মহাজোট দ্বন্দ্বে আওয়ামী লীগের প্রার্থী অনেক, জাপার এরশাদ

মহাজোট দ্বন্দ্বে আওয়ামী লীগের প্রার্থী অনেক, জাপার এরশাদ

একাদশ সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ আসনের (সদর-সিটি) প্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। অন্যদিকে, মহাজোট দ্বন্দ্বে আওয়ামী লীগের প্রার্থী অনেক, তবে জনপ্রতিনিধির অভিজ্ঞতা আছে এমন প্রার্থী মাত্র একজন। সূত্র মতে, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এ আসনে পরপর চারবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। অষ্টম সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন তার ভাই দলের কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের। আগামী নির্বাচনে এ আসনেই লড়বেন এরশাদ। ১৮ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে এরশাদ বলেন, আমি কোরবানির ঈদ রংপুরে করি। এবার আর একটা নতুন এডিশন। সেটা হলো আজ থেকে আমার নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হলো। ছোট ভাই পার্টির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের, মহাসচিব এবিএম রুহুম আমীন হওলাদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়া উদ্দিন বাবলু, মেজর (অব.) খালেদ আখতার সবাইকে নিয়ে এসেছি নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করার জন্য। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ায় ফুরফুরে মেজাজে আছেন জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, এ আসনে আওয়ামী লীগের শক্ত প্রার্থী থাকলেও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আগের মতো সহজেই নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে আসবেন।

অন্যদিকে বিরোধী পক্ষের আওয়ামী লীগ নেতারা দাবি করছেন, কয়েক দফায় জাতীয় পার্টির এমপি নির্বাচিত হওয়ার পরও এলাকার কোনো উন্নয়ন হয়নি। বেশিরভাগ সময় এমপি ঢাকায় থাকেন। সুখ-দুঃখে কাছে পাওয়া যায় না। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির জোট থাকার কারণে বরাবরই আওয়ামী লীগ রংপুর সদর আসন এরশাদকে ছেড়ে দেয়। এ কারণে নেতাকর্মীরা বিক্ষুব্ধ। তারা চাইছেন, এককভাবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দিয়ে সদর-৩ আসন দখল করতে। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য চৌধুরী খালেকুজ্জামান মহাজোট হোক বা না হোক সেদিকে না তাকিয়ে রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী হতে তৃণমূলে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। কয়েকটি মানববন্ধন ও সমাবেশ করে দলীয় প্রার্থীর দাবি জানিয়েছেন। নিজ নামে সেঁটেছেন বড় বড় ব্যানার ও পোস্টার। এ আসনে আওয়ামী লীগের অন্যতম মনোনয়ন দাবিদার সদর উপজেলা চেয়ারম্যান নাছিমা জামান ববি। তিনি উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিপুল ভোটে জয়লাভ করার পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের ঘরের প্রার্থী হয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। সদর উপজেলার উন্নয়নে অবদান রাখায় তাকে ঘিরে জনপ্রিয়তার একটি ঢেউ সৃষ্টি হয়েছে। জনগণবান্ধব জনপ্রতিনিধি হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয় এ আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, সবার আগে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়া। এ ক্ষেত্রে মহাজোট বহাল থাকলে কেন্দ্রীয় নির্দেশ মেনে নেব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত আছি। অচ্ছুত্ কোনো কারণে মহাজোট ছিঁড়ে গেলে দলীয় মনোনয়ন চাইব। জনপ্রতিনিধির অভিজ্ঞতা আছে বলে এটি আমার অধিকার।

তিনিসহ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবির) পরিচালক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম, মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক রেজাউল ইসলাম মিলন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, অ্যাডভোকেট হোসনে আরা লুত্ফা ডালিয়া এমপি। দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আমি প্রচারণায় নেমেছি অনেক আগেই। সিটি নির্বাচনের ফলাফল সদর আসনে কোনো প্রভাব ফেলবে না। দলীয় মনোনয়ন পেলে নৌকা প্রতীকের বিজয় সুনিশ্চিত। এ আসনজুড়ে নৌকার গণজোয়ার উঠেছে। রেজাউল ইসলাম মিলন বলেন, ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছি। জেল জুলুম নির্যাতন সহ্য করেছি। নেত্রীর কাছে এবার মনোনয়ন চাইব। মেট্রোপলিটন চেম্বার গঠন করে আমি তার দায়িত্বে আছি। একজন সচেতন নাগরিক ও সৎ ব্যবসায়ী হিসেবে আমার ব্যক্তি ইমেজ সম্পর্কে সবাই জানে। মনোনয়ন নিশ্চিত হলে বিজয় ও নিশ্চিত করেই ঘরে ফিরব।

অন্যদিকে, বিএনপির প্রার্থী হিসেবে কে দলীয় মনোনয়ন পাবেন তা এখনো নিশ্চিত নয়। রংপুর বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই দুর্বল। মামলা ও পুলিশি ধরপাকড়ে প্রায় নাজেহাল অবস্থা দলটির নেতাকর্মীদের। এ কারণে নির্বাচনী প্রচারণায় পোস্টার কিংবা ব্যানার ফেস্টুন সাঁটায়নি কেউ। তবে শোনা যাচ্ছে, রংপুর মহানগর সভাপতি মোজাফফর হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মিজু, কাওছার জামান বাবলা, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রইচ আহমেদ, সামসুজ্জামান সামু এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম মণ্ডল এ ক’জনের মধ্যে যে কেউ প্রার্থী হতে পারেন। বিএনপির একাধিক নেতা একই সুরে বলেন, রংপুর বিএনপি আগের দুরবস্থা কাটিয়ে আমরা নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের অপকর্ম, অনিয়ম, দুর্নীতি, খুন, ধর্ষণে জনগণ আজ অতিষ্ঠ। তারা আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনবে এ আমাদের বিশ্বাস।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রংপুরের দৃশ্যমান সব উন্নয়ন করেছেন আওয়ামী লীগের আলোকবর্তিকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই বেড়েছে কর্মী সমর্থকদের সংখ্যা। বেড়েছে জনপ্রিয়তা। বিভাগীয় শহরের এই সদর আসনটি আওয়ামী লীগ নিজ ঘরে রাখতে পারলে বিভাগজুড়ে আওয়ামী লীগ আরো সুসংগঠিত হবে। তাই আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে আসনটি পেতে যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দিলে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে জাতীয় পার্টি।

অন্যান্য দলের মধ্যে এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন জাসদ নেতা (আম্বিয়া-প্রধান) সাব্বির আহমেদ, জেলা কমিউনিস্ট পার্টির প্রবীণ নেতা শাহাদাত হোসেন, বাসদের জেলা সমন্বয়ক আবদুল কুদ্দুস, ইসলামী আন্দোলনের এটিএম গোলাম মোস্তফা, জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী মাজিরুল ইসলাম লিটন, জেলা নাগরিক ঐক্যের সদস্য সচিব রেয়াজ উদ্দিন, এবং জাসদের (ইনু) কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা ও সাবেক জেলা সভাপতি ডা. একরামুল হোসেন স্বপন।

বিভাগীয় শহর রংপুর। সিটি কর্পোরেশন ও সদর উপজেলা মিলে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ ভোটার নিয়ে রংপুর-৩ (সদর-সিটি) সংসদীয় আসনটি তাই নানান কারণে সব দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রায় নিশ্চিত যে, জোটবদ্ধ নির্বাচন হলে এবারো এ আসন জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিতে হবে মহাজোটের আওয়ামী লীগকে। তখন একট্টা হয়েই ভোটের রাজনীতি জমে উঠবে।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.