ভয়ঙ্কর কিকি চ্যালেঞ্জ চলবে গাড়ি চলবে নাচ

নতুন ট্রেন্ডে মজেছে প্রজন্ম। বিষয়টি বেশ ভয়ঙ্কর তবুও সেই ট্রেন্ডের মায়াজলে আটকে গেছে অনেকে। ‘কিকি চ্যালেঞ্জ’। হয়তো অনেকেই বিষয়টি সম্পর্কে জানেন না। আবার যারা ইন্টারনেটে বেশি সময় কাটান তাদের কাছে পরিষ্কার। নতুন এই চ্যালেঞ্জ এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম আর ভিডিও শেয়ারিং সাইটগুলোতে বেশ জনপ্রিয়। কি অবাক হচ্ছেন! অবাক হওয়ারই কথা। আবার অনেকে চিন্তা করছেন এটি আবার কেমন চ্যালেঞ্জ? এই চ্যালেঞ্জ তেমন কিছু নয়। আবার নতুন কিকি নামের এই চ্যালেঞ্জটি বেশ ভয়ঙ্করও। হতে পারে জীবনের হুমকি।

চলন্ত গাড়ি থেকে নেমে একটি ইংরেজি র‌্যাপ মিউজিকের তালে তালে শরীর দুলিয়ে নাচতে হবে। সে সময় গাড়ি চলন্ত অবস্থায় থাকবে। নাচ শেষে কিছুক্ষণ পর আবার চলন্ত গাড়িতে লাফ দিয়ে উঠে বসতে হবে। এমনই বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে আসক্ত করে ফেলছে। বেশি লাইক কমেন্ট আর শেয়ার পাওয়ার আশায় তারা রাস্তার মাঝে চলন্ত গাড়ি থেকে নেমে নাচানাচি করে আবার গাড়িতে উঠতেও একদম ভয় পাচ্ছে না।

প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, বিপদের বড়সড় দিগন্ত খুলে দিয়েছে ইন্টারনেট আর ইন্টারনেটভিত্তিক এমন উন্মোদ আচরণ। ‘কিকি চ্যালেঞ্জ’ আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে বিপদ সহজে শেষ হওয়ার নয়। নতুন নতুন রূপ ধরে হানা দেয়ার ক্ষমতা আছে ইন্টারনেটের। আর সেখানে তৈরি হওয়া নতুন ট্রেন্ডগুলোর।অদ্ভুত, উদ্ভট, বিস্ময়কর এসব আচরণ! সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক এই নতুন নতুন ট্রেন্ডকে চ্যালেঞ্জ বানিয়ে কেন সবাই ছুড়ছে? কেনই বা অন্যরা তা গ্রহণ করছে। কোনো খেলা, এই রকম অবান্তর হতে পারে না। আর হওয়া উচিতও নয়। তাও খেলা চলছে। রমরমিয়ে চলছে। জনপ্রিয়তাও দিন দিন বাড়ছে। এই ট্রেন্ডের কারণে যে কোনো মুহূর্তে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আছে প্রাণহানি হওয়ার সম্ভাবনাও।

এই চ্যালেঞ্জে যে বা যারা অংশ নিচ্ছে শুধু তাদের নয়, এই ট্রেন্ডকে যারা ছড়িয়ে দিচ্ছে তারাও জানেন না, আচমকা বিপদ নেমে আসতে পারে তাদের জীবনে। কিন্তু সেসব ঠিক-বেঠিক, ভালো-মন্দ, উচিত-অনুচিতের হিসাব ভুলে কোনো এক মায়াজালে যেন দলে দলে সব ছুটছে চ্যালেঞ্জ নিতে। ছুটছে চ্যালেঞ্জ দিতে!

এসব ঝুঁকিপূর্ণ এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন কাণ্ডকারখানার ভিডিও পোস্ট করতে হবে ফেসবুক, এটিই মূল লক্ষ্য। তবে এই চ্যালেঞ্জে অংশ নিয়ে কি লাভ! ‘চ্যালেঞ্জ’ জয় করলে কোনো পুরস্কার বা কোনো বিশেষ লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে কিনা? ‘চ্যালেঞ্জে’ যদি কেউ অংশ না নেয়, তাহলেই বা কি ক্ষতি হবে? কোনো উত্তর নেই এসবের। কারণ বিষয়টাই অবান্তর। তার পরও নিতে হবে এই চ্যালেঞ্জে অংশ।

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে কেমন নির্বুদ্ধিতার প্রমাণ দিতে হবে এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশের অনেক সেলিব্রেটি থেকে শুরু করে আমজনতা এই চ্যালেঞ্জে মজেছে। আবার সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিলে তা নিমিষেই ভাইরাল হচ্ছে। যারা এই চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করেছে সবাই ‘ইন মাই ফিলিংস’ গানটিতে নাচছে।

হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা উইল স্মিথও এই চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন। মার্কিন ইন্টারনেট কমেডিয়ান শিগি শুরু করেন আজব এই চ্যালেঞ্জ। তার ইনস্টাগ্রামে ফলোয়ারের সংখ্যা প্রায় ১০.৬ লাখের বেশি। সেখানে একদিন হঠাৎ করেই অদ্ভুত এক ড্যান্স পোস্ট করেন। ওই ড্যান্স ভিডিওর নাম দেন ‘কিকি চ্যালেঞ্জ’। সেই ভিডিওটিতে গাড়ি থেকে নেমে এমন নাচের বিষয় ছিল। শিগির সেই ভিডিও দিয়ে শুরু। তার পরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ‘কিকি চ্যালেঞ্জ’। এরপর থেকে সারাবিশ্বের কোটি কোটি মানুষ কিকি চ্যালেঞ্জের ভিডিও পোস্ট করতে শুরু করেন।

এ ছাড়া বিশ্বের সব জনপ্রিয় মডেল, অভিনেতা, সংগীত শিল্পীরা মজেছেন এই নতুন ট্রেন্ডে। দেখা গেছে নোরা ফতেহি, নিয়া শর্মা, অদা শর্মা, করিশ্মা শর্মার মতো বলিউডের অভিনেত্রীকেও। তারা এই চ্যালেঞ্জ অ্যাক্সেপ্ট করে ড্রেকের ‘ইন মাই ফিলিংস’ গানে ‘কিকি চ্যালেঞ্জ’ ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেন।

সম্প্রতি পাশের দেশ ভারতেও এ ধরনের চ্যালেঞ্জে অনেকে অংশ নেন। শুধু শহরের ছেলেমেয়েরা নয়, গ্রামের কৃষকও মাঠে ট্রাক্টর থেকে নেমে ভয়ঙ্করভাবে এই চ্যালেঞ্জে অংশ নিয়েছেন। সেই ভিডিও ভাইরালসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো সংবাদ হিসেবে প্রচার করে। দেশটিতেও চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে অনেকেই দুর্ঘটনায় পড়েছে। তার পরও কেউ থামছে না। সেখানকার পুলিশ জানিয়েছে, এ ধরনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার মানে নিজেকে এবং অন্যকেও বিপদে ফেলা। তাই এ ধরনের কাজ থেকে দূরে থাকতে বলা হচ্ছে।

আমেরিকা, স্পেন, মালেশিয়া এবং ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশের পুলিশ অতিষ্ঠ এই ‘কিকি চ্যালেঞ্জ’ নিয়ে। এই চ্যালেঞ্জে নাম লিখিয়েছে গোটা বিশ্বের বহুমানুষ। তারা নিজেরাও যেমন করছেন, তেমনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন নিজের বন্ধুদের দিকেও। এই চ্যালেঞ্জ বিভিন্ন দেশের পুলিশের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। কেউ কেউ এই চ্যালেঞ্জে জয়ী হলেও, অনেকেই চ্যালেঞ্জ করতে গিয়ে আহত, এমনকি নিহতও হচ্ছেন।

বিশ্বের অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে এই চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাতামাতি। বিশ্বের বেশ কিছু দেশে অভিভাবকদের সতর্ক করা হয়েছে যাতে সন্তানরা এই প্রাণঘাতী ড্যান্স চ্যালেঞ্জ থেকে বিরত থাকে।

চলন্ত গাড়ি থেকে নামা আবার ওঠা এমন ঝুঁকি নেয়া প্রসঙ্গে সিনিয়র তথ্যপ্রযুক্তি সাংবাদিক মোহাম্মদ কাওছার উদ্দীন বলেন, মানুষ খুব তাড়াতাড়ি বিখ্যাত হতে চাইছে। তাই এ ধরনের প্রবণতা আরো বেড়ে চলেছে। একাকীত্বে ভোগা মানুষ আরো বেশি করে। এ ছাড়া অস্থিরতা থেকেই এ জাতীয় গেম বা চ্যালেঞ্জের উৎসাহ বাড়ছে। সাময়িক উত্তেজনার থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে বোঝাতে হবে বড়দেরই। কিন্তু বড়রা নিজেরাও যদি এই জাতীয় চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাতামাতি করেন, তবে বিষয় সেটি চিন্তার।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ