নাখালপাড়ায় ‌‌‌‌‌‌‌‌‘জঙ্গি আস্তানায়’ অভিযান

বড় স্থাপনায় হামলার ছক

৩ জেএমবি ‘জঙ্গির’ লাশ উদ্ধার, সপ্তাহ খানেক আগে বাসা ভাড়া নেয়

রাজধানীর পশ্চিম নাখালপাড়ায় একটি ‘জঙ্গি আস্তানায়’ আরো একটি সফল অভিযান চালিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অদূরে ওই আস্তানায় অভিযান শেষে উদ্ধার করা হয়েছে তিন তরুণের লাশ। মাত্র এক সপ্তাহ আগে ভুয়া পরিচয়ে বাসা ভাড়া নেয়া ওই তিন তরুণই জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপের সদস্য। রাজধানীর বড় কোনো স্থাপনায় তারা হামলার পরিকল্পনা করছিল বলে জানিয়েছেন র‌্যাব কর্মকর্তারা।

পুরনো এমপি হোস্টেলের পেছনে ১৩/১ পশ্চিম নাখালপাড়ার ‘রুবি ভিলা’ নামে ৬ তলা বাড়ির ৫তম তলায় গতকাল শুক্রবার ভোরে অভিযান চালায় র‌্যাব। এ সময় র‌্যাব ও জঙ্গিদের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি, বোমা ও গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরে দুপুরের দিকে বাড়িটির ভেতর থেকে তিন ‘জঙ্গির’ লাশ ও বিস্ফোরক এবং একটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

গতকাল বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে নাখালপাড়ার ওই ‘জঙ্গি আস্তানাটিতে’ অভিযান শেষ হয়। পরে সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান জানান, আস্তানাটি থেকে জাহিদ ও সজীব নামের দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া গেছে। তবে দুটি ছবি একই ব্যক্তির। ধারণা করা হচ্ছে, দু’জনই একই ব্যক্তি। বাকিদের পরিচয় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে নিহত তিনজনের বয়স ২৫ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে। তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে তেজগাঁও থানা পুলিশ লাশ তিনটির সুরতহাল করেছে। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য লাশ তিনটি সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জঙ্গিদের কক্ষটি সিলগালা করে দেয়া হয়েছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টা থেকে ১৩/১ পশ্চিম নাখালপাড়ার ‘রুবি ভিলা’ নামে বাড়িটি ঘিরে ফেলেন র‌্যাব সদস্যরা। বাড়িটির পঞ্চমতলার একটি কক্ষে ছিল তিন ‘জঙ্গি’। তাদের আত্মসর্মপণের জন্য বারবার হ্যান্ডমাইকে আহ্বান জানান র‌্যাব সদস্যরা। কিন্তু সে আহব্বানে সাড়া দেয়নি ভেতরে থাকা ‘জঙ্গিরা’। উল্টো র‌্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে হাতে তৈরি গ্রেনেড ও বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় ভেতরে অবস্থান নেয়া তিন ‘জঙ্গি’। এক পর্যায়ে ছয়তলা বাড়িটিতে থাকা নিরপরাধ বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়। ভোরের দিকে চূড়ান্ত অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছেন র‌্যাব কর্মকর্তারা। ভোরে এলাকাবাসীর ঘুম ভাঙে তুমুল গোলাগুলির শব্দে।

পশ্চিম নাখালপাড়ার ওই জঙ্গি আস্তানায় অভিযান শেষে সকাল ১০টার পরপর ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেন র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ। বাড়িটির পঞ্চম তলার এক মেসে তিন তরুণের লাশ পাওয়ার কথা জানিয়ে র‌্যাব প্রধান বলেন, সেই সঙ্গে সেখানে কয়েকটি ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি), বিস্ফোরক জেল ও পিস্তল পাওয়া গেছে। গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, নিহত তিন তরুণই জেএমবির সক্রিয় সদস্য।

বাড়িটির মালিক ও কেয়ারটেকারের বরাত দিয়ে বেনজীর আহমেদ জানান, জাহিদ নামের এক যুবক গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর পাঁচ তলার একটি কক্ষ ভাড়া নেয়। জাহিদ মালিককে বলেছিল, সে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করে। দুই ভাইকে নিয়ে ওই বাসায় সে থাকবে। এরপর ৪ জানুয়ারি ‘জাহিদ’ পরিচয় দেয়া সেই যুবক বাসায় ওঠে। বাকি দু’জন ওঠে ৮ জানুয়ারি। পঞ্চম তলার ওই ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে তারা তিনজন থাকত। বাকি দুটি কক্ষে আগে থেকেই আরো চারজন থাকত।

স্থানীয়দের বরাত দিয়ে র‌্যাব প্রধান জানান, বাড়িটির মালিক সাব্বির রহমান এক সময় বিমানের স্টুয়ার্ড ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ। আনুমানিক ১৫ বছর আগে আড়াই কাঠা জমির ওপর বাড়িটি নির্মাণ করেন তিনি।

আর অভিযান শেষে গতকাল বিকেলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক ও মুখপাত্র কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান গণমাধ্যমকে জানান, নিহত তিন জঙ্গির বয়স ২৫ থেকে ২৮ এর মধ্যে। তাদের নাম-পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পেরেছি তারা জেএমবির সদস্য। তিনি বলেন, ওই বাড়িতে আস্তানা গড়ে জঙ্গিরা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলাসহ নাশকতার পরিকল্পনা করছে বলে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পরই র‌্যাব সেখানে অভিযান চালায়।

এই র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, বাড়িটির পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার চারটি ফ্ল্যাটের মধ্যে তিনটিই মেস হিসেবে ভাড়া দেয়া হয়েছিল। ওই তিন বাসায় ২১-২২ জন থাকত। আর পুরো ভবনে দশটি ফ্ল্যাটে ৬০ জনের বেশি মানুষের বসবাস। জঙ্গিদের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার জন্য ওই বাড়ির কেয়ারটেকার রুবেলকে তারা জিজ্ঞাসাবাদ করছেন বলেও জানান র‌্যাবের মুখপাত্র।

এর আগে সকালে র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য ছিল যে, এখানে কয়েকজন সংঘবদ্ধ ও সক্রিয় জঙ্গি অবস্থান করছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার রাত ২টা থেকে আমাদের এই অভিযান শুরু হয়েছে। অভিযানের শুরুতে, যেহেতু এই ভবনটি নিচতলায় খুব সুরক্ষিত অবস্থায় ছিল, তাই আমাদের ফটক খোলার জন্য বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, কিন্তু সেটি কেউ না খোলায় ফটকটি ভাঙা হয়েছে। পরে আমরা নিশ্চিত হই যে, ভবনের পাঁচতলার একটি কক্ষে জঙ্গিরা আছে। এরপরই অভিযান পরিচালনা করা হয়। জঙ্গিরা গ্রেনেড নিক্ষেপ করে, সেখানে গোলাগুলি করে। এতে একাধিক জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে আমরা দেখতে পেয়েছি।

মুফতি মাহমুদ বলেন, একটি বিস্ফোরক রাখা ছিল গ্যাস বার্নারের ওপর। তাতে তাদের মনে হয়েছে, চুলার ওপর রেখে আগুন জ্বালিয়ে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটাতে চেয়েছিল জঙ্গিরা। কিন্তু অভিযানের শুরুতেই র‌্যাব ওই বাড়ির গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেয়ায় তা আর সম্ভব হয়নি। জঙ্গিরা গ্যাস ছেড়ে দিয়ে ওইভাবে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারলে পুরো ভবনের বাসিন্দাদের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারত বলে জানান তিনি।

র‌্যাব কর্মকর্তা আরো বলেন, যেহেতু একটি ছয়তলা ভবন, প্রাথমিকভাবে নিরাপত্তার স্বার্থে অন্য বাসিন্দা যারা ছিল, তাদের সরিয়ে নেয়া হয়। অভিযানের সময় দুই র‌্যাব সদস্য আহত হয়েছেন। এদের একজনের স্প্লিন্টার লেগেছে, আরেকজন সামান্য আহত হয়েছেন। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।

‘রুবি ভিলায়’ আগেও কয়েকদফা অভিযানে গ্রেফতার ১২ জঙ্গি: নাখালপাড়ার ‘জঙ্গি আস্তানা’ গড়ে তোলা ওই ভবনটিতে গত চার বছরে অন্তত তিন দফায় ১২ জনকে জঙ্গি সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে র‌্যাব। ভবনটির মালিক সাব্বির হোসেন। তিনি বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। র‌্যাব ও পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, ২০১৩, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে তিন দফায় অভিযান চালিয়ে এই ভবন থেকে জঙ্গি সন্দেহে ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

ঘটনাস্থলে তেজগাঁও থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আমিনুল ইসলাম বলেন, বছরখানেক আগে ওই ভবন থেকে তিনজনকে গ্রেফতার করেছিল র‌্যাব। র‌্যাব পরে তাদের পুলিশে হস্তান্তর করে। পরে দু’জনকে ছেড়ে দেয়া হয়, একজনের নামে মামলা হয়। এ ছাড়া পুলিশও অতীতে ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়েছিল। তবে আগে গ্রেফতারদের কেউ কেউ জামায়াত-শিবিরের কর্র্মী ছিলেন বলে ভাষ্য কয়েক স্থানীয় বাসিন্দার।

‘রুবি ভিলার পাশের ভবনে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন নাছির আহমেদ (৩০)। তিনি ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, রাতে ঘুমানোর পর হঠাৎ গুলির শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। তখন রাত প্রায় দুইটা-আড়াইটা হবে। তিন থেকে চারটি গুলি হয়। কিছু পরে মাইকিং শুনতে পাই, বলা হচ্ছিল, আপনারা আত্মসমর্পণ করুন। এ রকম এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলছে, যোগ করেন নাছির। আর ঘটনাস্থল সংলগ্ন পূর্ব তেজকুনিপাড়ার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বলেন, বৃহস্পতিবার রাত আড়াইটার দিকে হঠাৎ চার-পাঁচটা গুলির শব্দ পাই। এর একটু পরেই মাইকিং শুনি, সেখানে র‌্যাবের পক্ষ থেকে বারবার আত্মসমর্পণ করার কথা হচ্ছিল।

মানবকণ্ঠ/এসএস