মফস্বলে হলুদ সাংবাদিকতা

হলুদ সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য হলো সাংবাদিকতার রীতিনীতি না মেনে যেভাবেই হোক পত্রিকার কাটতি বাড়ানো বা টেলিভিশন চ্যানেলের দর্শকসংখ্যা বাড়ানো। অর্থাৎ হলুদ সাংবাদিকতা মানেই ভিত্তিহীন সংবাদ পরিবেশন, দৃষ্টি আকর্ষণকারী শিরোনাম ব্যবহার করা, সাধারণ ঘটনাকে একটি সাংঘাতিক ঘটনা বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা, কেলেঙ্কারির খবর গুরুত্ব সহকারে প্রচার করা, অহেতুক চমক সৃষ্টি ইত্যাদি। কিন্তু আমার ভাষায় সোজাসাপ্টা বলতে গেলে ‘সাংবাদিক বা সংবাদকর্মী অথবা সংবাদ ও সংবাদ সংস্থার সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি যদি স্বীয় উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সংবাদ পরিবেশন করেন বা পরিবেশন করবে বলে কাউকে ভয়-ভীতি দেখায় সেটাই হলুদ সাংবাদিকতা’।
হলুদ সাংবাদিকতার জš§ হয়েছিল সাংবাদিকতা জগতের অন্যতম দুই ব্যক্তিত্ব যুক্তরাষ্ট্রের জোসেফ পুলিৎজার আর উইলিয়াম রুডলফ হার্স্টের মধ্যে পেশাগত প্রতিযোগিতার ফল হিসেবে। এই দুই সম্পাদক তাদের নিজ নিজ পত্রিকার ব্যবসায়িক স্বার্থে একে অপরের অপেক্ষাকৃত যোগ্য সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত কর্মচারীদের অধিক বেতনে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিলেন। এক পর্যায়ে ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির চাঞ্চল্যকর খবর ছেপে তারা পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর চেষ্টা করেন। পুলিৎজারের নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ড ও হার্স্টের নিউ ইয়র্ক জার্নালের মধ্যে পরস্পর প্রতিযোগিতা এমন এক অরুচিকর পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতার পরিবর্তে পত্রিকার বাহ্যিক চাকচিক্য আর পাঠকদের উত্তেজনা দানই তাদের কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।
আমাদের দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে মফস্বলে হলুদ সাংবাদিকতার কিছু কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। বিভিন্ন খ্যাত-অখ্যাত সাংঘাতিক সাংবাদিকদের ঘুমন্ত জবানবন্দি, আচার-আচরণ ও কর্মকাণ্ডে যে বিষয়গুলো হলুদ সাংবাদিকতার কারণ হতে পারে- স্থানীয় ও জাতীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের থেকে প্রভাবমুক্ত না থাকা। দেশের স্বনামধন্য জাতীয় পত্রিকাগুলোর সবচেয়ে খারাপ দিক হলো তারা মফস্বলে থাকা সংবাদকর্মীদের দিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করায় ঠিকই কিন্তু দীর্ঘদিন কাজ করার পরও তারা কাজের স্বীকৃতি বা আইডি কার্ড দিতে চায় না। আইডি কার্ড চাইলেই নানা টালবাহানা করে। লেখা ভালো না, তুমি অ্যাক্টিভ না নানা কথা বলে সংবাদকর্মীর মন ভেঙে ফেলে। তখন সেই সংবাদকর্মী বা সাংবাদিক বাধ্য হয়ে টাকার বিনিময়ে সাংবাদিকতার কার্ড হাসিল করেন। এখান থেকেই শুরু হয় দেয়া-নেয়ার খেলা।
কিছু পত্রিকা বাদে পত্রিকা অফিসেই কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী আছে যাদের যন্ত্রণায় মফস্বল সাংবাদিকরা অফিসে যেতে রীতিমতো ভয় পায়। এমনকি কোনো সংবাদ পাঠালে তা প্রকাশও হয় না। তবে মজার বিষয় হলো- মফস্বল সম্পাদককে কিছু খরচা-পাতি দিলেই কাজ হয়ে যায়। নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ হয়। অবশেষে এই অসৎ পন্থাই অবলম্বন করতে হয় অনেককে। এমন আরো অনেক ঘটনা আছে।
সাংবাদিকতার ওপর প্রয়োজনীয় শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ না থাকায় নয়া পুরান অনেক মফস্বল সাংবাদিকই সংবাদ সংগ্রহ, সম্পাদনা ও প্রেরণে নানাবিধ সমস্যায় উপনীত হোন। ডিজিটাল এই যুগে অনেকেই দ্রুত সংবাদ পরিবেশনের জন্য ভুলভাল তথ্য ও শিরোনামে সংবাদ পরিবেশন করে থাকেন। এই ধরনের সাংবাদিকতা সমাজের হুমকিস্বরূপ। এই ধরনের অপসাংবাদিকতা থেকে বিরত থাকাই কাম্য। একটা ভুল সংবাদে কারো জীবন নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে যাচাই-বাছাই করে একটু দেরিতে সংবাদ উপস্থাপন করলে সংবাদের গ্রহণযোগ্যতাও দ্বিগুন বেড়ে যাবে। সাংবাদিকতায় পেশাগত দক্ষতা না থাকলে দায়িত্ব জ্ঞানও থাকে না। তাই সে নিজের অজান্তেই অপসাংবাদিকতা চর্চায় লিপ্ত হয়।
মফস্বল থেকে দ্রুত সংবাদ পরিবেশনের প্রতিযোগিতা সুষ্ঠু ও নীরপেক্ষ সাংবাদিকতার জন্য সবচেয়ে বেশি ভয়ানক। কারণ এ ক্ষেত্রে সাংবাদিক সরেজমিন যাচাই-বাছাই না করে উড়ো খবরের ভিত্তিতে দ্রুত সংবাদ পরিবেশনের জন্য সংবাদ উপস্থাপন করে থাকেন। কিন্তু যাচাই-বাছাই করে সংবাদ পরিবেশন করাই হলো একজন দক্ষ ও পেশাদার সাংবাদিকের নৈতিক দায়িত্ব।
মফস্বলের সাংবাদিকরা বেশিরভাগই স্থানীয়। পেশাগত কাজের স্বার্থে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজনের সঙ্গে উঠা-বসা ও সুসম্পর্কের সুবাধে অনেক মফস্বল সাংবাদিকই এলাকায় আদিপত্য বিস্তার করতে চায়। সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে অনেকেই স্থানীয় ঠিকাদারিও করে থাকেন। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো মফস্বলের অনেক সাংবাদিকের বিরুদ্ধেই এলাকায় মাদক বিক্রি বা সহযোগিতার অভিযোগ আছে। অনেকে হাতেনাতে ধরা খেয়ে দুই-এক বছর জেল খেটে আবার সাংবাদিকতা পেশায় এসেছে এমন নজীরও আছে।
মফস্বলের অপসাংবাদিকতা দিনকে দিন বেড়েই যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সাংবাদিকদের প্রতি মানুষের সর্বনি¤œ শ্রদ্ধাটুকুও থাকবে বলে মনে হয় না। তাই আজ একটাই সেøাগান ‘অপসাংবাদিকতা দূর হোক, সাংবাদিকতার জয় হোক’।