ভাষার প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ

আফতাব চৌধুরী :
ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের মাস। ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য বাঙালি জাতি যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা বিরল। মানুষের সৃষ্ট এক অনন্য যোগাযোগ মাধ্যম ‘ভাষা’। পৃথিবীতে আবিষ্কৃত ও প্রচলিত সব বিস্ময়কর মিডিয়ার মধ্যে ভাষা সবচেয়ে চমকপ্রদ। মনের অভিব্যক্তি প্রকাশক এই বিশেষ শক্তিই মানুষকে অন্য সব প্রাণীর তুলনায় বেশি অগ্রসর হতে সহায়তা করেছে। সভ্যতার বাঁকে বাঁকে মানুষ তাদের চিন্তা এবং কল্পনার ছাপ রাখতে সক্ষম হয়েছে। নিজের ভাবনা প্রকাশের ক্ষমতা কেবল মানুষের রয়েছে, অন্যান্য প্রাণীর তা নেই। কিছু শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে প্রাণীকুল বিভিন্ন বিষয়ে তাদের সহযোগীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকে বটে, কিন্তু নিজস্ব কল্পনা ও পরিকল্পনার পরিপূর্ণ প্রকাশ তাতে চলে না। মনের ভাব প্রকাশ করতে না-পারলে অপরের সঙ্গে যোগাযোগটা ঠিক যথার্থভাবে সম্ভব হয়ে ওঠে না। চাওয়া-পাওয়া, দুঃখ-বেদনা, আনন্দ-অভিলাষ প্রকাশ করতে গেলেও ভাষার বিকল্প নেই। সভ্যতার উদ্ভব ও বিকাশে যে প্রচেষ্টা নিহিত আছে, তাতেও যুক্ত আছে মানুষের সমন্বিত চিন্তা ও পরিকল্পনার বহিঃপ্রকাশ। আর এমনটি সম্ভব হয়েছে ভাষা প্রকাশের মাধ্যমে। অন্যের সঙ্গে চিন্তা ও আবেগের ভাগাভাগি করতে নির্মিত হয়েছে পারিবারিক কাঠামোসহ মানব সভ্যতার সব ধাপ ও ভিত্তি।
ভাষা প্রকাশের আগ্রহটা ব্যক্তির মনের গভীর থেকে উৎসারিত। কাজেই ভাষার কথা বলতে গেলে মানব মনের অপার রহস্য এবং উদ্ভাবন প্রবণতাও আমাদের ভাবনারাজ্যে ভিড় জমায়। হয়তো অজান্তেই চিন্তার সুতোয় টান দেয় প্রাসঙ্গিক কিছু প্রশ্ন। ভাষা তাহলে কী? কীভাবে তৈরি হয় ভাষা? ভাষা ছাড়া কি আমাদের চলে? ভাষার ওপর নির্ভর করে মানুষ কী কী লাভ করে? ভাষা বিষয়ে সাধারণ মানুষ এবং গবেষকদের মত কি অভিন্ন? প্রচলিত সব অভিধান কি ভাষা সম্বন্ধে একই ব্যাখ্যা প্রদান করে? ভাষার উৎপাদন এবং কাঠামো পর্যালোচনা করলে আমরা বলতে পারি, ‘ভাষা হলো অর্থবোধক শব্দের সমষ্টি যা মানুষের মনোভাব প্রকাশ করতে সহায়তা করে।’ সাধারণের কাছে ভাষার সংজ্ঞা সহজভাবে এ রকম, ‘আমাদের মুখের কথাই ভাষা, যা দিয়ে মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করতে সহায়তা করে, তাই ভাষা।’ ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে বাংলা ভাষায় প্রথম পঠন-পাঠনের উদ্যোগ এবং ভাষার ইতিবৃত্ত বিষয়ে বাংলায় প্রথম গ্রন্থ প্রণেতা সুকুমার সেন বলেছেন, ‘মানুষের উচ্চারিত, অর্থবহ বহুজনবোধ্য ধ্বনি সমষ্টিই হলো ভাষা।
বিশেষজ্ঞদের অভিব্যক্তি, গবেষণার ফল এবং বিবেচনার দায়গুলোকে মিলিয়ে দেখলে অন্তত অনুভব করা যায় পারস্পরিক মনোভাব বিনিময়ের প্রয়োজনে বাগ্যন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত অর্থবোধক যে ধ্বনিপ্রতীকের ব্যবহার করা হয়, ওই ধ্বনিপ্রতীক প্রয়োগের পদ্ধতিই হলো ভাষা। ব্যক্তির অনুভব উত্তেজনা প্রতিক্রিয়া প্রভৃতি ভাষা উৎপাদনে প্রধান সহায়ক শক্তি। ভাষার আশ্রয় মানুষের কথোপকথন। পরবতী স্তরে তা লিখিতরূপ পরিগ্রহ করে। অবশ্য মৌখিক ভাষার কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ জন্য দরকার বক্তা ও শ্রোতার সমকালীনতা এবং নৈকট্য। সামনা-সামনি অথবা অনলাইনে (ইলেকট্রনিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে) থাকলে ভাষা প্রয়োগের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপিত হতে পারে। তা না-হলে বক্তব্য এক পাক্ষিক হয়, অন্যপক্ষের প্রতিক্রিয়া জানা যায় না। অপরদিকে, লিখিত ভাষা ক্রমাগত তার অবস্থা ও অবস্থান পরিবর্তন করে। মানুষের শিক্ষা, প্রতিবেশ, অভিরুচির ভিন্নতা ও বিবর্তনের পথ ধরে ভাষাও পাল্টে নেয় রূপ ও বৈশিষ্ট্য। ভাষার বিভিন্নতাও তৈরি হয় ভাষা সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে। অর্থাৎ বিশেষ কোনো নির্দিষ্ট ধ্বনিসমষ্টি ব্যবহারকারী জনমণ্ডলীর মানসিকতার ওপর ভর করে ভাষা বদলে যেতে পারে অথবা লাভ করতে পারে ভিন্ন ভিন্ন কাঠামো। ভাষা-সম্প্রদায় কেন্দ্রিক ছোট ছোট অঞ্চল বিভাজনের প্রেক্ষাপটে তৈরি হয় ‘উপভাষা’। একটি ভাষা ব্যবহারকারী লোকসংখ্যা অধিক হলে, ওই ভাষা ব্যবহারকারী মানুষ ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময় করতে থাকলে ধীরে ধীরে দলভিত্তিক ভাষাকাঠামো নির্মিত হয়। এভাবে তৈরি হওয়া ছোট ছোট সম্প্রদায়ের ভাষাকে ওই মূলভাষার উপভাষা বলে চিহ্নিত করা হয়। কোথাও কোথাও বিশেষ ব্যক্তি বা পরিবারের কথা বলার ভঙ্গিকে আশ্রয় করে সামান্য ভিন্নতা তৈরি হতে পারে। এমন ব্যক্তিনিষ্ঠ উপভাষাকে অনেকে নিভাষা বলে অভিহিত করেছেন। কখনো কখনো প্রাকৃতিক-রাজনৈতিক-সামাজিক কারণে উপভাষা-সম্প্রদায় মূল ভাষা-সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে এবং অতঃপর যদি ওই উপভাষা ব্যবহারকারী লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পায়, শিক্ষা ও জীবিকার ক্ষেত্র তৈরি হয় এবং মনীষী লেখকের হাত ধরে লেখ্যরূপ পরিগ্রহ করে, তখন উপভাষাটি কালক্রমে নতুন ভাষা হিসেবে বিবেচিত ও পরিচিত হয়ে উঠে। একসময় ইউরোপের প্রধান ভাষা ছিল জার্মান। এখন থেকে প্রায় পনেরো শতক আগে কিছু জনগোষ্ঠী বিচ্ছিন্ন হয়ে ইংল্যান্ডে উপনিবেশ স্থাপন করে। অতঃপর কালক্রমে তাদের একটি দলের উপভাষা বাগ্ভঙ্গি পরিবর্তিত ও বিকশিত হয়ে ইংরেজি ভাষায় পরিণত হয়েছে। ইংরেজি ভাষা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ভাষারূপে স্থান করে নিয়েছে। ভাষার গতি কেবল নিম্নমুখী নয়, ঊর্ধ্বমুখীও। ভাষা থেকে যেমন উপভাষা সৃষ্টি হয়, তেমনি উপভাষাও কালের পরিক্রমায় ভাষার রূপলাভ করতে পারে। উপভাষা থেকে ভাষায় উন্নীত হওয়ার এমন চমকপ্রদ উদাহরণ ইংরেজি। ভৌগোলিক ও সামাজিক কারণে কিছু ভাষা গ্রাস করে ফেলে তার অনেক উপভাষাকে। জন-সম্প্রদায়ের ক্রমবিলুপ্তির কারণেও হারিয়ে যায় অনেক উপভাষা।
কালের পরিক্রমায় ভাষা-সম্প্রদায়ে কিংবা ভাষা-পরিকল্পনায় যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন মাত্রা। প্রয়োজনের তাগিদে সম্পূর্ণ ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের দুটি ভাষা-সম্প্রদায়ের সাময়িক কিংবা স্থায়ীভাবে সহাবস্থানের ফলে পরস্পরের মিশ্রণে কাজ চালানো গোছের সরল ও সংক্ষিপ্ত বাক্রীতিনির্ভর নতুন ভাষা-বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে। উভয় সম্প্রদায় নিজস্ব রীতি থেকে সরে এসে এই মিশ্র রীতিকে আশ্রয় করেছে। এই ধরনের ভাষাকে ভাষাবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘মিশ্র ভাষা’ বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। এইসব ভাষার বাক্রীতি শিশুদের মতো যেনতেন প্রকারের অর্থদ্যোতক। তবে তাতে ব্যাকরণের এক ধরনের অপ্রকাশ কৌশল নজরে আসে। আন্তর্জাতিক রাজধানী এবং কমমোপলিটন সিটিতে এই ধরনের ভাষার উৎপত্তি হয়ে থাকে। বিশেষত নানা প্রান্তে ভাষারীতির প্রচলন লক্ষ করা গেছে। পৃথিবীতে মিশ্র ভাষা হিসেবে চারটি ভাষা মোটামুটিভাবে স্বীকৃত ও পরিচিত। সেগুলো হলো ১) বীচ-লা-মার ২) পিজিন, ৩) মরিশাস ক্রেওল এবং ৪) চিনুক। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বীচ-লা-মার ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এ ভাষার বেশিরভাগ শব্দ ইংরেজি, সামান্য কিছু স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ। ইংরেজি ‘বিজনেস’ শব্দটি বিকৃত চাইনিজ উচ্চারণ হলো ‘পিজিন’। এর প্রচলিত অর্থ ‘কেজো ইংরেজি’। পিজিন চীনে বহু প্রচলিত এবং জাপান ও আমেরিকায় কতক প্রচলিত প্রায় ৩০০ বছর আগে এই মিশ্র ভাষাটির উদ্ভব। পিজিনে ইংরেজি চিনা ছাড়াও অন্যান্য ভাষার কিছু শব্দ রয়েছে। মরিশাস ক্রেওলে প্রায় সব শব্দই ফ্রেঞ্চ, কিছু শব্দ আঞ্চলিক। তবে ব্যাকরণ বা ভাষা পদ্ধতি খুব সরল। একবচন-দ্বিবচন ভেদ নেই। কারক বিভক্তি নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শব্দ ও ক্রিয়ার অভিন্ন রূপ। আদিম আমেরিকার ভাষা, ইংরেজি ও ফ্রেঞ্চ মিলে ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে তৈরি হয়েছে চিনুক মিশ্রভাষা। এটি উত্তর আমেরিকার ওরেগানে উৎপন্ন ও প্রচলিত। এই ভাষায় ইংরেজি শব্দের উচ্চারণে ফ্রেঞ্চ রীতি এবং ফ্রেঞ্চ শব্দের উচ্চারণে ইংরেজি রীতি ব্যবহƒত। কলকাতায় ইংরেজি-বাংলা মিশ্রিত এক ধরনের ভাষারীতি কারও কারও দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
‘সংস্কৃতি’র পাশাপাশি যেমন প্রচলন আছে ‘অপসংস্কৃতি’ নামক শব্দটির, তেমনি ‘ভাষা’র পিছনেও লেগে আছে ‘অপভাষা’ নামধারী শব্দ। প্রকৃত অর্থে কোনো ভাষা ভালো করে রপ্ত না-করার ফলে কোনো ব্যক্তির উচ্চারণে ও শব্দ প্রয়োগে যে বিকৃতি পরিলক্ষিত হয়, তারই সামাজিক নাম ‘অপভাষা’। ভাষার প্রয়োগ এবং অপপ্রয়োগের বিষয়াদি বিবেচনায় রেখে বলা চলে, প্রাণীর বিশেষত মানুষের অনুভব ও প্রতিক্রিয়া প্রকাশের জন্য ভাষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ভাষা সৃষ্টি না-হলে মানব সভ্যতার বিকাশ আদৌ সম্ভব হতো না। ভাষার পরিচর্যা ও চর্চায় যে জাতি যত বেশি মনোযোগী, সে জাতি তত বেশি অগ্রসর। প্রাগ্রসর সমাজ-পরিপ্রেক্ষিতে ভাষাচর্চা ও ভাষা-পরিকল্পনা অবশ্য বিবেচ্য প্রসঙ্গ।
লেখক: সাংবাদিক ও জীববৈচিত্র্য গবেষক

মানবকণ্ঠ/এসএস