মাঠে নেমেছে অপরাধীরা প্রস্তুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে মাঠে নেমেছে জাল টাকার নোট চক্র, ছিনতাইকারী ও অজ্ঞান পার্টিসহ অপরাধীরা। সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে টাকা হাতিয়ে নিতে পশুর হাট, টার্মিনাল, ব্যাংকপাড়াসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিচ্ছে এসব অপরাধী। পবিত্র ঈদুল আজহার মৌসুমে কোটি কোটি টাকা ‘নিখুঁত’ জাল নোট রাজধানীসহ সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত এসব জাল নোটের কারবারিরা।

অন্যদিকে রাজধানীর অন্তত দেড় শতাধিক ছিনতাইকারী তথা টানা পার্টি চক্র যথারীতি সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়। তবে এসব অপরাধীদের প্রতিরোধ ও আটকে পাল্টা প্রস্তুতি নিয়েছে পুলিশ ও র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সম্প্রতি এ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করছেন পুলিশ ও র‌্যাবের শীর্ষ কর্মকর্তারা। অপরাধীদের কৌশলের বিপরীতে পাল্টা কৌশল গ্রহণ করে অভিযান চালাতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন শীর্ষ কর্মকর্তারা। এ ছাড়া কোরবানির পশুর হাট ও টার্মিনাল এলাকায় ক্যাম্প গড়ে তুলেছে পুলিশ ও র‌্যাব। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। পাশাপাশি সড়কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে বলেও জানায় গোয়েন্দা সূত্র।

এরই মধ্যে শুক্রবার রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে অজ্ঞান পার্টির ৫৭ জন, জাল নোট চক্রের ৮ জন সদস্য, ৬ মাদক ব্যবসায়ী ও ৮ ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। জাল নোট চক্রটির হেফাজত থেকে ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের জাল নোট আর গ্রেফতার ছিনতাইকারীদের কাছ থেকে ১২টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। এদিকে গ্রেফতার ছিনতাইকারীদের জামিনে মুক্ত করতে নিজেরা ছিনতাইকারী কল্যাণ ফান্ড তৈরির তথ্য পাওয়ার কথা জানিছেন ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. আবদুল বাতেন।

অপরদিকে গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে বেড়ে গেছে জাল নোট চক্রগুলোর ব্যস্ততা। রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকায় জাল নোট তৈরির অন্তত ১২ চক্রে অন্তত শতাধিক কারিগর সক্রিয় রয়েছে। ইতিমধ্যে কোটি টাকার জাল নোট ছাপিয়ে তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোয়ও তা ছড়িয়ে দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত এসব জালিয়াত চক্র। সূত্র মতে, বিশেষ ধরনের পুরু কাগজে ছাপা এসব জাল টাকায় থাকছে জলছাপ ও নিরাপত্তা সুতা। আসল টাকার নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য হিসেবে সাধারণত এসবই লক্ষ্য করে মানুষ। কিন্তু তাতেও এখন আর জাল টাকা চেনার উপায় নেই। দক্ষ কারিগরদের তৈরি নিখুঁত জাল টাকাতেও এসব নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত কোরবানির ঈদ বাজারে বছরের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি টাকা লেনদন হয়। ব্যাংকগুলো প্রচুর টাকার লেনদেন হচ্ছে। আর এই সময়টাকে টার্গেট করে সাধারণ মানুষকে নানা প্রতারণার মাধ্যমে বোকা বানিয়ে টাকা হাতিয়ে নিতে রাজধানীর নিরীহ মানুষদের সঙ্গে মিশে গেছে বিভিন্ন অপরাধীরা।

সংশ্নিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই মুহূর্তে রাজধানীর অন্তত দেড় শতাধিক স্পটে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারীরা। এসব ছিনতাইকারী চক্রের প্রত্যেকটি দলে ৩ থেকে ৫ জন করে সদস্য রয়েছে। পশুর হাটে আশপাশসহ বিভিন্ন স্পটে শিকারের আশায় ওঁতপেতে দাঁড়িয়ে রয়েছে তারা। এদের কেউ কেউ মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার নিয়েও সংশ্নিষ্ট এলাকায় টহল দিতে থাকে। বিশেষ করে ভোর বেলা লঞ্চ, বাস ও ট্রেনে করে যারা ঢাকায় আসছেন কিংবা ঢাকার বাইরে যান তাদের টার্গেট করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ঈদ মৌসুমে যথারীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে অজ্ঞান ও মলম পার্টির সদস্যরা। তারাও পশুরহাট, বিভিন্ন টার্মিনাল ও ব্যাংকপাড়া এলাকায় শিকার অপেক্ষায় সক্রিয় রয়েছে। সুযোগ বুঝে নিরীহ মানুষদের নানা কিছু খাইয়ে অচেতন করে টাকা লুটে নেয়ায়ই তাদের টার্গেট। তবে পুলিশ ও র‌্যাবের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সব ধরনের অপরাধীদের দমন ও নিয়ন্ত্রণে সতর্ক রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রাস্তায় টহল আগের চেয়ে জোরদার করা হয়েছে।

মামলা চালাতে ‘ছিনতাইকারী কল্যাণ ফান্ড’: ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. আবদুল বাতেন জানিয়েছেন, ছিনতাইকারীদের গ্রেফতারের পর আদালতে পাঠায় পুলিশ। সেখান থেকে তাদের জামিনে মুক্ত করতে ও মামলার খরচ চালাতে তৈরি করা হয়েছে ছিনতাইকারী কল্যাণ ফান্ড। ফান্ডের সদস্যরা সবাই ছিনতাইকারী।

তিনি বলেন, ছিনতাইকৃত টাকা ভাগাভাগি করে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা দিয়ে তৈরি হয়েছে কল্যাণ ফান্ড। যে ফান্ডের টাকা ব্যয় হয় সহযোগীদের আদালত থেকে ছাড়িয়ে আনা ও চিকিৎসা কাজে। ছিনতাইকৃত টাকার কল্যাণ ফান্ডে আকার নেহাত কম নয়। এমনই ছিনতাইকারীদের কল্যাণ ফান্ডের হদিস পাওয়া গেছে। ফান্ড থেকে উদ্ধারও করা হয়েছে ৮ লাখ টাকা। যা পুরোটাই ছিনতাইয়ের। এদিকে র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ জানিয়েছেন, সার্বিক নিরাপত্তায় রাজধানী ও বড় শহরগুলোর প্রতিটি বড় পশুর হাটে ক্যাম্প বসিয়েছে র‌্যাব।

এ ছাড়া অন্য হাটগুলোর আশপাশে টহল দেবেন র‌্যাব সদস্যরা। হাটে আসা ক্রেতা ও বেপারিদের নিরাপত্তায় র‌্যাবের সদস্যরা কাজ করবেন। র‌্যাব প্রধান বলেন, এ ছাড়া হাটে মলম পার্টি, ছিনতাই পার্টি ও অজ্ঞান পার্টির সদস্যদের গ্রেফতারে মাঠে আছেন র? র‌্যাবের সদস্যরা।

অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদুর রহমান বলেন, কোরবানির ঈদে বা যেকোনো বড় উৎসবকে ঘিরে অর্থের লেনদেন বেড়ে যায়। এ সুযোগে তৎপর হয়ে ওঠে জাল নোট চক্রসহ বিভিন্ন অপরাধীরা। তাদের প্রতিরোধ ও গ্রেফতারে গুরুত্বপূর্ণ স্পটগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি ও পুলিশ টহল জোরদারসহ প্রয়োজনীয় নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে পুলিশ।

মানবকণ্ঠ/এএএম