই পাশবিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছি। স্বপ্নবান তরুণদের এ রকম করুণ মৃত্যু আমাদের উদভ্রান্ত করেছে। আমরা ভেবেছি কী করে এদের বিভ্রান্ত করে মধ্যযুগীয় কায়দায় মানুষ স্পষ্ট করে তুলছে অস্তিত্বের সংকট। এ রকম অন্যায়ের প্রতিকারের পন্থা নিয়েও কথা হয়েছে অনেক। আইন প্রণয়ন হয়েছে। শাস্তি নির্ধারণ হয়েছে। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হয়নি বরং সামাজিক রোগের মতো মানব পাচারের এই জঘন্যতা ছড়িয়ে পড়ছে। সম্পদ আর সম্পদহীনতার যে রুচিহীন লড়াই, তাকে পুঁজি করে যে দুষ্টচক্র-অমানবিতার এই নখদন্ত দেখিয়ে চলছে, আজ তারা একা নয় বরং অন্য অসংখ্য সিন্ডিকেটের মতো তারাও দাঁড়িয়ে পড়েছে একটি কাতারে। পৃথিবী বিস্তৃত অন্তর্জালের মতো তারা গড়ে তুলছে নিজস্ব ভুবন। যেখানে একজন অপরাধীর বিরুদ্ধে লঘু শাস্তি-সেই জালের কোনো ক্ষতিই করতে পারছে না। এতে দুষ্টচক্রের ভাণ্ডারে জমা হচ্ছে অঢেল অর্থ, তার ভাগ-বিভিন্ন হাতের ফাঁক গলে ছড়িয়ে পড়েছে নানাস্থানে। আর সেই সব উচ্ছিষ্টের লোভে-অশুভ কিন্তু স্থিরবুদ্ধির কুচক্রীরা একে একে স্বপ্নবান তরুণদের ঠেলে দিচ্ছে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে। প্রিয়জনের মুখে হাসি এনে দিতে তারাও সম্পদহীনতা থেকে সম্পদের সন্ধানে মরিয়া হয়ে ছুটছে। সেটি ফাঁদ কিনা, সে পথে কাঁটা আছে কিনা এর সন্ধান তখন আর মুখ্য থাকছে না। কিন্তু যে স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে, যে প্রাণ এমন অবহেলায় শেষ হয়ে যাচ্ছে, তাকে বাঁচানোর দায়িত্ব তো আমাদেরই। সেই দায়িত্ব নিতে হলে মারণাস্ত্রের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে গড়ে ওঠা দুষ্টচক্রের জাল ছিঁড়তে হলে সব মানুষেরই অংশগ্রহণ জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক ও কবি

মানবকণ্ঠ/এসএস