একাদশ জাতীয় নির্বাচন: কিশোরঞ্জ ৩

ভরসা কমছে আশরাফে মাথাচাড়া দিচ্ছে নতুনরা

পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক হিসেবে সমধিক পরিচিত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দুইবারের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম প্রথমবারের মতো মনোনয়ন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে পড়তে যাচ্ছেন। নিজের নির্বাচনী এলাকা কিশোরগঞ্জ-১ আসন (সদর ও হোসেনপুর) থেকে টানা চারবার এমপি নির্বাচিত হওয়া অপ্রতিদ্বন্দ্বী এই রাজনীতিকের মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বী হননি দল কিংবা মহাজোটের কেউই। সেই ধারায় এবার ছন্দপতন হচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের এই যোগ্য উত্তরসূরির অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের পুত্র রাসেল আহমেদ তুহিন। সেইসঙ্গে মহাজোটের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে শক্ত অবস্থানে আছেন ডা. এস এম মোস্তাফা খান পাঠানও। কিশোরগঞ্জের রাজনৈতিক বোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে থাকা কিশোরগঞ্জ সদর আসনটি সৈয়দ আশরাফের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগ নিজেদের দখলে আনতে সক্ষম হয়। যে কারণে দল কিংবা মহাজোটর কেউ এতে ভাগ বসাতে সাহস করেনি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যু, নিজের শারীরিক অবস্থার অবনতি, এলাকার জনমানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ততা না থাকা সর্বোপরি জাতীয় রাজনীতি থেকে ক্রমশ দূরে সরে থাকার কারণে এখানে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হয়েছে এই রাজনীতিকের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচন পর্যন্ত মহাজোট অক্ষুন্ন থাকলে হিসেবটা আশরাফ-তুহিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। এতে ভোটে প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কম। তবে জাতীয় পার্টি জোট থেকে বেরিয়ে নির্বাচন করলে হিসেব পাল্টে যেতে পারে নিমিষেই। ডা. মোস্তাফা খান পাঠানের বিপুল জনসম্পৃক্ততা এবং ক্লিন ইমেজ আওয়ামী লীগের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে। মহাজোটের ভোট ব্যাংক থেকে অনেক ভোট নিজের করে নিতে পারেন জাপা প্রার্থী। সেইসঙ্গে স্থানীয় বিএনপি যদি তাদের শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ পায়, তবে হারাতে হতে পারে টানা ২২ বছর যাবত ক্ষমতাসীনদের দখলে থাকা এই আসনটি।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনগুলোর বেশ কয়েক নেতা জানান, সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের পরিচ্ছন্ন রাজনীতির কারণে কিশোরগঞ্জের মানুষ তাকে বার বার ভোট দিয়ে এমপি হিসেবে নির্বাচিত করেন। কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে সময় দেয়ার কারণেই হোক কিংবা অন্য কোনো ব্যস্ততায়ই হোক, এলাকার সাধারণ মানুষ সুখে-দুঃখে পাশে পাননি তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিকে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের কেউ কেউ ঢাকায় এসে যোগাযোগ করতে পারলেও কার্যত জনবিচ্ছিন্নই ছিলেন তিনি। এটিই চরম বাস্তবতা। আর এই সুযোগটিকেই কাজে লাগাতে চাচ্ছেন একই দল ও জোটের কেউ কেউ।

তারা বলেন, বিজয়ের দিনের একদিন পর (১৭ ডিসেম্বর) বিজয় পাওয়া রাজাকারের এই ঘাঁটিকে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দল আওয়ামী লীগের দখলে আনতে সৈয়দ আশরাফকে তাদের যোগ্য অভিভাবক মনে করেছিলেন। যে কারণে বার বার তাকে এমপি বানিয়েছেন তারা। প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতায় তিনি বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেছেন। বর্তমানেও জনপ্রশাসনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন।

এলাকার জনগণ কিংবা দলের নেতাকর্মীদের দু’হাত ভরে এভাবে দেয়ার আশানুরূপ বিনিময় তিনি দিতে পারেননি বলেই মনে করছেন তারা। যে কারণে স্বচ্ছ রাজনীতিক হলেও জাতির জনকের ঘনিষ্ঠ সহচর সৈয়দ নজরুল ইসলামের এই উত্তরসূরির ওপর তারা আর ভরসা করতে পারছেন না।
আর এই সুযোগটিকে কাজে লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন আওয়ামী লীগেরই অপর একটি পক্ষ। তারা সামনে নিয়ে আসছেন তরুণ রাজনীতিক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সন্তান রাসেল আহমেদ তুহিনকে। এরই মধ্যে কিশোরগঞ্জ সদর ও হোসনপুরে তুহিনকে নিয়ে তারা গণসংযোগ শুরু করেছেন। শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও অবাধে বিচরণ করছেন তুহিন। বাবার মতো সারল্য এবং মানুষের সঙ্গে সহজ মেলামেশায় অল্প কয়েক দিনেই জননন্দিত হয়ে উঠেছেন তিনি। ক্ষমতাসীনদের এই অংশটি মনে করছে, নানা কারণে সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়া দলীয় সমর্থক, নেতাকর্মী এবং সাধারণ ভোটাররা রাষ্ট্রপতিপুত্রকে সহজভাবে গ্রহণ করে নেবে। এতে করে আসনটি আওয়ামী লীগকে আর হারাতে হবে না।

এদিকে আওয়ামী লীগের অন্যতম সতীর্থ জাতীয় পার্টি কিশোরগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ এই আসনটি এবার তাদের করে নিতে চাইছে। এজন্য মেধাবী রাজনীতিক এবং সাধারণ মানুষের আস্থাভাজন ব্যক্তিত্ব ডা. এস এম মোস্তাফা খান পাঠানকে তাদের প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামিয়েছে। এরই মধ্যে জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এই আসনের জন্য তাকে মনোনীত করেছেন। দলের সমর্থন পেয়ে জেলা জাপার সিনিয়র এই সহসভাপতি ইতিমধ্যে গণসংযোগেও নেমেছেন।

মহাজোট একসঙ্গে নির্বাচন করলেও আসন ভাগাভাগিতে নিজেদের ভাগে এই আসনটি চান স্থানীয় জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা। তারা মনে করেন, ডাক্তারি পেশায় থাকার কারণে শহর ও গ্রামে এমনতিইে তার ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। সেইসঙ্গে আওয়ামী লীগ তাদের সঙ্গে থাকলে আসনটি হারানোর কোনো সম্ভাবনাই নেই। আর মহাজোট থেকে বেরিয়ে জাতীয় পার্টি এককভাবে ভোট করলেও তিনি আওয়ামী লীগের যে কোনো প্রার্থীর জন্যই বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবেন।

কিশোরগঞ্জের সচেতন সমাজ এবং রাজনৈতিক বোদ্ধারা মনে করছেন, সবকিছু মিলিয়ে কিশোরগঞ্জ সদর আসনটিতে টিকে থাকা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের জন্য অনেকটা চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে। যদিও কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের বৃহৎ একটি অংশ এখনো তাকেই চান। এক-এগারোর পর দলের মুখপাত্র হিসেবে তিনি সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।

নেতাকর্মী আর নাগরিক সমাজের মধ্যে তার একটি স্বচ্ছ ভাবমূর্তিও গড়ে উঠেছে গত কয়েক বছরে। তিনি অনেকের নজর কেড়েছেন অবিচল নিষ্ঠা ও সততার জন্য। তাদের মতে, ঘুনে ধরা সমাজে এমন মনের মানুষ, এমন একজন স্বচ্ছ রাজনীতিক থাকাটা খুবই জরুরি। সৈয়দ আশরাফের মাধ্যমে হয়তো ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ হবে না, কিন্তু সমাজে স্বচ্ছতার প্রতীক হিসেবে তিনি উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারবেন।

মানবকণ্ঠ/এএএম

Leave a Reply

Your email address will not be published.