চা শ্রমিকদের কষ্টের জীবন (শেষ পর্ব)

মজুরির টাকা মদ পান করেই শেষ করে চা শ্রমিকরা

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যায় চা বাগানের চিত্র। তরুণ বয়সী থেকে শুরু করে বৃদ্ধরাও ভিড় করেন লেবার লাইনের মদের পাট্টায় (মদের দোকান)। মধ্যরাত পর্যন্ত চলে মদের জমজমাট ব্যবসা। চা বাগানের প্রায় ৭০ শতাংশ শ্রমিক দেশীয় মদে আসক্ত বলে জানিয়েছে চা শ্রমিকদের একটি সূত্র।

মদ পান করে এসব মাতাল শ্রমিকরা রাতের বেলায় ঘরে ফিরে মারামারি ও ভাঙচুর করে। যার ফলে অশান্তি লেগেই থাকে তাদের পরিবারে। অথচ মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না বাগান কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ব্রিটিশ আমল থেকে চা বাগানসমূহে কর্মরত শ্রমিকদের নিজস্ব মদ তৈরির পাট্টা এখনো চলছে অবাধে। আর মদ খেয়ে নিঃস্ব শ্রমিকরা একবারেই নিঃস্বই রয়ে যাচ্ছে। হচ্ছে না তাদের জীবনমানের কোনো উন্নতি। দিনে যা রুজি করেন সন্ধ্যা হলেই মদ পান করে তা শেষ করে দেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মৌলভীবাজারের ৯২টি চা বাগানের মধ্যে ৪৫টি চা বাগানে রয়েছে বৈধ মদের পাট্টা। বাকি বাগানগুলোতে বৈধ পাট্টা থেকে পাইকারি মদ কিনে নিয়ে বিক্রি করা হয়। এসব পাট্টায় বিক্রি হয় বাংলা ৭০, বাংলা ৩০, চুয়ানি, হাড়িয়া নামের মদ। বাংলা ৭০ মদ ১শ’ টাকা, বাংলা ৩০ মদ ৪শ’ টাকা, চুয়ানি ৪শ’ টাকা ও হাড়িয়া মদ ৪০ টাকা লিটার দরে বিক্রি করা হয়। এ মদ পান করে বাগানের প্রায় ৭০ শতাংশ শ্রমিক। প্রতিটি পাট্টায় সপ্তাহে বিক্রি হয় ৪ থেকে ৫ হাজার লিটার মদ। চা শ্রমিকদের পাশাপাশি বস্তি থেকে বিভিন্ন বয়সী ব্যক্তিরাও পাট্টাগুলোতে গিয়ে মদ পান করেন নিরাপদভাবে।

মদের পাশাপাশি ফেনসিডিল, গাঁজা এবং ইয়াবা বিক্রি হয় দেদারসে। চা শ্রমিকরা যুগের পর যুগ ধরে বাগানে মাদক সেবনের এই ধারা অব্যাহত রাখলেও সাধারণ শ্রমিক ও যুব সমাজকে রক্ষায় মাদক উৎপাদন বন্ধ করতে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তবে মাঝে মাঝে তারা লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করছে। জনপ্রতিনিধি কিংবা চা শ্রমিক নেতারাও মাদক বিক্রি বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেন না। কারণ এর মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে পরবর্তী সময়ে মাদকসেবী শ্রমিকরা তাদের ভোট দেবে না।

চা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাগানে এক গ্লাস বিশুদ্ধ পানি পাওয়া অনেক কষ্টকর কিন্তু মদ পেতে হলে কোনো কষ্ট করতে হয় না। রাত অবধি মদ পান করে জেগে থাকেন চা শ্রমিকরা। জš§ থেকে মৃত্যু, বিয়েশাদি থেকে পূজা- উৎসবের প্রতিটি পর্বে মদককে প্রধান উপকরণ হিসেবে বেছে নিয়েছেন চা শ্রমিকরা।
চা বাগানের ইতিহাসের সঙ্গে মাদকের এ অধ্যায়কে ভয়াবহ ট্রাজেডির মতো তুলনা করে বর্ষীয়ান চা শ্রমিক কালা বাউরি বলেন, চা বাগানে ব্রিটিশ বেনিয়ারা ষড়যন্ত্র করে মদ ঢুকিয়ে দিয়েছিল। যার ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। শ্রমিকদের মদে বুঁদ করে রাখা হতো মূলত দাবি-দাওয়ার জন্য যাতে আন্দোলন করতে না পারে, যাতে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে সে জন্য। বর্তমানে চা বাগানে কিছু চা শ্রমিক নেতা, চা বাগান মলিক ও প্রশাসনের যোগসাজশে মাদক সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখা হয়েছে।

দেশে চা শ্রমিকদের ৭০ শতাংশ শ্রমিক মাদকাসক্ত এ কথা শ্রমিকরাও নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন। সচেতন কয়েক চা শ্রমিক বলেন, অধিকাংশ চা শ্রমিক মদ পান করলেও মানসিকভাবে তারা মাদকের বিরুদ্ধে। তাদের মাদক ব্যবহারের জন্য বাধ্য করা হচ্ছে। শারীরিকভাবে অসুস্থ বানিয়ে শ্রমিকদের মানসিকতাকে আন্দোলনবিমুখ করে রাখার জন্য চা বাগানে অবাধে মাদক ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে। তারা প্রশ্ন রাখেন, এ দেশে বিভিন্ন সেক্টরে লাখ লাখ শ্রমিক রয়েছেন অথচ সেখানে কোনো মদের লাইসেন্স-পারমিট নেই। শুধু চা শ্রমিকদের বেলায় কেন মাদক বৈধ করা হয়েছে?

চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রামভোজন কৈরী মাদক সমস্যাকে একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে চান। বাগানে বাগানে মাদক ছড়িয়ে দেয়াকে তিনি চা বাগান মালিক এবং প্রশাসনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, অতীতে চা শ্রমিকদের মধ্য থেকে অনেক বিখ্যাত লোকের জন্ম হয়েছিল। ১৯৩৫ সালে চা শ্রমিক নেতা দ্বারিকানাথ তেওয়ারী এবং ১৯৪৬ সালে জীবন সাঁওতাল এমএনএ (মেম্বর অব ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) নির্বাচিত হয়ে সেটা প্রমাণ করেছিলেন। তাদের মতো আর কোনো মেধা যাতে চা শ্রমিকদের মধ্যে জন্ম না হয়, সে জন্য চা বাগানের লাইনে লাইনে (বাসস্থান) মাদকের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, এ দেশ থেকে ব্রিটিশরা বিতাড়িত হলেও তাদের মাদক সংস্কৃতি চা বাগানে জিইয়ে রেখেছেন বর্তমান চা বাগান মালিকরা তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের জন্য, যাতে মদে বিভোর হয়ে শ্রমিকরা দাস হিসেবে থাকেন।

চা বাগানে অবাধে মদের প্রচলন নিয়ে চা শ্রমিকদের মাঝে কিছু খোঁড়া যুক্তির কথাও শোনা যায়। যেমন অতীতে বিষাক্ত মদ পান করে কলেরার মতো মহামারিও দেখা দেয় চা বাগানে। কারণ হাড়িয়া, লাংগি, চুয়ানি কিংবা চোলাই মদ তৈরির জন্য পচা ভাত, নিকৃষ্ট গুড়, নিশাদল, ইউরিয়া সার, তোলাপোকা ও টিকটিকির লেজ পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়। যে কারণে এসব মদ পান করে চা শ্রমিকরা কলেরা, লিভার সিরোসিস, আমাশয়, কিডনি রোগ, পা ফোলাসহ নানা রোগে অকালে প্রাণ হারাতেন। ষাটের দশকের শুরুতে বিষাক্ত মদ পান করে সিলেট অঞ্চলের চা বাগানে কয়েক হাজার শ্রমিক মারা যান। যে কারণে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার শ্রমিকদের জীবন বাঁচানোর জন্য সরকারিভাবে বিশুদ্ধ দেশীয় বাংলা মদের পাট্টা (লাইসেন্স) দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে চা শ্রমিক নেতারা একে আরেক ধরনের ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, অবৈধ মাদককে বৈধ করে সরকার চা শ্রমিকদের সারা জীবন মাদকাসক্ত করে রাখতে চায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাদকসেবী চা শ্রমিক বলেন, প্রতিদিন এক-আধটু মদ পান না করলে ঠিকমতো ঘুম হয় না। সন্ধ্যা হলে রক্তে এমন টান দেয় তখন পেটে দু’এক গ্লাস মদ না পড়লে অস্থির ভাব জাগে। তখন ছুটে যেতে হয় পাট্টায়।

চা বাগানের নারী শ্রমিক নন্দী মৃধা, অঞ্জলি, শেফালি নাইডু, মীনা বাউরী, সুমিত্রা রিকিয়াশন জানান, তাদের স্বামীরা সন্ধ্যার পর মদের পাট্টায় গিয়ে মদ পান করে মাতাল হয়ে যান। পরে রাস্তায় ও ঘরে এসে ঝগড়াঝাটি, সন্তানদের গালিগালাজসহ বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদের সহসভাপতি দেবাশীষ যাদব রিংকু বলেন, বাগানে উৎপাদিত মদের পাট্টায় এখন বস্তির যুবকদেরও দেখা যায়। এতে করে চা শ্রমিকদের সঙ্গে বস্তির লোকজনও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। এসব মদ পান করে যুব সমাজ ধ্বংস হচ্ছে, মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটছে। পরিবেশ বিনষ্ট, শারীরিক সমস্যাসহ আর্থিক মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে চা বাগানগুলোতে মদের পাট্টাসমূহ বন্ধ করা উচিত। না হলে চা শ্রমিরা মদ পান করে দৈনিক যা রুজি করে সব টাকা শেষ করে দেবে। নিঃস্ব চা শ্রমিকরা একভাবেই নিঃস্ব রয়ে যাবে।

সিলেটের গোয়াইনঘাট সরকারি কলেজের ইংরেজি প্রভাষক চিত্তরঞ্জন রাজবংশী বলেন, দেশের অনেক চা বাগানে চা শ্রমিকদের উপযুক্ত মজুরি ভাতা না দিয়ে চা শ্রমিকদের বিভিন্ন রকমের মাদকদ্রব্য অবৈধভাবে বিক্রি করতে উৎসাহ দেয়া হয়। স্থানীয় নির্বাচিত নেতারা বাগান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা ও অন্য সুবিধা পান বলে মাদকদ্রব্য বিক্রি করতে বাধা দেন না।

তিনি আরো বলেন, ইদানীং সিলেট অঞ্চলে এমন কোনো চা বাগান চোখে পড়বে না যেগুলোতে সন্ধ্যার পর রাস্তার পাশে টেবিলের ওপর বোতল ভর্তি চোলাই মদ আর ডিম বিক্রি হয় না। ফরমালিনযুক্ত খাবারের যুগে এমনিতেই চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য খারাপ তার ওপর মজুরি কম হওয়ায় পুষ্টিকর খাবার তারা পান না। এরপর যদি তারা মদ পান করেন তবে চা উৎপাদন করার মতো তাদের শরীর, মন, মানসিকতা খুঁজে পাওয়া যাবে না। আগে চা শ্রমিকরা শুধু নিজেদের তৈরি হাড়িয়া খেতেন। এখন পাট্টার মদের পাশাপাশি, বিষাক্ত চোলাই মদও সেবন করেন। গাঁজা সেবন অনেক আগেই শুরু হয়েছে। ফেনসিডিল তো আছেই। বর্তমানে চা বাগানে ইয়াবা বিক্রি হয় বলেও শোনা যাচ্ছে।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসূফ বলেন, শিক্ষার হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চা বাগানে মদ পান করা কমে এসেছে। সচেতনতা কর্মসূচি ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হলে তা আরো কমে আসবে।

তিনি বলেন, ২৮ আগস্ট মঙ্গলবার কুলাউড়া থানায় ২৮টি চা বাগানের প্রতিনিধিদের ব্যবস্থাপক, মদের পাট্টার মালিক, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড মেম্বর, পঞ্চায়েত প্রধান এবং মহিলা প্রতিনিধিসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে চা বাগানে মাদক বন্ধে উন্মুক্ত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মাদকের বৈধ পাট্টার আড়ালে অননুমোদিত লোকজনের কাছে মাদক বিক্রি থেকে মুক্তির জন্য সবার মতামত চাওয়া হয়।

আলোচকদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে- উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে মাদক বর্জনের আহ্বানসহ শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ানো, ব্যাপকভাবে ক্ষতিকর চোলাই মদ তৈরির ব্যবস্থা বন্ধ করা। দুর্গা পূজার সময় পাট্টা বন্ধ রাখা, স্থানীয় নেতাদের সহযোগিতায় সব বাগানের পঞ্চায়েত ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং সর্বোপরি অনুমতিপ্রাপ্ত লাইসেন্সের শর্ত মেনে চলা। বহিরাগতদের কাছে অনুমতি ব্যতীত যারা মদ বিক্রি করবেন তাদের পাট্টার লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করা। এসব বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করতে কাজ করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

মৌলভীবাজার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক সুবোধ কুমার বিশ্বাস বলেন, বাগানগুলো দুর্গম এলাকায় হওয়ায় ঠিকমতো মাদকবিরোধী অভিযান করা সম্ভব হয় না। তবে প্রতিমাসে দু’একটি অভিযান পরিচালনা করি। মদকের বিরুদ্ধে চা শ্রমিকদের সচেতন করার জন্য সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করা হয়।

মানবকণ্ঠ/এএএম