মাটির উর্বরা শক্তি হ্রাস: কৃষির জন্য উদ্বেগজনক বার্তা

আজিজুর রহমান :
বাংলাদেশের আবাদযোগ্য ৮৫ শতাংশ জমির উর্বর শক্তি কমে যাচ্ছে। বরেন্দ্রভূমি, মধুপুর, মেঘনা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা ও গ্যাঙ্গেয় পলল ভূমি অঞ্চলের আবাদি জমির মাটি এখন আর আগের মতো উৎপাদনক্ষম নেই। মাটির জৈব উপাদানের (বায়োলজিক্যাল কম্পোনেন্ট) ঘাটতি তো রয়েছেই সেই সঙ্গে অম্লত্ব বা এসিডিটির হেরফের ঘটায় বেড়েছে মাটির পুষ্টি ঘাটতিও। দেশের ৮৩ লাখ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ৩৩ লাখ হেক্টর জমির পুষ্টিমান (নিউট্রিশন ভ্যালু) খুবই করুণ। উদ্ভিদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ১৭টি রাসায়নিক যোগ উপাদানের মধ্যে ১৪টি উপাদানই মাটি থেকে পেয়ে থাকে। সারাদেশের মাটিতেই এসব উপাদানের কম-বেশি ঘাটতি রয়েছে। তবে আশঙ্কাজনক ঘাটতি রয়েছে জিংকের ৩ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে। ফসফরাসের ঘাটতি রয়েছে ৮ লাখ ৪৪ হাজার হেক্টর জমিতে, সালফার ঘাটতি রয়েছে ৭ লাখ ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে, বোরন ঘাটতি রয়েছে ৩০ লাখ হেক্টর জমিতে এবং পটাশিয়াম ঘাটতি রয়েছে ৬৭ লাখ হেক্টর জমিতে। উল্লেখযোগ্য যে, একমাত্র জিংকের অভাবেই ফলন কমে যাচ্ছে অন্তত ৩০ শতাংশ।
প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাওয়া এসব রাসায়নিক যোগের সুষম ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় পুষ্টি উপাদানে অসমতা দেখা দিয়েছে। আর এটা হয়েছে আমাদের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য জোগান দিতে গিয়ে বিরামহীন নিবিড় উফশীর চাষাবাদ, সংবেদনশীল হাইব্রিড বীজ ব্যবহার এবং রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অপরিমিত ও অসম প্রয়োগ অর্থাৎ অপরিকল্পিত কৃষি ব্যবস্থাপনা চালিয় যাওয়ার মতো অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের জন্য। আমরা যে অনুপাতে মাটিকে ব্যবহার করছি সে অনুপাতে মাটির যত্ন না নেয়ায় মাটির জৈব উপাদানের ঘাটতিসহ পুষ্টিগুণ কমে যাওয়ায় মাটির এই দুরবস্থা। এদিকে মাটির কিছু ভৌত গুণও নষ্ট হয়ে যেতে শুরু করেছে। ফলে মাটির অম্লত্বের হেরফেরের কারণে পুষ্টি উপাদানে অসমতা দেখা দিয়েছে। দুই দশক আগেও উত্তরাঞ্চলে খুবই উন্নতমানের প্রচুর ডাল উৎপন্ন হতো। এই অঞ্চলের মাটিতে অম্লত্ব কমে যাওয়ায় এখানে এখন আগের মতো আর ডাল উৎপন্ন হয় না। মাটিতে জৈব উপাদানেরও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মাটিতে যেখানে জৈব উপাদন থাকা প্রয়োজন ৩ থেকে ৫ শতাংশ সেখানে এখন এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ শতাংশেরও কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জমিতে ২ শতাংশের কম জৈব উপাদান থাকা চাষের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা জানান, ১০ টন চাল উৎপাদনের জন্য মাটির ৩৫০ কেজি নিউট্রিশন ভ্যালু বা পুষ্টিগুণ ব্যয় হয়। এ হিসাবে আবাদি জমি থেকে প্রতি বছর ২ মিলিয়ন টন পুষ্টি হারিয়ে যাচ্ছে। সার ও কীটনাশক এ দুটি রাসায়নিক দীর্ঘদিন মাটিতে পড়ে থেকে মাটির গুণাবলির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে এবং মাটির উপকারী জীবাণু ধ্বংস করে চলেছে।
আমরা জানি ১ কেজি উর্বর মাটিতে সর্বোচ্চ ২ ট্রিলয়ন ব্যাকটেরিয়া, ৪০০ মিলিয়ন ছত্রাক, ৫০ মিলিয়ন শ্যাওলা, ৩০ মিলিয়ন প্রোটোজোয়াসহ বেশ কিছু ক্ষুদ্র ও বড় অণুজীব বাস করে। মাটিতে বায়ুমণ্ডলীয় নাইট্রোজেন সংযোজনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটনে এদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এদের মেরে ফেলছে। ফলে মাটি শক্ত হয়ে উর্বরতা হারিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নিবিড় চাষাবাদ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে আবাদি জমিতে প্রায় ৬ কোটি টন জৈব সারের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বলছে, জমিতে মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারে সাময়িকভাবে উৎপাদন বাড়লেও জমির ভবিষ্যৎ ও পরিবেশ ক্রমান্বয়েই বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আর খাদ্য শস্যে থাকছে বিষক্রিয়া। মাটিকে বাঁচিয়ে রেখে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। বিকল্প হিসেবে জৈব সার ও কীটনাশকের মাধ্যমে চাষাবাদ করতে হবে।
লেখক: পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য গবেষক

মানবকণ্ঠ/এসএস