মাতৃভাষা খোদার সেরা দান

মাতৃভাষা খোদার সেরা দানভাষা একটি বাংলা শব্দ। আরবিতে এর প্রতিশব্দ লিসান, ইংরেজিতে ল্যাঙ্গুয়েজ। মাতৃভাষা হলো মায়ের ভাষা। যে ভাষায় জোর করে কোনো কিছু প্রয়োগ করানো যায় না। স্রোতের পানির মতো সে ভাষা অবিরাম চলে চলে পথ করে নেয়। বাঁধ দিতে গেলে বাঁধ টেকে না, স্রোতের তোড়ে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, গতিরোধ করা যায় না। ব্যাকরণ নামক পদ্ধতি দিয়ে যে ভাষা গড়া যায় না বরং ভাষার আদলেই ব্যাকরণ গড়ে ওঠে। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। জনসংখ্যার বিচারে পৃথিবীতে এর স্থান সপ্তম।

মহান রাব্বুল আলামিনের অসংখ্য নেয়ামতরাজির মধ্যে ভাষা অন্যতম। ভাষা ছাড়া মানুষের জীবন অচল। সব জাতির মাতৃভাষা আল্লাহ তায়ালার দান। মানুষের যত জন্মগত অধিকার রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে প্রধান হচ্ছে মাতৃভাষার অধিকার। নির্দ্বিধায় স্বতঃস্ফ‚র্ত চিত্তে স্বাধীনভাবে মনের সুপ্ত অগণিত ভাব ও আবেগ প্রকাশ করার অধিকার। পৃথিবীতে অসংখ্য জীবজন্তু রয়েছে। তারা নিজ নিজ ভঙ্গিমায় মনের ভাব প্রকাশ করে থাকে, কিন্তু কেবল মানবজাতিই অর্থবোধক ধ্বনিসমষ্টি বা ভাষার মাধ্যমে তাদের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে। মানুষকে আল্লাহ সামাজিক জীব করে সৃষ্টি করার কারণে সমাজে পারস্পরিক ভাবের আদান-প্রদানের প্রয়োজন পড়ে এবং এর তাগিদেই ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। সেজন্যই ভাষা হচ্ছে ভাবের বাহন, স্বপ্ন-প্রত্যাশা, আত্মপ্রকাশ ও উজ্জীবনের বাহন।

মানুষের অস্তিত্বের প্রধান তিনটি অবলম্বনই হচ্ছে মা, মাতৃভাষা আর মাতৃভ‚মি। মানুষের জীবন হচ্ছে তার মাতৃভাষা, দেশের ভাষা, জাতির ভাষা। ভাষা সমাজ গড়ে আবার সমাজও ভাষা গড়ে। তাই কোনো জাতির ভাষা দ্বারা তার সভ্যতা ও সংস্কৃতির পরিচয় মেলে। সুতরাং মানব সমাজে ভাষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য আর এ কারণেই মহান রাব্বুল আলামিন মানবজাতির আদি পিতা হজরত আদমকে (আ.) সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন ভাষার মাধ্যমে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনিই তাকে শিক্ষা দিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে’ (সূরা আর রহমান: ৩-৪)। পৃথিবীতে মানব বংশের বিচিত্রতা এবং মানুষের বৈচিত্র্যময় রং, রূপ, দেহ-সৌষ্ঠবের পার্থক্য যেমন মেনে নিতে হয় তেমনি তাদের ভাষার পার্থক্যও মেনে নিতে হয়। ভাষাকে আল্লাহ তায়ালার মহান সত্তাকে চেনাজানা ও তার বিশাল কুদরতকে বোঝার নিদর্শন বলা হয়েছে। কোরানে ইরশাদ হচ্ছে, ‘এবং তার নিদের্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। অবশ্যই এতে রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন’ (সূরা রুম: ২২)। মাতৃভাষা যে আল্লাহ প্রদত্ত জন্মগত অধিকার এ আয়াতটি তার প্রমাণ বহন করে। এজন্য কোনো বিশেষ এলাকার মানুষদের ভাষা-বর্ণের বিচিত্রতার কারণে তাদের অনিষ্ট করার পরিকল্পনাকারীদের ইসলাম প্রত্যাখ্যান করে। ইসলাম নির্দিষ্ট কোনো এলাকার ভাষাভাষী মানুষদের ধর্ম নয়; বরং গোত্র-বর্ণ নির্বিশেষে সব ভাষাভাষী মানুষের ধর্ম।

হজরত আদম (আ.)-এর ভাষা কী ছিল, এ বিষয়ে মতদ্বৈধতা ও অস্পষ্টতা থাকলেও তার ভাষা ছিল এক, কিন্তু স্থান-কাল পাত্রভেদে পরবর্তীতে বিভিন্ন ভাষার উৎপত্তি ঘটেছে। যেমন পরস্পর দুটি জাতি বসবাস করলে তাদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান ও চেনা-জানা হয়। আর সাধারণত নিম্ন জাতি প্রভাবশালী জাতির ভাষা কৃষ্টি, কালচারে প্রভাবিত হয়। পরাভ‚ত জাতি যেমন বিজয়ী জাতির ভাষা গ্রহণ করে, তেমনি বিজয়ী জাতিও বিজিতের ভাষা গ্রহণ করে। এতে ভাষার সংমিশ্রণ ঘটে এবং নতুন ভাষার সৃষ্টি হয়। বাংলা ভাষায়ও বিভিন্ন জাতির ভাষার শব্দের সংমিশ্রণ ঘটেছে। আর এভাবেই যুগে যুগে বিভিন্ন জনপদে ও ভ‚খণ্ডে অজস্র ভাষার উদ্ভব ঘটেছে।

মায়ের সঙ্গে যেমন সন্তানের সম্পর্ক গভীর, মাতৃভাষার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও তেমনি গভীর। মাতৃভাষার সঙ্গে মানুষের স্বভাবগত এবং তা একটি জন্মগত চাহিদা বটে। ইসলাম মানুষের এ স্বভাবগত ও জন্মগত চাহিদার যথেষ্ট মূল্যায়ন করেছে। প্রতিটি জাতির জন্য আল্লাহ তায়ালা স্বীয় পয়গাম বান্দাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য নবী ও রাসুলের এক সুমহান ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করেছেন। পৃথিবীর নানা দেশে নানা ভাষাভাষী মানুষের কাছে এক বা দুই লাখ চব্বিশ হাজার নবী-রাসুলের এক মহাসমারোহ ঘটেছে। আর প্রত্যেক নবী ও রাসুলের ওপর ওহি প্রেরিত হয়েছে তার স্বগোত্রীয় ভাষার মাধ্যমে। যুগে যুগে বিভিন্ন জাতির কাছে প্রেরিত সব নবী-রাসুল নিজ নিজ উম্মতকে যে ওহির বাণী শুনিয়েছেন, তা ছিল তাদের মাতৃভাষায়। কোনো একজন নবীও ভিন্ন কোনো ভাষায় মানুষকে ধর্মের প্রতি আহ্বান জানাননি। এ কারণেই প্রত্যেক নবী-রাসুলের ভাষা ছিল তাদের কওমের তাদের অঞ্চলের মাতৃভাষা। মহান রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘আমি প্রত্যেক রাসুলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে প্রেরণ করেছি, যেন তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে’ (সূরা ইবরাহীম: ০৪)। নবী ও রাসুলগণ যদি সুকৌশলে মানুষদের আল্লাহর পথে নিজ মাতৃভাষায় আহ্বান না করতেন, তাহলে জনসাধারণ তা পূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করতে পারত না। কেননা আহ্বানকারী যদি এক ভাষার হন, আর তার জাতি হয় ভিন্ন ভাষাভাষী, তবে তার ডাকে কেউই সাড়া দেবে না।

আমাদের মহান আদর্শ ও মানবজাতির পথনির্দেশক মহানবী (সা.) ছিলেন স্বীয় মাতৃভাষায় অতুলনীয়। তিনি বলেছেন, ‘আমাকে দান করা হয়েছে সর্বমর্মী বচন’ (মুসলিম: ৫২৩)। কাব্যানুরাগী আরব সমাজে আবির্ভূত রাসুল (সা.) ছিলেন আরবদের সবচেয়ে সুন্দর এবং বিশুদ্ধভাষী। তিনি মাতৃভাষা শুদ্ধ এবং সুস্পষ্টভাবে উচ্চারণ করতেন। তাই মাতৃভাষা শুদ্ধভাবে বলা আমাদের নবীর সুন্নত। সুতরাং যে কোনো জাতির মাতৃভাষা অশুদ্ধভাবে উচ্চারণ করা সুন্নতের পরিপন্থী। হয়তো কেউ কেউ বলবেন রাসুল (সা.) যেহেতু আরবি ভাষী এবং কোরানের ভাষা আরবি, সেহেতু ভাষা অশুদ্ধ বলা সুন্নতের বরখেলাপ, অন্য ভাষাগুলো অশুদ্ধ বলা সুন্নতের পরিপন্থী নয়, এটা একদম সঠিক নয়। কেননা, প্রিয়নবী (সা.) ডান হাত দিয়ে আরবের ফল খেজুর খেয়েছেন। এখন কেউ যদি বলে বাম হাত দিয়ে খেজুর খাওয়া সুন্নতের পরিপন্থী, কিন্তু আম, জাম, লিচু কাঁঠাল ইত্যাদি বাম হাত দিয়ে খেলে সুন্নতের বরখেলাপ নয়, তবে তা ভুল হবে।

মহানবী (সা.) হলেন আরবি ভাষী। মাতৃভাষাকে তিনি এত বেশি ভালোবাসতেন যে, তিনি নিজেই বলেছেন, আমি তিনটি কারণে আরবিকে ভালোবাসি। তার মধ্যে একটি হলো, মাতৃভাষার কারণে। রাসুল (সা.)-এর মাতৃভাষা আরবি বলেই মহান রাব্বুল আলামিন কোরানের ভাষা হিসেবে মনোনীত করেছেন আরবিকে। যেন আরব সমাজের প্রত্যেক মানুষ কোরানের বাণী অতি সহজেই অনুধাবন করতে সক্ষম হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে নবী! কোরানকে আমি তোমার নিজের ভাষায় সহজ করে অবতীর্ণ করেছি, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে (আদ দোখান: ৫৮)।’

ইসলাম এভাবেই নিজ মাতৃভাষাকে যে কোনো বিদেশি ভাষার ঊর্ধে্ব স্থান দিয়েছে। কোনো ভাষারই একক কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সব ভাষাই নিরপেক্ষ। ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব হলো ওই ভাষার উদীয়মান কীর্তিতে। মন্দভাবের পরিচয় ভাষার পরিচয় নয়। আরবিতে মন্দভাবও প্রকাশ করা সম্ভব। ইসলাম বিজয়ের আগে লাত, মানাত, উযযার স্তুতিগান গেয়ে নির্জলা শিরক চর্চা হতো ও অশ্লীল ভাষায় কবিতা চর্চা হতো আরবিতে আবার এই আরবিতেই তাওহিদী বিপ্লব ঘটেছিল। এখনো আরবি ভাষার অনৈসলামিক ভাবধারা চালু আছে। সুতরাং বলা যায়, ভাষার জন্য ইসলাম নয় বরং ইসলামের জন্যই ভাষা। ইসলাম আরবি ভাষার কাছে ঋণী নয় বরং আরবি ভাষাই ইসলামের কাছে ঋণী। ইসলামের উদীয়মান কীর্তিতেই আরবি ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব বেড়েছে। সুতরাং ভাষার কোনো দোষ নেই, বরং এ বৈচিত্র্যময় বিপুল বিশ্বে বিভিন্ন জনপদে নানা ভাষা, বর্ণ ও গোত্রে বিভক্ত মানুষ আল্লাহর অসীম কুদরত ও মহান তাৎপর্যময় শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।

মাতৃভাষা মানুষের জীবনে কত বড় গুরুত্বপূর্ণ, সেদিকের প্রতি লক্ষ্য রেখে মনীষীরা মহামূল্যবান উক্তি প্রদান করেছেন। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন বলেন, ‘প্রত্যেকেরই শিক্ষার মাধ্যম তার মাতৃভাষা হওয়া উচিত। অপর ভাষায় শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষাদান অসম্পূর্ণ শিক্ষারই নামান্তর।’ সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) বলেন, ‘কোনো দেশে দীনি খেদমত করতে আগ্রহী ব্যক্তিকে সে দেশের মানুষের ভাষা ও সাংস্কৃতিক বোধ পূর্ণমাত্রায় আয়ত্ত করতে হবে।’ হজরত আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) তার এক ছাত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, ‘যদি হিন্দুস্তানে দীনি খেদমত করতে চাও, তবে উর্দু ভাষায় যোগ্যতা অর্জন করো।’ এমনি অসংখ্য উক্তি পাওয়া যায় মাতৃভাষার পক্ষে। সুতরাং মাতৃভাষার প্রতি আমাদের প্রেম ও ভালোবাসা থাকতে হবে, মায়ের সঙ্গে সন্তানের ভালোবাসার মতো।

মানবকণ্ঠ/এএম

Leave a Reply

Your email address will not be published.