ভাঙছে নদী কাঁদছে অসহায় মানুষ

ঢাকার বাইরে ডেস্ক:
নাটোরের লালপুর, মাদারীপুরের শিবচর এবং চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় নদী ভাঙনে নিঃস্ব হচ্ছে অনেক পরিবার। কেউ কেউ ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
নাটোর: লালপুর উপজেলায় পদ্মা নদীতে পানির চাপে সিসি ব্লক ধসে নদীগর্ভে বিলীন হতে চলেছে। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে নদী তীরবর্তী ৮টি গ্রাম। আতঙ্কে দিন কাটছে গ্রামগুলোর অধিবাসীদের। নদী তীরবর্তী পালিদেহা, গৌরীপুর, নুরুল্লাহপুর, লক্ষ্মীপুর, তিলকপুর, লালপুর, মোমিনপুর, বিলমাড়িয়া গ্রামের মানুষ তাদের ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কে রয়েছেন। একই সঙ্গে আবাদি জমিও নদীতে বিলীন হতে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে নুরুল্লাহপুর গ্রাম। নিজেদের ভিটামাটি ও নদী তীরের সিসি ব্লক রক্ষায় এসব গ্রামবাসী নিজেরাই বাঁশ, কাঠ, কচুরিপানা ও গাছপালা ব্যবহার করে ধস ঠেকাতে প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, নদী তীরবর্তী নুরুল্লাহপুর আতাউরের আমতলা নামক স্থানে সিসি ব্লক নির্মিত তীর রক্ষা বাঁধে প্রায় ৩০০ গজ ধস নেমেছে। ওই গ্রামের আমজাদ হোসেন (৭৫), সামির উদ্দিন (৭০), রেজাউল (৬০), আবু বক্কার (৪৬), আহাদ আলী মালিথা (৭৫) জানান, কয়েক বছর আগে নির্মিত এই বাঁধ পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধসে গেছে। দু’দিন আগে ধসে যাওয়ার পরিমাণ ছিল প্রায় ১০০ গজ কিন্তু এখন সেটি প্রায় ৩০০ গজ ছাড়িয়ে গেছে। পানি কমতে থাকলে তা বিকট আকার ধারণ করবে। নুরুল্লাহপুর গ্রামের বাসিন্দারা নদী ভাঙন থেকে রক্ষায় বিশেষ দোয়া প্রার্থনা ও মিলাদ মাহফিল করেছেন এবং স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁশ ও কাশফুল দিয়ে ভাঙনরোধের শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, নদী থেকে প্রভাবশালীদের বেপরোয়া বালু উত্তোলন আর বর্তমানে পানির প্রচণ্ড চাপে পদ্মা তীর রক্ষায় নির্মিত সিসি ব্লকসহ নদীর তীর প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পদ্মার লালপুর অংশে অবস্থিত ৮টি গ্রাম রক্ষার্থে উপজেলার তিলকপুর থেকে গৌরীপুর পর্যন্ত ২২৬.০৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সিসি ব্লক দিয়ে ৮ দশমিক ৫৮৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বাঁধ নির্মাণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে নদী থেকে বালু উত্তোলন করছে। এতে পাড়ে ভাঙন সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হাফিজুর রহমান জানান, ভাঙন রোধে বালুর বস্তা ফেলার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। তাদের উদ্যোগ না দেখে গ্রামবাসী নিজেরাই ভাঙনরোধের চেষ্টা করছেন।
নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী আশেক আলী জানান, তারা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করেছেন। আগামী দু’-একদিনের মধ্যে বিশেষজ্ঞদের দ্বারা টেকনিক্যালি ধসের পরিমাপ ও সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণ করা হবে।
লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মুল বানীন দ্যুতি জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ব্লক ধসের ব্যাপারে ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে। আশা করি শিগগিরই সমস্যার সমাধান হবে।
শিবচর (মাদারীপুর) : পদ্মার পানি বাড়ায় মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার ৩টি ইউনিয়নে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। জানা যায়, উপজেলার চরজানাজাত, বন্দরখোলা ও কাঠালবাড়ি ইউনিয়নে ব্যাপক নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনের শিকার পরিবারগুলো কোনো রকমে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছেন। হুমকিতে রয়েছে চরজানাজাতে পূর্ব খাস বন্দর খোলার রহমিয়া দাখিল মাদ্রাসা যা এখনো উদ্বোধনও হয়নি। আরো রয়েছে সোলার প্যানেলচালিত গ্রামীণ ফোন টাওয়ার, ব্রিজসহ শত শত ঘরবাড়ি।
৩-৪ সপ্তাহে ৪টি বিদ্যালয় ভবন, ৫ শতাধিক ঘরবাড়িসহ চরজানাজাত ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক, খাসেরহাটের অর্ধশত দোকান ও চরজানাজাত ইউনিয়নের মাধ্যমিক স্কুল, চরজানাজাত ইলিয়াছ আহম্মেদ চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়, আবদুল মালেক তালুকদার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মজিদ সরকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বন্দরখোলার ৭২ নম্বর নারিকেলবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অনেক ফসলি জমি হারিয়ে ক্ষতির মাঝে পড়েছে ভাঙনকবলিত পরিবারগুলো।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, নদীভাঙন আমাদের এখানে সে রকম নেই। দুই একটা স্কুল ভেঙেছে সেটি অন্য জায়গায় স্থানান্তর করেছি। নদী ভাঙনকবলিতদের বিভিন্ন ধরনের ত্রাণ দিয়েছি।
লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম): লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ পূর্ব হাজারবিঘা এলাকায় টংকাবতী নদীতে শফি সওদাগর সড়ক বিলীন হয়ে গেছে। পাহাড়ি ঢলে টংকাবতী নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সে াতে পাড় ভেঙে সড়কের প্রায় পুরো অংশ নদীতে চলে গেছে। সরেজমিন দেখা যায়, শফি সওদাগর সড়কটির এক স্থানে প্রায় পুরো অংশ বিলীন হয়ে গেছে। ফলে ওই অংশ একবারে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ওই সড়ক দিয়ে চলাচল করে শত শত শিক্ষার্থীসহ জনসাধারণ। দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সবাইকে। জানা গেছে, টংকাবতী নদীতে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন চলে। বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢলে পানি বেড়ে যাওয়ায় নদীর পাড় ভাঙা শুরু হয়। প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করে বলে জানান স্থানীয়রা। ওই এলাকার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মো. ফেরদৌস মানবকণ্ঠকে বলেন, শফি সওদাগর সড়কটি হাজার বিঘা থেকে পদুয়া যাওয়ার একমাত্র সড়ক। বালুখেকোরা টংকাবতী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় এই ভাঙনের ঘটনা ঘটছে। প্রশাসন এগুলো দেখে না। অনেক দিন ধরে কোনো জনপ্রতিনিধির দেখা নেই। দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পূর্ব হাজার বিঘার হাজার হাজার বাসিন্দাসহ ওই সড়ক দিয়ে চলাচলকারীদের। স্থানীয় কৃষক আলী আহমদ বলেন, টংকাবতী নদীর পাড় ঘেষা সড়কটি ভেঙে যাওয়ায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নদীর পাড় মেরামত না করলে সড়কের সড়কের বৃহৎ অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। সড়ক ভেঙেছে ৩ মাস পার হয়ে গেল, কোনো প্রতিনিধির দেখা নেই। এ ব্যাপারে আমিরাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এসএম ইউনুচ মানবকণ্ঠকে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ ১ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আগামী সপ্তাহে কাজ শুরু হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.