মাঠের আন্দোলনে ধীরে চলো নীতি বিএনপির

আগামী একাদশ নির্বাচনকে কিভাবে সুষ্ঠু করা যায় সেদিকেই আগ্রহ বিএনপির। তাদের ধারণা, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু’ হলেই ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে আবার ক্ষমতাসীন হতে পারবে দলটি। এ জন্য নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের পাশাপাশি আরো বেশকিছু ‘স্ট্র্যাটেজি’ নিয়ে দলটি কাজ করছে। এ জন্য মাঠের আন্দোলনে ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করেছে দলটি।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, দলটি মনে করে যে, বতর্মান নির্বাচন কমিশন (ইসি) পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়। তবুও ইসিকে সব ধরনের সহযোগিতা করার কৌশল নিয়েছে বিএনপি। তারা ইসির উদ্যোগে আয়োজিত রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপেও অংশ নেবে। সংলাপে অংশ নিয়ে একাদশ নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার একটি প্রস্তাবনা ইসির কাছে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত রয়েছে দলটির।

বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় রয়েছে। এতে সরকারি মহলের ‘আশীর্বাদপুষ্ট গোষ্ঠীটি’ সারাদেশেই অরাজকতা করে চলেছে। এ কারণে জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে বলে দলটির উদ্যোগে পরিচালিত এক জরিপে উঠে এসেছে।

এদিকে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের হাইকোর্টের আদেশ বহাল রেখে আপিল বিভাগের রায়সহ যে পর্যবেক্ষণ প্রকাশিত হয়েছে, তাতেও ক্ষমতাসীন দলটি বিপদে পড়েছে মনে করছে বিএনপি। কেননা, দলটি বলেছে, তারা এতদিন ধরে ২০১৪ সালের নির্বাচন ও জাতীয় সংসদ নিয়ে যা বলে আসছে, ওই পর্যবেক্ষণে তাই তুলে ধরা হয়েছে। এ কারণে এ রায় পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছেন দলটির আইন বিষয়স সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি বলেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিল, তা বহাল রেখে আপিল বিভাগ তার রায়ে কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। এতে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সংসদ নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘সংসদ অকার্যকর’। এসব পর্যবেক্ষণকে আমরা বিচারবিশ্লেষণ করছি। দেখি এসব নিয়ে কী করা যায়। তেমন কিছু পেলে আমরা দলকে জানাব। দলই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

এ ব্যাপারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এই রায়ে আমাদের বিশেষভাবে উৎফুল্ল হওয়া বা না হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা এ জন্য উৎফুল্ল হয়েছি, আমাদের যে বক্তব্য এই সরকার সম্পর্কে, আওয়ামী লীগ সম্পর্কে, দেশের রাজনীতি সম্পর্কে, এ বিষয়ে রায়ে জনগণের মতামতের প্রতিফলন হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছি। আমরা মনে করি, এই রায়ের ভিত্তিতে সরকারের যদি ন্যূনতম মূল্যবোধ থাকে এবং নৈতিকতার লেশ মাত্র অবশিষ্ট থাকে, তাহলে অবিলম্বে পদত্যাগ করে একটি সহায়ক সরকারের অধীনে অবশ্যই একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে, যেখানে দেশের জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটে।

দলীয় সূত্রগুলো মানবকণ্ঠকে জানিয়েছে যে, দেশের রাজনীতির সবকিছুই এখন বিএনপির অনুকূলে। তাই বিএনপি এমন কিছু করবে না, যাতে এই অনুকূল পরিবেশ প্রতিকূলে চলে যায়। দলটি এজন্য মাঠের আন্দোলনের ব্যাপারে ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করেছে। তারা চায় না অযথা মাঠ গরমের নামে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আরো মামলা দিতে সরকার সুযোগ পাক। তার চেয়ে বরং আগামী নির্বাচনকে কিভাবে সুষ্ঠু করা যায়, সেই বিষয়ে জনমত সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন কৌশল প্রণয়নকে অগ্রাধিকার দিতে চায় দলটি।

বিএনপি এই কৌশলের অংশ হিসেবে তার প্রতি সহানুভূতিশীল বুদ্ধিজীবীদের ইতিমধ্যেই মাঠে নামিয়েছে। বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ সম্প্রতি এক গোলটেবিল বৈঠকে দাবি তুলেছেন আগামী একাদশ নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ (সবার জন্য সমান সুযোগ) তৈরি করার। তিনি মনে করেন, এই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির জন্য সংসদ বিলুপ্ত করা ও নির্বাচন পর্যন্ত বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মামলা স্থগিত রাখা প্রয়োজন। বিএনপিপন্থি অন্য বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীর একই দাবি তুলছেন।

এদিকে বিএনপি নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা উপস্থাপন করবে। লন্ডন থেকে ফিরেই বেগম খালেদা জিয়া এই রূপরেখা দেবেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়াও বিএনপি ইসির উদ্যোগে আয়োজিত সংলাপে অংশ নিয়ে যে দাবিনামা দেবে তাতে রয়েছে, ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও নতুন ভোটার তালিকায় যোগ্য সব নাগরিক, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, কারাবন্দি এবং মামলায় আক্রান্ত নেতাকর্মীদের ভোটার করার প্রস্তাব থাকবে। এতে নির্বাচনের সময়ে প্রতিরক্ষাবাহিনী মোতায়েন ও তাদের ম্যাজিস্ট্রিয়াল (বিচারিক) ক্ষমতা প্রদান, দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক নিয়োগ, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পূর্বে নির্বাচনী পর্যবেক্ষক সংস্থাকে দেশের প্রচলিত আইনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্বারা নিবন্ধিত হওয়ার প্রস্তাব থাকবে। প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলের প্রকাশ্যে আনুগত্য পোষণকারী কোনো প্রতিষ্ঠানকে পর্যবেক্ষক করা যাবে না বলেও উল্লেখ থাকবে। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী কিংবা দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশকারী ব্যক্তি নির্বাচন পর্যবেক্ষক হতে পারবেন না।

আরো থাকবে, তফসিল ঘোষণার পর মাঠ প্রশাসনে বদলির এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের। বিগত পাঁচ বছরে যেসব কর্মকর্তা জেলা ও উপজেলায় কাজ করেছেন, তাদের নতুন এলাকায় বদলি করতে হবে। নির্বাচন কমিশন একটি কমিটি গঠন করবে, যারা ২০০৮ ও ২০১৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে এমন সব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার করতে পারবে।

বিএনপি নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তাদের বিচারিক ক্ষমতা দেয়ারও প্রস্তাব করবে। এই প্রস্তাবে আরো থাকবে, ইসির সচিবালয়ের আর্থিক স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। ভোটগ্রহণের সময় ব্যালট বাক্স পরিপূর্ণ হয়ে গেলে তা পোলিং বুথেই রাখতে হবে। ভোট গ্রহণের পর খালি ব্যালট বাক্স যদি থাকে তা নিরাপদে রাখতে হবে।

নির্বাচনের সময় কয়েকটি মন্ত্রণালয় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কাজ করবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এমনটাও বিএনপির প্রস্তাবে তুলে ধরা হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশনকে কী ধরনের প্রস্তাব দেব, তা দেয়ার পরই সবাই জানতে পারবে। আমাদের নেত্রী একটি রূপরেখা দেবেন, এটা আগেই ঘোষণা করা আছে। সেই মোতাবেকই আমরা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা বলব।

মানবকণ্ঠ/এসএস