ভাষা আন্দোলনের বই কম

ভাষা আন্দোলনের বই কম

বিশ্বের নানা দেশে অনুষ্ঠিত হয় বইমেলা। এসব মেলার মূল লক্ষ্যই থাকে বই বিক্রি করা। আমাদের দেশেও ভাষার মাসকে কেন্দ্র করে অনেক বছর থেকে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এ মেলার মূল লক্ষ্য বই বিক্রি নয়। এ মেলা আমাদের প্রাণের মেলা, উত্সবের মেলা, আমাদের চেতনার মেলা।

আমাদের চেতনার একুশের সঙ্গে মিশে আছে বাংলার সংগ্রাম, ইতিহাস ও ঐতিহ্য। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও শফিউরের আত্মদানের বিনিময়েই আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। এই ভাষার মূল চালিকা শক্তিই একুশ। আর একুশকে নিয়েই বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলা। কিন্তু পরিতাপের বিষয় ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে একুশের বইমেলায় বরাবরের মতো এবারো ভাষা আন্দোলন নিয়ে বইয়ের অপ্রতুলতা।

বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগের তথ্যমতে, গতকাল ২০তম দিন পর্যন্ত মেলায় মোট নতুন বই এসেছে ২ হাজার ৮৯৬টি। এর মধ্যে ভাষা আন্দোল নিয়ে বই এসেছে মাত্র বারোটি। আবার যা এসেছে তারও মান নিয়ে রয়েছে বড় প্রশ্ন।

প্রকাশকরা বলছেন, ১৯৭০ সালে জহির রায়হানের অমর সৃষ্টি ‘একুশের গল্পে’র তপু চরিত্রের পর এ আন্দোলন নিয়ে আর ওই মানের কোনো মানসম্মত সাহিত্য সৃষ্টি হয়নি। তাদের ভাষায়, ভাষা আন্দোলন নিয়ে বই প্রকাশে তাদের বিপুল আগ্রহ থাকলেও পাণ্ডুলিপির অভাবে তারা তা পারছেন না। আবার যা দু-একটি লেখা আসছে তারও মান ভালো না হওয়ায় এসব লেখা জনসমাদৃত হচ্ছে না।

এদিকে আজ ২১ ফেব্রুয়ারি হওয়ার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো শেষে জনতার ঢল নামবে একুশে গ্রন্থমেলায় এমনটাই আশাবাদী মেলা কর্তৃপক্ষ। এ লক্ষ্যে অতিরিক্ত প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে।

মেলায় ভাষা আন্দোলনের বই কম থাকা প্রসঙ্গে বিশিষ্ট ভাষা সংগ্রামী ও লেখক আহমদ রফিক মানবকণ্ঠকে বলেন, গল্প, কবিতা, উপন্যাস ইচ্ছে করলেই যে কেউ লিখতে পারে। কারণ সেসব কাল্পনিক। ভাষা আন্দোলন যেহেতু ইতিহাসভিত্তিক, তাই ইতিহাস না জানলে এ বিষয়ে লেখা যায় না। ভাষা আন্দোলন নিয়ে লিখতে গেলে প্রচুর গবেষণার দরকার। মূলত ভাষা আন্দোলন নিয়ে গবেষণার অভাবেই একুশের বইমেলায় ভাষা আন্দোলনের বই কম। আরেকটা কথা মনে রাখতে হবে এ বিষয়ে যেহেতু গবেষণা কম, তাই এ বিষয়ে বইয়ের সংখ্যা কম হওয়াটাই স্বাভাবিক।

তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নিজের কৃষ্টি-কালচার জানতে হলে দেশের ঐতিহ্যকে জানতে হলে ও শেকড়ের খোঁজ পেতে হলে ভাষা আন্দোলন নিয়ে তরুণ প্রজন্মকে অনেক বেশি পড়াশোনা করতে হবে। বইয়ের সংখ্যা যেহেতু কম, তাই যেগুলো আছে সেগুলো থেকেই ইতিহাস জানতে হবে।

ভাষা আন্দোলন নিয়ে এবারের বইমেলা ঘুরে নতুন যেসব বইয়ের সন্ধান পাওয়া গেছে তার মধ্যে— রিয়া প্রকাশনী এনেছে মামুন তরফদারের ‘বাংলার লোকসংস্কৃতিতে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ’, এশিয়া পাবলিকেশন্স এনেছে ড. গুলশান আরা ‘ভাষা আন্দোলনের কথা’, জোনাকী প্রকাশনী এনেছে সৌমিত্র শেখরের ‘একুশের সংকলন পরিচিতি ও গুরুত্ব’, আগামী প্রকাশনী এনেছে সৈয়দ জাহিদ হাসানের ‘সিরাজগঞ্জে ভাষা আন্দোলন ও পাবনায় ভাষা আন্দোলন, ইত্যাদি এনেছে সুফিয়া বেগমের ‘ভাষা সংগ্রামী নারীরা, প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ভাষা সংগ্রামী আহমদ রফিকের ‘ভাষা আন্দোলন: টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ অধ্যয়ন থেকে রাদিন চৌধুরীর ‘ভাষা আন্দোলনের সহজ পাঠ’, নালন্দা এনেছে সোহেল মল্লিক সম্পাদিত ‘ভাষা আন্দোলনের নির্বাচিত ৫০ কিশোর গল্প’, বটেশ্বর বর্ণন এনেছে সুমাইয়া খানমের ‘ভাষা-আন্দোলন ও বাংলাদেশের কথাসাহিত্য, এশিয়া পাবলিকেশন্স এনেছে ইসমাইল হোসেন বকুলের রক্তের কারাগারে বন্দি ৮ই ফাল্গুন, ভাষা আন্দোলন ও রক্তঝরা একুশ’ ও ড. গুলশান আরার ‘ভাষা আন্দোলনের কথা, জাগৃতি প্রকাশনী থেকে সাইফুল হক সিরাজী’র ‘ভাষা আন্দোলনের তাত্পর্য’।

মেলায় ভাষা আন্দোলনের ওপর আগে একাধিক বই এনেছে অন্বেষা প্রকাশনা। এর প্রকাশক শাহাদাত হোসেন মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বরাবরই ভাষা আন্দোলন নিয়ে বই করে থাকি। এবারও আমাদের করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও পাণ্ডুলিপির অভাবে করতে পারিনি। ভাষা আন্দোলন নিয়ে বই লেখার মতো ভালো গবেষকও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে না। পাণ্ডুলিপি পেলে বই প্রকাশ করতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’

তাম্রলিপির একেএম তরিকুল ইসলাম রনি মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের মতো ভাষা আন্দোলন নিয়েও নতুন প্রজন্মের আগ্রহ দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের প্যাভিলিয়নে এসে অনেকেই ভাষার বই খুঁজছে। এক সময় তরুণরা যেমন গল্প, উপন্যাসের প্রতি বেশি আগ্রহী ছিল এখন তাদের রুচির পরিবর্তন হচ্ছে। ভালো পাণ্ডুলিপি ও গবেষণার অভাবেই ভাষা আন্দোলন নিয়ে বইয়ের সংখ্যা কম। আবার যা কিছু আসে তাও মানসম্মত নয়। যেমন ১৯৭০ সালে জহির রায়হানের অমর সৃষ্টি ‘একুশের গল্প’র তপু চরিত্রের মতো উন্নত সাহিত্যকর্ম ভাষা আন্দোলনের ওপর আর আসেনি। আমরা চেষ্টা করছি এলাকাভিত্তিক ইতিহাস তুলে আনতে। তবে প্রকৃত লেখকদের এ বিষয়ে সাহিত্য সৃষ্টির আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’

নতুন বই: গতকাল বুধবার ১৩৮টি নতুন বই মেলায় এসেছে বলে জানিয়েছে বাংলা একাডেমির জনসংযোগ অফিস। এর মধ্যে গল্প ২৪টি, উপন্যাস ১৮টি, প্রবন্ধ ৯টি, কবিতা ৪৭টি, গবেষণা ২টি, ছড়া ৪টি, শিশুসাহিত্য ১টি, জীবনী ৫টি, মুক্তযুদ্ধ বিষয়ক ৬টি, নাটক ১টি, ভ্রমণবিষয়ক ৩টি, ইতিহাসবিষয়ক ২টি, রাজনীতি ২টি, স্বাস্থ্যবিষয়ক ১টি, সায়েন্স ফিকশন ১টি, ধর্মীয় ১টি, অভিধান ১টি, অনুবাদ ১টি এবং অন্যান্য ৯টি।

লেখক বলছি কর্নার: লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন প্রকাশিত গ্রন্থ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন কবি মাসুদুজ্জামান, কবি মুজতবা আহমেদ মোরশেদ, কথাসাহিত্যিক প্রশান্ত মৃধা, প্রাবন্ধিক শীলা মোস্তফা এবং কবি প্রত্যয় জসিম। বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘সওগাত পত্রিকার শতবর্ষ : ফিরে দেখা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. ইসরাইল খান।

কালো জোছনায় লাল তারা : সহকর্মী এক সাংবাদিক বন্ধু কয়েকদিন আগে একটি বই হাতে দিল। প্রথমেই নামটি চোখে পড়ল, খানিকটা মনযোগ দিয়ে প্রথম পাতা উল্টাতেই প্রথম কবিতায় চোখ আটকে গেল “অনুপল”। কবিতাটি পড়ে অভিভূত হলাম, আগ্রহ সহকারে কবি পরিচিতিতে চোখ ভেজাই, কবি পুলিশ কর্মকর্তা, র্যাবের কালো পোশাকধারী। এবার বইটি মনযোগ সহকারে পড়া শুরু করলাম, কবিতার নাম “কষ্মিন কালেও তুমি প্রেমী ছিলেনা” এক কথায় অসাধারণ; প্রত্যেক পুরুষের মনের কথাই কি তরুন প্রজন্মের উর্দিপড়া কবি বলতে চেয়েছেন? আরো একটি কবিতা পড়লাম, নাম “নিষিদ্ধ” অসাধারণ শব্দ চয়ন, উপমার অন্তমিল, কবিতার শেষ চরনটি যেন সব হূদয়েই কথা বলে চলেছে। একে একে সবকটি কবিতা পড়ে শেষ করলাম। বাংলা সাহিত্যের অনন্য সৃষ্টি এই বইটি পাঠক বহুকাল মনে রাখবে বললে ভুল হবেনা। মোট ৭৮টি কবিতা রয়েছে বইটিতে। বেশ কয়েকটি কবিতায় দার্শনিক চেতনাবোধ, না পাওয়ায় বেদনা এবং প্রেম যেন একই প্লাটফরমে দাঁড়িয়েছে। বইটির প্রতিটি কবিতাই অসাধারণ, কাব্যশৈলীর ভারিক্কিতে প্রথম শ্রেনীর এক সৃষ্টি। কবির প্রথম কবিতার বই পড়েছিলাম, ভালোলেগেছিল। “কালো জোছনায় লাল তারা” কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। বইটি যেন, প্রেম বিরহ ও আত্নিক জীবনের নৈসর্গিক স্লোগান বহন করছে। বাংলা সাহিত্যের এক অনবদ্য সৃষ্টি হয়ে থাকবে বইটি।

মানবকণ্ঠ/এসএস