ভোলা সাইক্লোন

বিশ্বের ইতিহাসে যে ক’টি প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় বিভিন্ন দেশে তাণ্ডবলীলা ঘটিয়েছে তন্মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দৃষ্টান্ত রেখেছে ১৯৭০ সালের সাইক্লোন। যার নামকরণ হয় ‘ভোলা সাইক্লোন’ নামে। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর ভারত এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় এলাকায় এ ঝড় আঘাত হেনেছিল। ঘূর্ণিঝড়টি সৃষ্ট হয়েছিল ৪ নভেম্বর বঙ্গোপসাগরের কেন্দ্রীয় উপকূলে। এটি সিম্পসন স্কেলে ক্যাটাগরি-৩ মাত্রার ঘূর্ণিঝড় ছিল। ঘূর্ণিঝড়টি ১৮৫ কিলোমিটার বেগে উপকূলে আঘাত হানলেও ২০৫ কিলোমিটারের স্থায়িত্ব ছিল ১ মিনিট। তৎসঙ্গে ৩০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের ফলে গাছ-গাছালির ডালে আশ্রয় নেয়া মানুষজনও রেহাই পায়নি। রেহাই পায়নি গবাদিপশুসহ বন্যপ্রাণীরাও। যার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৮৬.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (১৯৭০)।

বিষয়টি নিয়ে ১৯৭০ সালে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হলে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা মৃতের সংখ্যা দশ লাখ নিরূপণ করে। ঠিক তখনই পাকিস্তান সরকারের টনক নড়ে। মৃতের সংখ্যা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টায় পাঁচ লাখ নির্ধারণ করে। তাছাড়া অপ্রতুল ত্রাণসামগ্রী পাঠায় সপ্তাহ অতিবাহিত হলে। সেই থেকে সরকারিভাবে মৃতের সংখ্যা পাঁচ লাখ গণনা করা হয়। বিষয়টি উপকূলীয় আম-জনতা মেনে নিতে পারেনি; ক্ষোভে ফেটে পড়ে তখন। ফলে ফি বছর ৭১-এর মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধা করেনি আর তারা।

২০১৭ সালের ১৮ মে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) বিশ্বের পাঁচ ধরনের ভয়াবহ প্রাণঘাতী আবহাওয়াজনিত ঘটনার শীর্ষ তালিকা প্রকাশ করে। সেই তালিকায় শীর্ষ প্রাণঘাতী ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ১৯৭০ সালে উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ‘ভোলা সাইক্লোন’-কে। সেই ঘোষণার প্রেক্ষিতে উপক‚লবাসীর হৃদয়ে পুনঃরক্তক্ষরণ শুরু হলে ‘উপক‚ল বাংলাদেশ’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা সোচ্চার হন। ১২ নভেম্বরকে উপক‚ল দিবস ঘোষণার দাবি জানান। তারই প্রেক্ষিতে গত ২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর ১৫টি উপকূলীয় জেলার ৩২ উপজেলার ৩৪ স্থানে র‌্যালি ও অলোচনা সভার আয়োজন করেন ‘উপকূল বাংলাদেশ’ নামের প্রতিষ্ঠানটি। বিষয়টি দেশি গণমাধ্যমের পাশাপাশি নজর কাড়ে বিবিসি ও ভয়েস আমেরিকা। তারা বেশ গুরুত্বসহকারে সংবাদটি পরিবেশন করে।

গত বছরের মতো এবারও ১২ নভেম্বর উপকূলবাসী দিবসটি পালনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এবার ১৬ জেলার ৫৪ স্থানে র‌্যালি, আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমে অংশ নিবেন উপকূলবাসী। তাদের দাবি হাসি-কাশি-ডিম দিবস পালিত হলে দশ লাখ প্রাণের বিনিময়ে ‘উপকূল দিবস’ কেন নয়!
-লেখক: বন্যপ্রাণী বিশারদ

মানবকণ্ঠ/এফএইচ