মনোনয়ন দৌড়ে বিতর্কিতরা!

পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন নেয়ার জন্য স্থানীয় নেতাদের পেছনে দৌড়াচ্ছে বিতর্কিতরা! তাদের তৎপরতা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সারাদেশে তৃণমূল আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মী। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ বিব্রত বলে জানিয়েছে আওয়ামী লীগের একটি প্রভাবশালী মহল। তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধীর বিচারে বদ্ধপরিকর। উপজেলা নির্বাচনে মাদক ব্যবসায়ী ও যুদ্ধাপরাধীর আত্মীয়দের তৎপরতা দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছেন আওয়ামী লীগের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য গতকাল মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ করলে যে কেউ মনোনয়ন চাইতে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, মাদক ব্যবসায়ী ও যুদ্ধাপরাধীর আত্মীয়রা মনোনয়ন চাইবে।’ কারা কারা মনোনয়ন চাইছেন এ ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই নেতা বলেন, ‘কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হলে সঙ্গে সঙ্গে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ী ও যুদ্ধাপরাধীর আত্মীয়দের কে কে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে সেই ব্যাপারে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। কেউ যদি এদের পক্ষে অবস্থান নেন তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এদিকে গত বছর ‘চলো যাই যুদ্ধে মাদকের বিরুদ্ধে’ এমন স্লোগানে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে সরকার। এ অভিযান সব মহলের নজর কেড়েছে। টনক নড়েছে মাদক সম্রাটদের। আত্মগোপন, দেশত্যাগসহ নানাজন নানাভাবে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন।

টানা তৃতীয়বার সরকার গঠনের পর মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। এরই মধ্যে তিন শ্রেণির মাদককারবারির তালিকা প্রণয়নে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দা বাহিনী।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের একটি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে তিনজনের নাম পাঠিয়েছে জেলা আওয়ামী লীগ। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কাছে দেয়া ওই তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও বর্তমান চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর খান চৌধুরী। তালিকায় আরো আছেন অ্যাডভোকেট এমএ বারী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মুহাম্মদ আবু তাহের। মনোনয়ন তালিকায় ১ নম্বরে থাকা জাহাঙ্গীর খানের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, ২০১৮ সালের ৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বিভাগের কয়েকটি জেলার অবৈধ মাদক চোরাকারবারি-পাচারকারি, এদের পৃষ্ঠপোষক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জড়িত সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়া হয়। এর মধ্যে কুমিল্লা জেলার অবৈধ মাদক ব্যাবসায়ী-চোরাকারবারিদের পৃষ্ঠপোষক-আশ্রয়-প্রশ্রয়দানকারী ১৬ জনের নামের তালিকা ছিল। তালিকার ১২নং ক্রমিকে জাহাঙ্গীর খান চৌধুরীর নাম উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) জাহাঙ্গীর খান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ব্রাক্ষণপাড়া উপজেলায় মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ আছে।

২০১৮ সালের ১৩ আগস্টে এ অভিযোগ গ্রহণ করে দুদক। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর খান চৌধুরী বলেন, ‘এসব অভিযোগ মিথ্যা। আমাকে ঘায়েল করার জন্য এগুলো করা হয়। উপজেলা পরিষদ থেকে বর্ডার ৩/৪ মাইল দূরে। মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নাই।’

অপরদিকে কেন্দ্রের নির্দেশ অমান্য করে তৃণমূলের মতামতের তোয়াক্কা না করে আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নিজের আত্মীয়স্বজনের নাম পাঠিয়েছেন কক্সবাজারের বহুল আলোচিত আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আব্দুর রহমান বদি। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রতিটি জেলা-উপজেলা ও স্থানীয় এমপিদের প্রতি নির্দেশনা আছে যে প্রার্থীর তালিকা নির্ধারণে তৃণমূলের মতামতকে প্রাধান্য দিতে হবে। কোনোভাবেই এমপি-মন্ত্রী বা জেলার প্রধান নেতাদের আত্মীয়স্বজন ও পরিবারের লোকদের নাম পাঠানো যাবে না। কিন্তু কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলায় কেন্দ্রের এ নির্দেশ মানেননি সাবেক এমপি বদি ও বর্তমান এমপি বদির স্ত্রী শাহানা আক্তার বদি। উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে বদি ও তার স্ত্রী বর্তমান এমপি শাহানা কেন্দ্রে যে তালিকা পাঠিয়েছেন তাতে ঠাঁই পেয়েছে বর্তমান এমপির আপন চাচা হামিদুল হক চৌধুরী, এমপির আপন বড়ভাই হুমায়ন কবির চৌধুরী মন্টু ও উখিয়ার হলদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহ আলমের নাম। আর তৃণমূলের ভোট ছাড়া বা মতামত ছাড়া এসব নামের তালিকা করেছেন বদি ও তার স্ত্রী।

এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক বরাবর অভিযোগ জমা দিয়েছেন ২০১৪ সালে তৃণমূলের ভোটে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আবুল মনসুর চৌধুরী। আবুল মনসুর চৌধুরী এ প্রতিবেদককে অভিযোগের বিষয়ে বলেন, ‘বিগত ১৪ সালে তৃণমূল ভোটে উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে আমি সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে কেন্দ্রের মনোনয়ন পাই। কিন্তু মনোনয়ন পাওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে সাবেক এমপি বদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওই সময়ও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত তার স্ত্রীর আপন বড়ভাই অধ্যক্ষ হুমায়ন কবির চৌধুরীকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়। আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিলেও জেলা আওয়ামী লীগের অনুরোধে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াই।

মনসুর বলেন, ‘হুমায়ন কবির উখিয়ার বঙ্গমাতা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষক হিসেবে এখনো কর্মরত। একজন সরকারি চাকরিজীবী দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন করতে পারেন না। তাছাড়া তিনি সারাজীবন প্রতিপক্ষ বিএনপির রাজনীতি করেছেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসায় বিগত তিন/চার বছর ধরে হঠাৎ আওয়ামী লীগার বনে গেছেন।

এছাড়া তালিকায় যাকে প্রথমে রাখা হয়েছে তিনিও বঙ্গমাতা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত আছেন। উনি (হামিদুল হক চৌধুরী) বদির স্ত্রী বর্তমান এমপি শাহানা আক্তার বদির আপন চাচা। সর্বশেষ রাখা নাম শাহ আলম মন্ত্রিপরিষদ সচিবের আপন ছোটভাই।

আবুল মনসুর অভিযোগ করেন, ‘বদির শ্বশুর মরহুম আব্দুল করিম শান্তি কমিটির নেতা ছিলেন। তাদের পরিবারের কেউ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। বিগত সময়ে তারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। এখন দলের সুবিধাজনক সময় দেখে এরা হঠাৎ আওয়ামী লীগার বনে গেছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক যখন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বাহলুল মজনু চুন্নু সাধারণ সম্পাদক সে সময় ওনাদের কমিটির কর্মী ছিলাম। এ ছাড়া ১৯৭৭ সালে কক্সবাজার কলেজ শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলাম। ‘৭৮ সালে কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে ৮২ সাল পর্যন্ত দায়িত্বপালন করি। ‘৮৫ সালে উখিয়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে ’৯২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করি।’ তিনি বলেন, ‘এসব তথ্যভিত্তিক অভিযোগ আমি নিজের হাতে আমাদের দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের হাতে জমা দিয়েছি। এ ছাড়া দলের অভিযোগ সেলেও জমা দিয়েছি।’

অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন জন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামীর আমির প্রয়াত গোলাম আযমের নিকটাত্মীয় হাবিবুর রহমান স্টিফেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় জন্য জেলা আওয়ামী লীগ তার একক নাম পাঠিয়েছে।

স্থানীয় নেতাদের অভিযোগ, তাদের মতামতকে উপেক্ষা করেই গোলাম আযমের নিকটাত্মীয়কে আওয়ামী লীগের প্রার্থী করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মী। এসব অভিযোগ প্রার্থীরা অস্বীকার করলেও অকাট্য প্রমাণসহ জমা দেয়া হয়েছে।

জেলা আওয়ামী লীগ কেন্দ্রের কাছে পাঠানো তালিকায় প্রার্থীদের নামের সঙ্গে বিবরণী ও মন্তব্য লিখে তা তালিকার সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছে। তাতে দেখা গেছে- খান মো. আবু বকর সিদ্দিক সম্পর্কে মন্তব্যের ঘরে লেখা হয়েছে- ‘প্রকাশ থাকে যে- খান মো. আবু বকর সিদ্দিক যুদ্ধাপরাধী পরিবারের সদস্য। তার দাদা মৃত অন্নাত আলী খান মির্জাগঞ্জ থানা শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন। তার বাবা আবুল হাশেম খান জাতীয়তাবাদী দল মির্জাগঞ্জ উপজেলার সহসভাপতি ছিলেন। তিনি (খান মো. আবু বকর সিদ্দিক) নিজেও ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছাত্রদলের সভাপতি পদ না পাওয়ায় সে ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ করে। ২০১৪ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. শাজাহান মিয়া বলেন, ‘এটা উপজেলা আওয়ামী লীগ থেকে সেটা এসেছে সেটাই আমরা পাঠিয়ে দিয়েছি। আমার বিশ্বাস এ ঘটনা সত্য। কারণ সেখানকার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ নেতারা মিলেই এটাই করেছে। আমরা সেখান থেকে যা পেয়েছি তাই পাঠিয়েছি। এ ছাড়া গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয় আব্দুল লতিফ প্রধানকে। প্রধানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধী মোজাজ্জেল হক প্রধানকে মোফা রাজাকারকে বাঁচাতে এবং তদন্ত কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি ও সাক্ষীদের হুমকিদাতা হিসেবে তিনি কাজ করছেন। তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড কেন্দ্রীয় কমিটি। সংগঠনের সভাপতি মেহেদী হাসান গতকাল মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘যারা আওয়ামী লীগ করে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে সাহায্য করে তাদের দল যদি মনোনয়ন দেয়, এটা কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না।’

মানবকণ্ঠ/এআর