মধুলোভী পাখি সিঁদুরে মৌটুসি

বাবার রেখে যাওয়া লেবু বাগানটির অস্তিত্ব নেই এখন আর। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাগানটির সমাধি ঘটেছে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল। লেবু গাছগুলোর ভরা যৌবনে দেখেছি, (ফুল ফুটলে) মৌমাছি এবং মধুলোভী ছোট পাখিদের আনাগোনা বেড়ে যেত প্রচুর। হরেক প্রজাতির পাখিদের মধ্যে দেখতাম ‘সিঁদুরে মৌটুসি’র অনাগোনাও। পাখিগুলো দেখতে ভীষণ ভীষণ সুন্দর! হঠাৎ দর্শনে নজর কেড়ে নিত যে কারোরই।

প্রজাতির রূপের বর্ণনা দেয়ার সাধ্য আমার নেই ঠিক, তবে এটুকু বলার আছে যে, প্রকৃতি নিজ হাতে ওদের শরীরে রঙ-তুলির আঁচড় কেটে দিয়েছেন বোধ করি। এরা অতি পরিচিত পাখি। দেশের স্থায়ী বাসিন্দা। দেখা মেলে যত্রতত্র। গ্রামগঞ্জের ঝোঁপ-জঙ্গলে নিশ্চিত বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। স্বভাবে অত্যন্ত চঞ্চল, ফুর্তিবাজও। দিনের বেশিরভাগ সময় গাছের শাখা-প্রশাখায় নেচে বেড়ায়। প্রজনন মৌসুমে জোড়ায় জোড়ায় দেখা যায়।

বাংলাদেশ ছাড়াও দেখা যায় ভারত, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে। সমগ্র বিশ্বে এদের বিস্তৃতি প্রায় ৪৯ লাখ ২০ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে। বিশ্বে এ প্রজাতির সংখ্যা স্থিতিশীল। এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পায়নি, অন্যদিকে বৃদ্ধিও পায়নি। আইইউসিএন এ প্রজাতিটিকে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সুলভ দর্শনের কারণে বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এদের সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়নি।

পাখির বাংলা নাম: ‘সিঁদুরে মৌটুসি’, ইংরেজি নাম: ক্রিমসন সানবার্ড (Crimson Sunbird), বৈজ্ঞানিক নাম: Aethopyga siparaja। এরা ‘সিঁদুরে লাল মৌটুসি’ নামেও পরিচিত।

পুরুষ লম্বা পাখি ১৫ সেন্টিমিটার, স্ত্রী পাখি ১০ সেন্টিমিটার। দেহের তুলনায় লেজ খানিকটা বড়। ঠোঁট লম্বা, বড়শির মতো বাঁকানো। পুরুষ পাখির কপাল উজ্জ্বল বেগুনি, তার ওপর হালকা ডোরা দাগ। মাথার পেছন থেকে পিঠ ও ডানার কিছু অংশ সিঁদুরে লাল। পিঠের শেষ থেকে লেজের গোড়া পর্যন্ত হলুদাভ-জলপাই। লেজ বেগুনি। থুতনি থেকে বুক পর্যন্ত সিঁদুরে লাল। পেটের দিকটা হলুদাভ-জলপাই। স্ত্রী পাখির শরীর জলপাই রঙের। লেজের প্রান্তর সাদা। প্রধান খাবার: ফুলের মধু।

প্রজনন মৌসুম মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত। ভূমি থেকে দুই মিটার উঁচুতে গাছের ডালে অথবা গুল্মলতা আচ্ছাদিত গাছের ডালে থলে আকৃতির বাসা বাঁধে। ডিম পাড়ে ২টি। ফুটতে সময় লাগে ১৫-১৭ দিন।

লেখক: আলম শাইন, কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ। [email protected]

মানবকণ্ঠ/এএএম

Leave a Reply

Your email address will not be published.