বড় দু’দলের কোন্দলে সুযোগ নিতে পারে তৃতীয় পক্ষ

বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের মধ্যে রয়েছে একাধিক গ্রুপিং। এখানকার আওয়ামী লীগ তিন ভাগে এবং বিএনপি দু’ভাগে বিভক্ত। তবে ১৪ দলের শরীক দল জাতীয় পার্টির মধ্যে গ্রুপিং না থাকলেও বর্তমান এমপির কর্মকাণ্ডে খুশী নন দলের নেতাকর্মীরা। তবে দু’বার সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে ছাড় দেয়ায় আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী দেয়ার আশা করছেন মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। ১৯৯১ সাল থেকে এ আসনে যে দলের প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছে সে দল সরকার গঠন করেছে। এ কারণে আগামী নির্বাচনে বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি শক্ত প্রার্থী দিয়ে এ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে চায়। বরিশাল-৬ আসন থেকে গত ৫টি জাতীয় নির্বাচনে ২ বার বিএনপি, একবার আওয়ামী লীগ এবং পরপর ২ বার মহাজোটের শরীক জাতীয় পার্টির প্রার্থী এমপি নির্বাচিত হন।

আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হচ্ছেন— কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) হাফিজ মল্লিক, বাকেরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান শামসুল আলম চুন্নু, সাবেক আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি মরহুম সৈয়দ মাসুদ রেজার স্ত্রী আইরিন রেজা, বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সহ-সাধারণ সম্পাদক আওয়ামী লীগ নেতা প্রকৌশলী মনজুরুল হক মঞ্জু, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপকমিটির সদস্য এবং সংরক্ষিত আসনের সাবেক এমপি পারভীন তালুকদারের স্বামী ড. মোয়াজ্জেম হোসেন মাতুব্বর।

বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হচ্ছেন— সাবেক এমপি আবুল হোসেন খান, আব্দুস শুক্কুর বাচ্চু নেগাবান, যুবদলের কেন্দ্রীয় ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক লায়ন নুরুল ইসলাম খান মাসুদ ও যুবদলের কেন্দ্রীয় সদস্য গোলাম মাওলা শাহীন।

এ আসনে বর্তমানে এমপি হচ্ছেন— জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম নাসরিন জাহান রত্না। তিনি জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারের স্ত্রী। রুহুল আমিনের ভোট ব্যাংকের ওপর নির্ভর করে রত্না একবার বাকেরগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঢাকায় বসে থেকেই এমপি নির্বাচিত হন রত্না। ওই নির্বাচনে ১৪ দল থেকে ওই আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু এমপি নির্বাচিত হয়ে এলাকার উন্নয়নে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেননি হঠাৎ করে এমপি বনে যাওয়া জাতীয় পার্টির এ নেত্রী। এমনকি টিআর, কাবিখাসহ বিভিন্ন সরকারি অনুদানের সঠিক ব্যবহার না করায় রত্নার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। ক্ষমতায় থাকাকালীন বেশিরভাগ সময় এমপি রত্না তার নেতাকর্মীদের দূরে ঠেলে রাখেন। এ কারণে নেতাকর্মীরাও তার ধারে কাছে যেতেন না। নেতাকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয় এমপি রত্নার। তবে রত্নার বিরুদ্ধে একাধিক জাতীয় পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হওয়ার পর কিছু নেতাকর্মীকে তিনি মূল্যায়ন শুরু করেন। তার প্রতি ক্ষুব্ধ ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তাদেরও মূল্যায়ন করেননি তিনি। এ কারণে আগামী নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে তৃণমূল নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দাবি করেছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে। তা না হলে সেখানকার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ধরে রাখা সম্ভব হবে না।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে এ আসনে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপির প্রার্থী বরিশাল ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ মরহুম ইউনসু খান, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মাসুদ রেজা এমপি নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হন বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেন খান। এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর তৃণমূল নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন এবং তার কারণে দলের মধ্যে একাধিক গ্রুপ সৃষ্টি হয়। এমনকি ওই আসনে গড়ে ওঠে আবুল হোসেন খান বিরোধী বিএনপি বলয়। ওই বলয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাচ্চু নেগাবানসহ আরো অনেকে। তাছাড়া গত সরকারবিরোধী আন্দোলন সংগ্রামে আবুল হোসেনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সেখানকার তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তাদের দাবি বাকেরগঞ্জে দলীয় কোন্দল নিরসন করতে হলে আবুল হোসেনকে প্রার্থী করা যাবে না। নতুন প্রার্থী দিলেই কোন্দল নিরসন হবে। একই সঙ্গে চেয়ারপার্সনের দেয়া প্রার্থীই এ আসন থেকে বিজয়ী হবে। এ আসনে এ দু’জন প্রার্থীই মনোনয়ন পাওয়ার জন্য শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তবে আরো যারা মনোনয়ন চাইছেন তারাও কেন্দ্রে লবিং করছেন।

২০০৭ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে এ আসনে মহাজোট থেকে মনোনয়ন দেয়া হয় জাতীয় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারকে। তিনি বিএনপি প্রার্থী আবুল হোসেন খানকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি তাদের ভোটেই জাতীয় পার্টি এমপি নির্বাচিত হন। কিন্তু নির্বাচিত হয়ে এলাকার উন্নয়নে তেমন কোনো ভূমিকা রাখেন না। এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে আগামী নির্বাচনে দল থেকে মনোনয়ন দেয়ার জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুরোধ জানাবেন স্থানীয় নেতারা।

এ আসন থেকে আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দৌড়ে প্রথমে রয়েছেন মেজর জেনারেল (অব.) হাফিজ মল্লিক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার পাশাপাশি বাকেরগঞ্জবাসীর পাশে রয়েছেন। এমনকি বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামেও তার ভূমিকা রয়েছে। গত দু’বার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দৌড়ে তিনিই এগিয়ে ছিলেন। হাফিজ মল্লিকের দাবি আগামী নির্বাচনে বরিশাল-৬ আসনে নৌকার হাল ধরার দায়িত্ব সভানেত্রী তাকেই দেবেন।

এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী হতে চান পরপর দু’বার উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত শামসুল আলম চুন্নু। তিনি মনে করেন বাকেরগঞ্জে তার বড় একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে। দল থেকে মনোনয়ন দেয়া হলে তিনি এমপি নির্বাচিত হবেন। তাছাড়া দু’বার চেয়ারম্যান থাকাকালীন তার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা প্রকৌশলী মনজুরুল হক মঞ্জু। তিনি ছাত্রজীবন থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আওয়ামী লীগের দুর্দিনে তিনি আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন। তাছাড়া এলাকাবাসীর সঙ্গেও রয়েছে তার ভালো সম্পর্ক। নদী বেষ্টিত এবং যেসব এলাকায় এখনো কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি সেসব এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চান ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জু।

এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন ড. মোয়াজ্জেম। তার দাবি বিগত দিনে তার স্ত্রী পারভীন তালুকদার এলাকার উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। এলাকায় তারও ভোট ব্যাংক রয়েছে। তার দাবি আগামী নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন দেয়া হলে তিনি বিজয়ী হবেন।

এ আসনের সাবেক এমপি মাসুদ রেজার স্ত্রী আইরিন রেজাও মনোনয়নপ্রত্যাশীদের দলে রয়েছেন। আইরিন রেজার দাবি তার স্বামী এমপি থাকাকালীন এলাকার উন্নয়নে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি জেলা পরিষদের সদস্য। এখনো এলাকার উন্নয়নে কাজ করছেন। আইরিন দলের কাছে মনোনয়ন চাইবেন।

আর যারা মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন তারাও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। স্থানীয় একাধিক প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, আগামী নির্বাচনে বিএনপি থাকায় শক্ত প্রার্থী দিতে হবে। বিশেষ করে সেই প্রার্থী অবশ্যই আওয়ামী লীগ থেকে হতে হবে। তা না হলে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া কষ্টকর হয়ে পড়বে।

এ ছাড়া বরিশাল-৬ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মাঠে রয়েছেন জাসদের (আম্বিয়া-প্রধান) কেন্দ্রীয় নেতা মো. মহসিন। চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মো. ফায়জুল করীম এ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নেবেন।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রূহুল আমিন হাওলাদার এমপি বলেন, জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে গঠিত ‘জাতীয় জোট’ আগামী সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে। তবে মহাজোটের বিষয়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কোনো আলোচনা হয়নি। তাই জাতীয় পার্টি আগামী নির্বাচনে কোন পথ অনুসরণ করবে তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে আওয়ামী লীগের জোটে থাকলে জাতীয় পার্টির প্রার্থীই এ আসন থেকে মনোনয়ন পাবে। আর জাতীয় জোটে থাকলেও বর্তমান এমপি তিনিই প্রার্থী হবেন।

দলীয় কোন্দলের বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস এমপি ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম শাহিন বলেছেন, দলে কোন্দল থাকতেই পারে। তবে সভানেত্রী এবং চেয়ারপার্সন যে প্রার্থী দেবেন দলীয় নেতাকর্মীরা তাকে এমপি নির্বাচিত করতে কাজ করবে। তাছাড়া নির্বাচনের এখনো অনেক সময় বাকি। এর পূর্বে কেন্দ্র থেকেই স্থানীয় পর্যায়ের কোন্দল নিরসন করা হবে বলে তাদের ধারণা।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ