‘ভারত-বাংলাদেশ সুসম্পর্ক নষ্ট করতে পারে আসামের এনআরসি’

‘ভারত-বাংলাদেশ সুসম্পর্ক নষ্ট করতে পারে আসামের এনআরসি’

আসামে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন রেজিস্ট্রেশন (এনআরসির) চূড়ান্ত খসড়া থেকে ৪০ লাখ মানুষের আবেদনপত্র বাতিল করা হয়েছে। চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে দ্রুত ভোটার তালিকা দেয়ার তাড়নাকে অনেকে এই সমস্যার জন্য দায়ী করছেন। কিন্তু তারপরও বলতে হয়, এই বাতিল হওয়া নাগরিক তালিকাটি বেশ অদ্ভুত। ভারতীয় প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দীন আলী আহমেদের ভাতিজা একজন আসামের মুসলিম অধিবাসী। তার সাম কেন নেই এনআরসিতে? কেন আসাম সংসদের ডেপুটি স্পিকারের স্ত্রী অর্চনা পাল বা দুইবার আসামের সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত মাওলানা মাজহার ভূইয়ার নাম প্রাথমিক তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে? সবচাইতে অদ্ভুত বিষয় হলো- আসামের বর্তমান দুই সংসদ সদস্য বিজেপির রামাকান্ত দেউড়ি এবং এআইইউডিএফ-এর অনন্ত কুমার মালো তাদের নাম এনআরসি তালিকায় খুঁজে পাননি!

এ প্রসঙ্গে বেশ অসন্তোষের সঙ্গে দেউড়ি আসামের এক পত্রিকাকে জানান, আমি এ মাটির(আসাম) সন্তান, নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার কোনো প্রয়োজন বোধ করি না আমি। তিনি আরো বলেন, আমি মনে করি আসামে বসবাসকরা আদিবাসীদের নিজের পরিচয় নতুন করে প্রমাণের কোনো কারণই নেই।

অবশ্য এ প্রসঙ্গে নমনীয় মত প্রকাশ করেছেন এআইইউডিএফ-এর অনন্ত কুমার মালো। তিনি জানান, আগস্ট মাসে নতুন করে নিজের নাগরিক পরিচয়পত্র ফিরে পাবার দাবি এবং আপত্তি দায়ের করবেন তিনি এবং আশা প্রকাশ করেন তালিকায় তার নাম স্থান করে নেবে। তারমতই আশা নিয়ে রয়েছেন এনআরসিতে নাম না থাকা ৪০ লাখ মানুষের অনেকেই।

অবশ্য এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের (এবং সুপ্রিম কোর্টের) আশ্বাসকে অনেকেই মনে স্থান দিয়েছেন। তিনি (এবং সুপ্রিম কোর্ট) জানায়, এটি একটি খসড়া তালিকা মাত্র। এই বছরের শেষ নাগাদ সকল সত্যিকারের ভারতীয় নাগরিক তার পরিচয়পত্র হাতে পেয়ে যাবে। তার এই বক্তব্য যেমন মানুষকে আশ্বস্ত করেছে, তেমনি বিজেপির রাজনীতিবিদ ও পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য শঙ্কার জন্ম দিচ্ছে। বিজিপির এই রাজনীতিবিদেরা তেলেঙ্গায় দেয়া বক্তব্য জানান, (ভারতে অবস্থিত) অবৈধ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের গুলি করে মারা উচিত। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার এক বক্তব্যে ‘অনেক রক্তপাত ও গৃহযুদ্ধের’ হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

পশ্চিমবঙ্গে বিজিপি’র এনআরসি সংশোধনের দাবি এবং মমতার এই দাবির বিরোধিতাসহ বেশ কিছু আঞ্চলিক দলগুলির মধ্যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলিতে এনআরসি সংশোধনের দাবি জানান দিচ্ছে, এটি বর্তমানে ভারতের ঘৃণ্য রাজনৈতিক খেলার বিপজ্জনক কার্ডে পরিণত হয়েছে। সবচাইতে হাস্যকর বাস্তবতা হলো ত্রিপুরায় বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব এনআরসির সংশোধনে দ্রুত খোঁজের প্রস্তাব রেখেছে। তার পাশাপাশি উপজাতি দলগুলোও এই দাবি রাখে যার মধ্যে বিজেপির সহযোগী দলও রয়েছে। এনআরসির খসড়া প্রকাশের পর দেব মন্তব্য করেন, ‘আমার রাজ্যে কোন বিদেশি নেই, আমরা সবাই ভারতীয়।’

এই এনআরসি সংশোধনে সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সার্বিক সম্পর্কের উন্নয়ন শুরু যা বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত রাজ্যগুলোর জন্য ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার পাশাপাশি শেখ হাসিনা সরকার এই অঞ্চলে গড়ে ওঠা বিদ্রোহীদের দমনে ভারত সরকারকে যেভাবে সহায়তা করেছে, তা অতীতে কখনো লাভ করেনি ভারত। ভারতের ‘লুক ইস্ট’ পলিসির জন্যও বাংলাদেশের সঙ্গে এই সম্পর্ক বলবৎ রাখা খুবই জরুরি। মমতা ব্যানার্জির বিশেষ ভূমিকার কারণে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন সমস্যার প্রতিশ্রুত অনুসারে এখনো সমাধান মেলেনি। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার পাশাপাশি নতুন মাত্রার অসন্তোষ যোগ করতে পারে এনআরসি।

এ বছরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়টি বেশ প্রভাব রাখবে। তার ওপর ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের তীব্র বাংলাদেশ বিরোধী অবস্থান প্রকাশ এবং সংসদে বাংলাদেশের অবৈধ অভিবাসী রক্ষায় বিরোধীরা অবস্থান নিলে ভালো হবে না বলে অমিত শাহ-এর হুশিয়ারি নিশ্চিতভাবে পুশ ব্যাক নিয়ে নতুনভাবে দুশ্চিন্তায় ফেলবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে।

বাংলাদেশ বিগত সপ্তাহে ভারতে অবস্থিত ৫২ জন বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসীকে ফেরত নিয়েছে। কিন্তু তাই বলে দেশটি লাখ লাখ এনআরসি বহির্ভূতকে নিজ দেশে আশ্রয় দেবে এটা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে আসামের নাগরিক নিবন্ধনের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হবে। সেখানে এই ৪০ লাখ মানুষকে বাংলাদেশি হিসেবে দেখানো হলে নিশ্চিতভাবে সেটা বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে বিপদে ফেলবে। কেননা এই নাগরিকদের গ্রহণ করতে না চাইলে দেশটির অভ্যন্তরে থাকা মুসলিম মৌলবাদী দলগুলো বড় ধরণের সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও সংঘর্ষ শুরু করবে। ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে মানবিক দিক বিবেচনায় আশ্রয় প্রদান করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু এ সময় ৪০ লাখ আসামের নাগরিককে বাংলাদেশে গ্রহণ করার অর্থ দাড়ায় অসহায় আত্মসমর্পণ।

আর এ কারণেই বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বিষয়টি নিয়ে ভারতের মিডিয়ায় তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা।’ যার অর্থ এনআরসিতে নাম খুঁজে না পাওয়া ব্যক্তিরা অবৈধ বাংলাদেশি নয়, বরং ভারতীয়। পরোক্ষভাবে এর অর্থ দাঁড়ায়, এদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়কে কোন সম্ভাবনাই দেখছে না বাংলাদেশ। বিজেপির অভ্যন্তরে থাকা যে সকল নেতৃবৃন্দ মনে করছেন, ‘শেখ হাসিনাকে চাপ প্রয়োগ করে এই আসামের এই নাগরিকদের বাংলাদেশে পাঠানো উচিত’, তাদের এটাও বোঝা উচিত, এর মাধ্যমে ভারত তার গুরুত্বপূর্ণ এক সহযোগীকে চীনের কাছে ঠেলে দিচ্ছে।

ইনু তার বক্তব্যে আরো বলেন, মোদির মতো উদার নেতাকে যথেষ্ট বিশ্বাস করে বাংলাদেশ। যার অর্থ বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিতভাবেই দিল্লি নতুন করে ভাববে। যদি তাই সত্য হয়, এবং এই ৪০ লাখ এনআরসি বহির্ভূত মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া না হয়, তাহলে ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮ সালের পর তাদের ভবিষ্যৎ কি হবে? আর যদি এই সংখ্যাটি দাড়ায় কয়েক লাখ, তাহলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এমন দুর্গম সীমান্তবর্তী অঞ্চলে রাষ্ট্রহীন কয়েক লাখ মানুষকে নতুন সংঘাতে জন্ম দেবে না?

এই বিষয়টির সবচাইতে খারাপ প্রভাব পরে পরিবারের উপর- বলছিলেন কটন স্টেট ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগের প্রধান। সাংবাদিকদের তিনি জানান, আমার দুই ভাইয়ের নাম শেষ বাছাই পর্বে এসেছে। কিন্তু এখনো তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের নাম এনআরসি তালিকায় স্থান পায়নি। এমন আরো অনেক ঘটনাই রয়েছে। এর পাশাপাশি প্রতি নিয়ত হাস্যরসের কারণ হওয়া এবং এরআরসিতে স্থান পাবার জন্য এ দরজা থেকে ও দরজায় কড়া নাড়া ত আছেই। সেই সঙ্গে রয়েছে এনআরসি বিষয়ক কর্মকর্তাদের লাঞ্ছনা ও অপমান। এ সব কিছুর পরও যারা ভারতের এনআরসি তালিকায় নাম উঠাতে পারবেন না, তারা কি করবেন!

মানবকণ্ঠ/এসএস