হ্যাশট্যাগ মি টু ক্যাম্পেইনে

ভারতীয় মন্ত্রী এমজে আকবরের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ

এমজে আকবরনারীদের যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে বিশ্ব ব্যাপী চলা ‘হ্যাশ ট্যাগ মি টু’ #Metoo -এর প্রতিক্রিয়ায় এক সাংবাদিকের টুইটের পর থেকে অনেক নারী সাংবাদিক যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এমজে আকবরের বিরুদ্ধে। তিনি দেশটির কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য ও ভারতের স্বনামধন্য বেশ কিছু পত্রিকার সাবেক সম্পাদক।

ভারতের নারী সাংবাদিক প্রিয়া রামানি নিজের টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে এম জে আকবরের নাম উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট যৌন লাঞ্ছনার অভিযোগ আনেন ‘মি টু’ হ্যাশ ট্যাগ ব্যবহার করে। তার টুইট সামনে আসার পর আরও বেশ কয়েকজন সাংবাদিক এমজে আকবরের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ করেন। চলতি সপ্তাহে ফার্স্টপোস্ট নামে একটি পোর্টালেও নামকরা একজন সাবেক সম্পাদকের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার বিশদ বিবরণ প্রকাশ করা হয়। একজন নারী সাংবাদিক তার অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেন সেখানে। এই পোস্টে স্পষ্ট উল্লেখ না থাকলেও অনেকেই ধারণা করছেন সেখানেও অভিযুক্ত ব্যক্তি এমজে আকবর।

এ বিষয় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজের কাছে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি কোন প্রতিক্রিয়া জানাননি। মঙ্গলবার সকালে একটি অনুষ্ঠানে সুষমা স্বরাজ যোগ দিতে এলে ট্রিবিউন গোষ্ঠীর সাংবাদিক স্মিতা শর্মা প্রশ্ন করেন, ‘ম্যাডাম, অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আপনার জুনিয়র মন্ত্রী এমজে আকবরের বিরুদ্ধে। আপনি নিজে একজন মহিলা, এখন এই অভিযোগের সাপেক্ষে কোনও ব্যবস্থা কি নেওয়া হবে?’

কিন্তু এই প্রশ্নের জবাবে কিছু না বলে সুষমা স্বরাজ হেঁটে চলে যান বলে জানায় বিবিসি। সেখানে আরো উল্লেখ করা হয়, তার প্রতিক্রিয়া থেকেই স্পষ্ট, এই অভিযোগ ভারতের বর্তমান সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলেছে এবং তারা আপাতত বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইছেন।

এমজে আকবরের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করে ভারতের সাংবাদিক প্রিয়া রামানি টুইটারে জানান, কীভাবে মুম্বাইয়ে নিজের হোটেল কক্ষে ডেকে নিয়ে তার তখনকার সম্পাদক মি আকবর তার প্রতি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কার্যকলাপ করেছিলেন। তিনি লেখেন, ‘সেদিন বুঝেছিলাম, লেখক হিসেবে তিনি যতটা প্রতিভাবান, যৌন শিকারী হিসেবেও ততটাই। মিনিবার থেকে তিনি আমাকে ড্রিঙ্ক অফার করলেন, আমি না-বলার পর তিনি নিজে ভোডকা খেতে শুরু করলেন। তারপর জানালা দিয়ে মুম্বাইয়ের বিখ্যাত কুইনস নেকলেস দেখতে দেখতে তিনি আমায় পুরনো হিন্দি গান শোনাতে শুরু করলেন। হোটেলের ঘরের বিছানা ততক্ষণে রাতের মতো তৈরি করা হয়ে গেছে। একটু পরে নিজের পাশে ছোট্ট একটা জায়গা দেখিয়ে আমাকে বললেন, এখানে এসে বসো! আমি শুকনো হেসে বললাম, না। সেদিনের মতো রক্ষা পেলেও নিজের কাছে আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আর কোনওদিন আপনার সঙ্গে একলা কোনও ঘরে কিছুতেই যাব না!’

প্রিয়া রমনি আরো বলেন, যুগ পাল্টালেও এম জে আকবরের মতো সম্পাদকরা আজও একই রকম রয়ে গেছেন। তার কথায়, ‘এরা আজও মনে করেন প্রতি বছর যে নতুন ব্যাচের তরুণী মেয়েরা তার কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে, তাদের অনায়াসে বলা যায় ‘দ্যাখো, আমি শাওয়ার নিচ্ছি’, ‘একটু ম্যাসেজ দিতে পারো? কিংবা শোল্ডার রাব?’, ‘আমি আমার ব্লো জবের জন্য এখন তৈরি’, ‘তুমি কি বিবাহিত’ এই সব!’

প্রিয়া রামানি এম জে আকবরের নাম প্রকাশ করার কিছুক্ষণ পরেই প্রেরণা সিং বিন্দ্রা নামে আর এক সাংবাদিক টুইটারে লেখেন কীভাবে তার সম্পাদক আকবরের প্রতি তার যাবতীয় শ্রদ্ধা চুরমার হয়ে গিয়েছিল। তিনি লেখেন, আমাদের পুরো ফিচার টিম নিয়ে যখন মিটিং হচ্ছে, তখনও তিনি সেখানে প্রকাশ্যেই যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করতেন। মেয়েরা অনেকেই আমাকে বলেছিল তাদের তিনি একা হোটেলের ঘরে দেখাও করতে বলেছেন বহুবারই!’

বিন্দ্রা নামের অপর একজন লেখেন, একবার মহারাষ্ট্র মন্ত্রালয়ে একটা স্টোরির জন্য গিয়েছিলাম, সেখানে এক কর্মকর্তা আমাকে জড়িয়ে ধরেন। যখন আমি অভিযোগ জানানোর কথা ভাবি, তখন মনে হল কার কাছে বলব – আমাদের সম্পাদক নিজেও তো একই ধাতুতে গড়া!

এম জে আকবর ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত ও সুপরিচিত সাংবাদিকদের একজন। পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার আদি বাসিন্দা তিনি। মাত্র ৩১ বছর বয়সে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পান তিনি, নতুন ওই খবরের কাগজটিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর কৃতিত্ব অনেকটাই ছিল তার। পরে ভারতে ‘দ্য এশিয়ান এজ’ পত্রিকাগোষ্ঠীর প্রধান কর্ণধার ও সম্পাদক হিসেবেও তিনি বহুদিন দায়িত্ব সামলেছেন।

আশির দশকের শেষ দিকে এম জে আকবর সাংবাদিকতা ছেড়ে রাজনীতিতে যোগদান করেন। কংগ্রেসের টিকিটে বিহারের কিষেণগঞ্জ থেকে নির্বাচিত হয়ে তিনি এমপি-ও হয়েছিলেন। একদা রাজীব গান্ধীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হলেও পরে তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। ২০১৪-র সাধারণ নির্বাচনের আগে রাজনীতির অন্যতম বড় চমক ছিলো তার বিজেপিতে যোগ দেয়া।

নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়েই তিনি বিজেপি থেকে রাজ্যসভা এমপি হয়েছেন। দায়িত্ব পেয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীরও। একজন বাংলাভাষী মন্ত্রী হিসেবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ সংক্রান্ত বিষয়গুলো তিনিই মূলত দেখাশুনো করেন। বাংলাদেশ থেকে নেতা-মন্ত্রীরা ভারত সফরে এলেও প্রায় অবধারিতভাবেই তারা এম জে আকবরের সঙ্গে দেখা করেন, বৈঠক করেন। তার বিরুদ্ধে এ সকল যৌন লাঞ্ছনার অভিযোগে বেশ কয়েকদিন ভারতের মিডিয়া উত্তপ্ত থাকলেও বিষয়টি নিয়ে এখন কোন মন্তব্য করেননি আকবর। বিবিসি জানায়, তিনি এখনো নাইজেরিয়ায় সফরে আছেন। বিবিসি।

মানবকণ্ঠ/আরএ

Leave a Reply

Your email address will not be published.